তিন জেলায় প্রবল বর্ষণে পাহাড় ধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে কমপক্ষে ৪৭ জনে পৌঁছেছে। সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত এসব দুর্ঘটনা ঘটে। নিখোঁজ রয়েছেন ১০ জন। উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে।
মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গতকাল সোমবার রাতে ও আজ মঙ্গলবার সকালে সদর উপজেলাসহ রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকা, বান্দরবান ও চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলায় পাহাড় ধসের এ ঘটনা ঘটে।
রাঙামাটি
রাঙামাটি জেলার পৃথকস্থানে পাহাড় ধসে অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার বেলা আড়াইটা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে ৩০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সকালে শহরের যুব উন্নয়ন, ভেদভেদী, শিমুলতলি, রাঙাপানিসহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে।
এর মধ্যে কাপ্তাই উপজেলার তিনজন ও কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের একজন রয়েছেন। এ ছাড়াও মানিকছড়িতে পাহাড় ধসে সেনা ক্যাম্প ধসে পড়ে কর্মকর্তাসহ সেনাবাহিনীর ছয়জন মারা যান। মৃত ব্যক্তিদের পরিচয়ের ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রাঙামাটি সদর হাসপাতালের সিভিল সার্জন শহীদ তালুকদার বলেন, জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে পাহাড়ধসে প্রথমে নয়জনের মৃতদেহ হাসপাতালে আনা হয়। পরে আরও চারজনের মৃতদেহ আনা হয়।
মৃতরা হলেন- শহরের ভেদভেদি এলাকার রুমা আক্তার, নুড়িয়া আক্তার, হাজেরা বেগম, সোনালী চাকমা, অমিত চাকমা, আইয়ুস মল্লিক, লিটন মল্লিক, চুমকি দাস। কাপ্তাই উপজেলার কারিগরপাড়া এলাকার বাসিন্দা অনুচিং মারমা ও নিকি মারমা। বাকিদের পরিচয় পাওয়া যায়নি।
আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক রাশেদুল হাসান জানান, পাহাড়ধসে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাসহ ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
বান্দরবান
বান্দরবানের লেমুঝিরি আগাপাড়ায় পাহাড়ধসে ঘুমন্ত অবস্থায় তিন শিশু ভাই-বোন মারা গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন মা-মেয়ে। এ ছাড়া গুরুতর আহত অবস্থায় দুজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বান্দরবান সদর ইউপির চেয়ারম্যান সাবুখয় মারমা জানান, আজ মঙ্গলবার ভোররাত চারটার দিকে লেমুঝিরি আগাপাড়ায় পাহাড়ধসে একই পরিবারের ঘুমন্ত তিন শিশু মাটি চাপা পড়ে মারা গেছে। তারা হলো মিতু বড়ুয়া (৫), শুভ বড়ুয়া (৪) ও লতা বড়ুয়া (২)।
নিহত তিন শিশুর বাবা লাল মোহন বড়ুয়া জানান, ভারী বৃষ্টিতে বেশি পানি জমে যাওয়ায় বাড়ির পাশের নালা পরিষ্কার করার জন্য তাঁরা স্বামী-স্ত্রী বের হয়েছিলেন। সন্তানরা সবাই ঘুমিয়ে ছিল। এ সময় পাহাড় ধসে চোখের সামনে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। এখন পরিবারে তাঁরা স্বামী-স্ত্রী ছাড়া আর কেউ নেই। এ ছাড়াও জেলা শহরের কালাঘাটায় একটি বাসায় পাহাড়ধসের ঘটনায় ঘুমন্ত অবস্থায় এক কলেজছাত্র মারা যান।
ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় লোকজন জানান, প্রবল বৃষ্টিতে প্রথমে গতকাল সোমবার দিবাগত রাত ১টার দিকে জেলা শহরের কালাঘাটায় একটি বাসায় পাহাড় ধসে পড়ে। এ সময় ঘুমন্ত অবস্থায় কলেজছাত্র রেভা ত্রিপুরা (২২) মাটি চাপা পড়ে মারা যান।
মাটিচাপায় আহত ব্যাবিলন চাকমা বলেন, এলাকাবাসী তাৎক্ষণিকভাবে এসে তাঁকেসহ বীর বাহাদুর ত্রিপুরা (১৮) ও প্রসেন ত্রিপুরাকে (২৪) মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করেন। গুরুতর আহত বীর বাহাদুর ও প্রসেন ত্রিপুরাকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁর (ব্যাবিলন চাকমা) দুই পা মাটিতে আটকে পড়ে যাওয়ায় তিনিও আহত হয়েছেন। এদিকে কালাঘাটার ঘটনার এক ঘণ্টা পর লেমুঝিরি জেলেপাড়ায় পাহাড়ধসে মোহাম্মদ আজিজের বাড়ি মাটি চাপা পড়ে যায়। আজিজ কোনো রকমে বাড়ি থেকে বের হতে পারলেও তাঁর স্ত্রী কামরুন্নাহার (৪০) ও মেয়ে সুখিয়া আক্তারকে (১৪) এখনো উদ্ধার করা যায়নি।
বান্দরবানের ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা স্বপন কুমার ঘোষ জানান, কালাঘাটা থেকে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। লেমুঝিরি জেলেপাড়ায় নিখোঁজ মা-মেয়ের সন্ধানে উদ্ধার তৎপরতা চলছে। ১০ ফুট মাটি সরিয়েও এখনো চাপা পড়া বাড়ি থেকে কাউকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের পৃথকস্থানে পাহাড় ধসে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ছনবনিয়ার ২নং ওয়ার্ডের উপজাতি এলাকার সিনসাও কেয়াংয়ের স্ত্রী মোকা ইয়ং কিয়াং (৫০), কেলাও অং কেয়াংয়ের কিশোরী কন্যা মেমো কেয়াং (১৩) ও ফেলাও কেয়াংয়ের শিশু কন্যা কেওচা কেয়াং (১০)।
আহত হয়েছেন আরো দুইজন। আহত সানু কেয়াং (২১), শেলাও কেয়াংকে (২৭) সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলায় (বান্দরবানসংলগ্ন) ধোপাছড়ি সম্বুনিয়া গ্রামে পাহাড়ধসে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। আজ মঙ্গলবার ভোররাত ৪টার দিকে ঘুমন্ত অবস্থায় দাদি মকাং (৫৫) ও নাতি ক্যসা খিয়াং (৭) মারা যায়।
এ ঘটনায় নিহত মকাংয়ের ছেলে সাইহ্লাউ (৪০) ও মেয়ে সানুকিয়াংকে (১৮) সংজ্ঞাহীন অবস্থায় বান্দরবান সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। সানুকিয়াং বান্দরবান সরকারি মহিলা কলেজে পড়েন।
কুহালং ইউপির সদস্য উসানং খিয়াং তিনজনের মৃত্যুর তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
এ ছাড়াও জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের বগাবিলী গ্রামে পাহাড়ধসে দুই পরিবারের আটজন নিখোঁজ রয়েছেন।
রাজানগর ইউপির চেয়ারম্যান শামসুল ইসলাম বলেন, প্রবল বর্ষণের কারণে নজরুল ইসলাম ও মোহাম্মদ হোসেনের মাটির ঘরের ওপর পাহাড় ধসে পড়ে। সেখানে এখনো চাপা পড়ে আছেন নজরুল, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান এবং মোহাম্মদ হোসেন, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা কর্মকর্তা (ইউএনও) কামাল হোসেন বলেন, উদ্ধার অভিযান তদারকিতে তিনি ঘটনাস্থলে রয়েছেন।