সন্ত্রাস ও জবরদখলের আতংক জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমুল বাসিন্দাদের

0

কিউ এইচ কবির
চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড থানাধীন জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমুল বস্তিবাসীদের এলাকা হলেও এ যেন নগরের কাছেই সন্ত্রাসের ভয়াল এক জনপদ। এই এলাকায় প্রায় ১ লাখেরও বেশী সাধারণ মানুষ সরকারী জায়গার উপর বসবাস করলেও এই এলাকাটি গুটি কয়েক সুবিধাবাদী সন্ত্রাসীর কারনে এখনো আতংকের এলাকা হিসাবে চট্টগ্রামে খ্যাত হয়ে আছে। ৫ আগষ্ট সরকার পরিবর্তনের পর এলাকার সাধারণ জনগণ ভাবছিল এবার বুঝি আতংকের অবসান হবে। তবে আতংক কাটছেনা চট্টগ্রামের সলিমপুরের ছিন্নমুল বাসিন্দাদের। বার বার প্রশাসনের পদক্ষেপে সরকারী ভুমি বিক্রয়, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজী, মাদকব্যবসা, পাহাড়কাটা, এলাকার আধিপত্য কায়েমকে প্রাধান্য দেয়া স্বার্থান্বেসী নেতার গ্রেফতার ও নেতৃত্বের পরিবর্তন হয়ে নতুন নেতৃত্ব আসলেও আতংক কাটেনা এই ছিন্নমুল গরিব অসহায় বাসিন্দাদের। কথায় আছে যে যায় লংকায়, সেইই হয় রাবন। ক্ষমতার পালাবদল হলেও এই এলাকার সাধারণ জনগণ সুবিধাবাদী ভুমিদস্যু রাবনের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে।
জানা যায়, সেই আক্কাছ আমল থেকেই ভুমি খেকোরা সরকারী জমি দখল ও স্বল্প টাকার বিনিময়ে গরিব ও অসহায় মানুষদের কাছে টোকেন দিয়ে দুন্ডা জমির একটি প্লট বিক্রি করতো। আর এই একখন্ড জমির লোভে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতে থাকে অনেক গরিব অসহায় গৃহহীন মানুষেরা। পর্যায়ক্রমে বিশাল মানুষের সমাগম বাড়তে থাকে। এই অসহায় মানুষদের পূজী করে একদল সুযোগ সন্ধানী নিজেদের আখের গোছানোর সিড়ি হিসাবে ব্যবহার করে। তারা এসব অসহায় গরিবদের নিয়ে ছিন্নমুল মহানগর বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ নামে কমিটি করেন। সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বকে পূজী করে তারা নানা সুযোগ সুবিধার সন্ধান করতে থাকে। আক্কাছ ক্রসফায়ারে মারা যাওয়ার পর ছিন্নমুলের জনগণ মনে করেছিল এইবার বুঝি তারা স্বাধীন ভাবে বসবাস করতে পারবে। কিন্ত সেটা আর হলোনা। এই পাহাড়ী মানুষদের শাষন করতে নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি হলো। তারা পূর্বের চেয়ে আরো শক্তিশালী হয়ে শোষন শুরু করে দিলো। রাস্তাঘাট নির্মানে অতিরিক্ত চাঁদা, বাজার ব্যবস্থায় চাঁদা, ইটের গাড়ি থেকে চাঁদা, বালূর গাড়ি, টেম্পু ষ্ট্যান্ড থেকে চাঁদা, বিদ্যুতের লাইন, পাহাড় কাটা, এলাকার আধিপত্য টিকিয়ে রাখা, সরকারী জমি ক্রয় বিক্রয়, সরকারী জমি লীজ আনার নাম করে চাঁদাবাজীর মহোৎসব চালূ হয়ে যায়।
এসব নিয়ে দেশের গণমাধ্যমে অনেক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। একপর্যায়ে ছিন্নমুল সাধারণ সম্পাদক মশিউর গ্রেফতার হলেন, এলো নতুন নেতৃত্ব, শুরু হলো পুরানো কায়দায় আবারো এই গরিব বসতিদের শোষন। সেই সাথে নতুন নতুন পাহাড় কেটে জমি সমতল করা এবং টোকেনের বিনিময়ে নতুন সরকারী জায়গা বিক্রি করা। ৫ আগষ্টের আগে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে এই এলাকায় বসবাসরত অবৈধ বসতিদের উচ্ছেদ করে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরবতীতে জেলা প্রশাসন সেই পরিকল্পনা থেকে সরে যান। জানা যায়, এই এলাকার শাসন কায়েম করার সুবিধাবাদী নেতাদের পড়ালেখার জোড় বেশী না থাকলেও তারা জানে রাজনৈতিক নেতারা কি চায়। তারা চায় ভোট ও সমর্থন। আর এই এলাকায় রয়েছে কাঙ্খিত ভোট। আর এই সুযোগে রাজনৈতিক নেতাদের হাত করে ক্ষমতার পালাবদলে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নেয়ার পরিকল্পনায় থাকে এসব সুযোগ সন্ধানীরা নেতা পরিচয়ধারী সন্ত্রাসীরা। তাদের প্রশ্রয়কে হাতিয়ার হিসাবে নিয়ে এলাকা নিয়ন্ত্রণ, পাহাড়কাটা, চাঁদাবাজী, মাদক ব্যবসা, দখলবাজী, তদবীর, দেনদরবার, আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে নেতৃত্বদানকারী সন্ত্রাসীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার একজন বাসিন্দা বলেন, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ক্ষমতার পালা বদলে হাসিনা সরকারের আমলে ছিন্নমুলের নেতৃত্ব দানকারী আগের নেতারা যখন এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়, বিএনপি বাইরে থাকা কয়েকজন এলাকা নিয়ন্ত্রন ও দখলের তৎপরতা শুরু করেন। দখল সফল হলে ছিন্নমুলের পূর্ব কমিটির আদলে ছায়েদুল হক ছাদু সভাপতি ও জিয়াউর রহমান জিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি করেন। এরই মধ্যে এই পাহাড়ি এলাকাটি ঘিরে শুরু হয় প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। ত্রাশ চালাতে থাকে যুবদলের নেতা কামরুল হাসান রিদোয়ান। শুরুতেই কাজী মশিউরের ছেলে শিবলু, ইসমাইল প্রকাশ বুদ্ধিজীবী ইসমাইল, সাবেক অর্থসম্পাদক রফিকুল্লাহ হামিদীকে মেরে গুরুতর আহত করেন, নিজের আধিপত্য কায়েমের জন্য হত্যাকান্ড সংঘটিত করেন কয়েকটি। একের পর এক মামলা নিয়ে আরো সাহসি হয়ে পুন্যদ্যমে ত্রাসের রাজত্ব চালাতে শুরু করেন। তার ভয়ে প্রাণে বাচতে অনেককে বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে হয়। অনেকের থেকে হাতিয়ে নেয়া হয় নগদ অর্থসহ ঘরবাড়ি। এতে এলাকায় চরম আতংক শুরু হয়ে যায়। এরপর কার পালা এই নিয়ে সর্বদা আতংকে থাকতে এই জনপদের সাধারণ মানুষগুলো। এলাকার বাচ্ছা থেকে সবাই তাকে ভয় পেতে শুরু করে। তার কথা ছাড়া এলাকার একটি বালুও নড়েনা।
গত ৩০ শে আগষ্ট সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ অভিযানে এই সন্ত্রাসী তার কয়েকজন সাঙ্গপাঙ্গ অস্ত্রসহ গ্রেফতার হয়। জানা যায়, গ্রেফতার পূর্ব রেদোয়ানের এই সন্ত্রাসী ক্ষমতাকে নিজেদের করার জন্য আতাত করে ছিন্নমুল মহানগর বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদের নতুন সভাপতি ছায়েদুল হক ওরফে ছাদু ও জিয়াউর রহমান জিয়া ও মিজানুর রহমান রাজু। তাকে নিয়ে নিজেদের রাজত্ব ভালোভাবে কায়েমের জন্য ছিন্নমুলে একটি নুতন অফিস গঠন করে। সেই অফিসে সন্ত্রাসী রিদোয়ান ও নতুন কমিটির নেতারা প্রতিদিন একসাথেই অফিসে বসতো। এলাকার দেনদরবার করতো। তারা রিদোয়ানের থিউরী অনুযায়ী এলাকার সাধারণ জনগণকে কুক্ষিগত করে রাখতো। জানা যায়, সন্ত্রাসী রিদোয়ানকে শেল্টার দিতেন দলের রুকুন মেম্মারসহ কয়েকজন বিএনপি নেতা। যার ছায়াতলে রিদোয়ান জঙ্গল সলিমপুরকে তার দাপটে নিজেদের আখের গোছানোর রাজত্ব বানাতে চেয়েছিল। কামরুল হাসান রিদোয়ান তার সাঙ্গপাঙ্গসহ সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হলে তার মদদদাতা ছিন্নমুল মহানগর বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদের নতুন সভাপতি ছায়েদুল হক ছাদু ও জিয়াউর রহমান জিয়া এলাকার নেতৃত্ব ছেড়ে দুরে সরে যান।

