টানা বৃষ্টিতে সারা দেশে জনজীবনে ভোগান্তি: বান্দরবানে নিহত ৫

0

 উত্তর বঙ্গোপসাগরের একটি লঘুচাপ নিম্নচাপে রূপান্তরিত হয়ে স্থলভাগে উঠেছিল। এর প্রভাবে গত রবিবার রাত থেকে  টানা বৃষ্টিতে রাজধাণীসহ সারা দেশে প্রায় জেলার রাস্তাঘাট, বাজার, দোকানপাট, ঘরবাড়ি পানির নিচে তলিয়ে যায়।  চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে জনগণকে। পানি, ময়লা, কাদা মাড়িয়ে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় দিনভর সড়কে ছিল তীব্র যানজট। নগরীর অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক পর্যন্ত ছিল জলাবদ্ধতার  চিত্র। ভুক্তভোগীরা বলছেন, বিগত কয়েক মাসে নগরজুড়ে ধারাবাহিক খোঁড়াখুঁড়িতে দুর্ভোগের মাত্রা ছিল চরমে।  কাকভেজা হয়ে গন্তব্যে যাওয়ার জন্য গণপরিবহনের অপেক্ষায় থাকলেও তাদের অপেক্ষাই বিফল হয়েছে। যানজটের কারণে গণপরিবহনের গতি যেমন শ্লথ ছিল, তেমনি কোথাও কোথাও যানজটে আটকা পড়ে নষ্ট হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কর্মঘণ্টা।  আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসেবে গতকাল ঢাকায় সর্বোচ্চ ৬৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। আজও বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে আজও বৃষ্টিতে দুর্ভোগে পড়তে পারেন নগরবাসী। চলছে মাহে রমজান। পবিত্র ঈদুল-ফিতরও আসন্ন। রোববার পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বিপণিবিতান ও ফুটপাথগুলোতে ঈদের কেনাকাটার ভর সময়। কিন্তু গতকাল ছিল এর ব্যতিক্রম। মুষলধারে বৃষ্টির কারণে অনেকেই ঘর থেকে বের হতে পারেননি। গুরুত্বপূর্ণ কাজও অনেকে সারতে পারেননি একই কারণে। গতকাল রাজধানীর ফার্মগেট, তেজকুনীপাড়া, কাওরানবাজার, শান্তিনগর, মালিবাগ, মৌচাক, শাহজানপুর, খিলগাঁও, বাসাবো, মাদারটেক, মিরপুর, কালশি, মতিঝিল, কমলাপুর, নাজিমউদ্দিন রোড, পুরান ঢাকার একাধিক এলাকায় বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। কোথাও কোথাও বিপণিবিতান ও বাসা বাড়িতেও উঠেছে বৃষ্টির পানি।

চট্টগ্রামে টানা বর্ষণে অব্যাহত আছে। বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে বহু এলাকা পানিতে ডুবে গেছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বিভিন্ন এলাকায় পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ। দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালী উপজেলা এবং উত্তর চট্টগ্রামের হাটহাজারী, রাউজান, ফটিকছড়ি ও সন্দ্বীপ উপজেলায় পানিতে তলিয়ে গেছে রাস্তা-ঘাট, ঘরবাড়ি ও শত শত একর জমির ফসল।চট্টগ্রাম শহরের কয়েকটি এলাকা, যেমন আগ্রাবাদ, বাদামতলী মোড়, বহদ্দারহাট, বাদুরতলা , খাতুনগঞ্জ, চাকতাইসহ অনেক এলাকা পানি উঠে তলিয়ে গেছে। জনজীবন চরম ভোগান্তিতে পড়েছে।

বান্দরবানের জেলার পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড কালাঘাটা এলাকার ত্রিপুরা পাড়াসহ কয়েকটি দুর্গম এলাকায় পাহাড়ধসে অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছে। আজ মঙ্গলবার ভোররাত পৌনে ৪টার দিকে এসব দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় আরো অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া এ ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন আরো দুজন।  নিম্নচাপের প্রভাবে টানা বৃষ্টির পর পাহাড়ধসে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে।

নিহতদের মধ্যে চারজনের নাম জানা গেছে। এরা হলেন শহরের আগাপাড়ার একই পরিবারের শুভ বড়ুয়া (৮), মিঠু বড়ুয়া (৬), লতা বড়ুয়া (৫) ও কালাঘাটা কবরস্থান এলাকার রেবি ত্রিপুরা (১৮)। এ ছাড়া নিখোঁজ রয়েছেন জাইল্লাপাড়ায় একই পরিবারের মা কামরুন্নাহার ও মেয়ে সুফিয়া (২০)। সদর থানার ওসি রফিক উল্লাহ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।  

দক্ষিণাঞ্চলে থেমে থেমে বৃষ্টি নামছে। পটুয়াখালী, ভোলা ও বরগুনায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে গেছে। দুই দিন ধরে চার জেলায় কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে আছে। তবে মঙ্গলবার সকাল থেকে জোয়ারের পানি নামতে শুরু করেছে।

ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, ভোলার মেঘনা নদীতে বিকেলে জোয়ারের উচ্চতা ছিল ৩ দশমিক ৬৫ মিটার। জেলায় ২০টি গ্রাম ও ৩০টি চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। স্থানীয় ব্যক্তিরা বলছেন, পাঁচ শতাধিক মাছের পুকুর-ঘের ডুবে গেছে। চরফ্যাশন উপজেলায় মাছের দুটি ট্রলার ডুবে গেছে।

তজুমদ্দিন উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের চৌমহনী এলাকার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে সাতটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।দুর্ভোগ পোহাচ্ছে দৌলতখান ও তজুমদ্দিন উপজেলার মদনপুর, হাজীপুর, মনপুরা, দক্ষিণ সাকুচিয়া ও হাজিরহাট ইউনিয়নের অন্তত ৩৫ হাজার মানুষ। এই এলাকাগুলোতে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ নেই।

বরগুনার আমতলী পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত দুই দিনের বৈরী আবহাওয়া ও ভারী বর্ষণের প্রভাবে বঙ্গোপসাগর ও পায়রা নদীতে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে প্রায় এক মিটার পানি বেড়েছে। এতে আমতলীর বালিয়াতলীর বয়াতিবাড়ি-সংলগ্ন ২০০ মিটার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে বালিয়াতলী, ঘোপখালী, পশুরবুনিয়া, দক্ষিণ ঘোপখালী ও চরকগাছিয়া; তালতলী উপজেলার তেতুঁলবাড়িয়া এলাকার এক কিলোমিটার ভাঙা বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে তেতুঁলবাড়িয়া, নলবুনিয়া, আগাপাড়া ও মোয়াপাড়া গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।এ ছাড়া বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের বাইরে বঙ্গোপসাগর ও পায়রা নদীসংলগ্ন তালতলী উপজেলার নিদ্রা-সকিনা, ফকিরহাট, তালুকদারপাড়া, নিশানবাড়িয়া, ফাতরা, খোট্টারচর, আশারচর, তালতলী, চরপাড়া, গাবতলী, লেমুয়া, মৌপাড়া, ছোটবগি, পচাকোড়ালিয়া, বালিয়াতলী, পশুরবুনিয়া, আড়পাঙ্গাশিয়া; আমতলী উপজেলার ফেরিঘাট, লঞ্চঘাট, শ্মশানঘাট, আমুয়ারচর ও গুলিশাখালী গ্রাম পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় এসব এলাকার পরিবারগুলো পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.