.
তিন দশক ধরে দেশ শাসন করা প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশিরকে উৎখাত এবং গ্রেফতার করে গতকাল রাতে ছয় ঘণ্টার কারফিউ জারি করে সুদানের সামরিক পরিষদ। তবে সরকারের বিরুদ্ধে চলা কয়েক মাসের বিক্ষোভ সামরিক এই হস্তক্ষেপেও থেমে নেই। বিক্ষোভকারীরা এখন নতুন করে সেনাবাহিনীর এই সামরিক পরিষদের বিরুদ্ধে রাজধানী খার্তুমের রাস্তায় বিক্ষোভ করে যাচ্ছে। বিবিসির এক অনলাইন প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
কয়েক মাস ধরে সরকারের বিরুদ্ধে লাগাতার বিক্ষাভ করা লোকজন এখন বলছে প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশিরের এবং সামরিক পরিষদের মধ্যে তারা কোনো পার্থক্য দেখছে না। তারা সেনাবাহিনীর এই ক্ষমতা দখল মেনে নিবেন না বলে জানান। এই অবস্থায় সেনাবাহিনী এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এছাড়া দুই পক্ষের এ মুখোমুখি অবস্থানের ফলে নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন অংশ এবং আধাসামরিক বাহিনী একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই অবস্থায় জাতিসংঘ ও আফ্রিকান ইউনিয়ন সুদানের সব পক্ষকেই শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার ৭৫ বছর বয়সী বশিরকে গ্রেফতারের খবরে সড়কজুড়ে উল্লাস শুরু হলেও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। সামরিক পরিষদের ক্ষমতা গ্রহণের ঘোষণার পরপরই এই আনন্দ থেমে যেতে থাকে। আন্দোলনকারীরা পরে সামরিক বাহিনীর সদরদপ্তরের বাইরে অবস্থানের কর্মসূচি দেয়।
বিক্ষোভকারীদের একজন সুদানের প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েশনের সারা আবদেল আজিজ জানান, এটা আগের শাসনেরই ধারাবাহিকতা। তাই আমাদের প্রয়োজন লড়াইয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানানো।
গতকাল ওমর আল বশিরের ক্ষমতাচ্যুতির বিষয়টি নিশ্চিত করে সুদানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আওয়াদ ইবনাউফ গতকাল এক টেলিভিশন ভাষণে বলেন, দুই বছর মেয়াদের জন্য গঠিত একটি মিলিটারি কাউন্সিল ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্টের স্থলাভিষিক্ত হবে। এছাড়া পরবর্তী নির্দেশ দেয়ার আগ পর্যন্ত সুদানের সীমান্ত ও আকাশসীমা বন্ধ রাখা হবে।
ওমর আল বশির নিজেও ১৯৮৯ সালে এক ক্যুর মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সময় ধরে শাসন করা প্রেসিডেন্টদের মধ্যে তিনি অন্যতম। গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে তাকে অভিযুক্ত করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)।
সেনাবাহিনীর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসছে, এমন সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল রাজধানী খার্তুমের কেন্দ্রস্থলে জড়ো হন প্রতিবাদকারীরা। এ সময় আল বশির সরকারের পতন ঘটানোর স্লোগান দিচ্ছিলেন তারা। রুটির দাম তিন গুণ করার প্রতিবাদে আল বশির সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নামে সুদানবাসী।
গতকাল সকাল থেকেই খার্তুমের রাস্তায় রাস্তায় সৈন্যবাহী যানবাহন টহল দিতে দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আল বশিরের ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টির মতাদর্শিক উইং ইসলামিক মুভমেন্টের দপ্তরেও তল্লাশি চালিয়েছে সৈন্যরা। এছাড়া সেনাবাহিনীর আদেশে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেলের স্বাভাবিক অনুষ্ঠানসূচিতেও বিরতি আনা হয়।
খার্তুমের সেনা সদর দপ্তরের সামনে একদল বিক্ষোভকারীকে যানবাহন ও সাঁজোয়া গাড়ির ওপর দাঁড়িয়ে উল্লাস করতে দেখা যায়। বিক্ষোভকারীদের সরকারি অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার আক্রমণ থেকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য এসব সাঁজোয়া যান মোতায়েন করে সেনাবাহিনী।
এদিকে সুদানের সব রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তির ঘোষণা দিয়েছে সুদানের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি সার্ভিস (এনআইএসএস)। জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য কুখ্যাত এ গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে স্থানীয় এসইউএনএ নিউজ এজেন্সি এ তথ্য জানায়। তবে ঘোষণা অনুযায়ী পূর্বাঞ্চলীয় শহর কাসালা ও পোর্ট সুদানের সব রাজবন্দিকে মুক্তি না দেয়ায় বিক্ষোভকারীরা এনআইএসএস ভবনে হামলা চালান। এ সময় বিক্ষোভকারীদের ঠেকাতে এনআইএসএস কর্মকর্তাদের শূন্যে গুলি ছুড়তে দেখা যায়।
এর আগে টানা পাঁচদিন ধরে সেনা সদর কমপ্লেক্সের সামনে অবস্থান করে প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করে যান বিক্ষোভকারীরা। এ সময় এদের ওপর বারবার কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে এনআইএসএসের লোকজন। এক বিক্ষোভকারী বলেন, ৩০ বছর ধরে দমন-পীড়ন, দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ যথেষ্ট দুঃশাসন সহ্য করেছি আমরা।
কর্মকর্তারা জানান, ডিসেম্বরে ওমর আল বশিরবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৪৯ বিক্ষোভকারী প্রাণ হারিয়েছেন। এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘নুবিয়ান কুইন’ খেতাব পেয়েছেন আলা সালাহ নামের এক নারী। খার্তুমে সেনা সদর দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ চলাকালে তার ভাষণরত একটি ছবি ভাইরাল হলে এ খেতাব অর্জন করেন তিনি। আলা সালাহ বলেন, আমার প্রত্যাশা, আমাদের এ বিপ্লব তার লক্ষ্য অর্জন করবে।
এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও নরওয়ে প্রথমবারের মতো বিক্ষোভকারীদের প্রতি নিজেদের সমর্থন ব্যক্ত করে। ওমর আল বশিরের ক্ষমতাচ্যুতির পর দেশগুলো একযোগে একটি বিবৃতিও দিয়েছে।