আরেক বাসিন্দা বলেন, বর্তমানে নেতৃত্বহীনতার সুযোগে আলী নগরের আরেক অধিপতি ইয়াছিনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব শুরু হয়েছে। এতে আবারো নতুন ভাবে আতংকিত হয়ে উঠছে সাধারণ মানুষ। ইয়াছিন নেতৃত্বে এসেই তার পূর্ব শত্রæতার জেড় ধরে সারভেয়ার মুজিবুর রহমানকে তার কেনা ঘরবাড়ি ছেড়ে তার বউ পরিবারসহ এলাকা ছাড়তে বাধ্য করেন। এক ব্যবসায়ীর দোকান পাট ও ঘরবাড়ি ভাংচুর করেন।

চট্টগ্রাম মহানগর বাস্তুহারা দলের সাধারণ সম্পাদক ও ব্যবসায়ী সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করে বলেন, ইয়াছিন বাহিনীর নেতৃত্বে আমার দুটি দোকান ও বসতবাড়িতে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট হয়েছে । এই ঘটনায় এলাকার অনেক মানুষ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।

জোড় পূর্বক ভিটাবাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনায় সার্ভেয়ার মুজিব ও মিজানুর রহমান রাজুসহ আরো কয়েকজন মিলে নতুন নেতৃত্বে আসা ইয়াছিন বাহিনীর বিরুদ্ধে গত ১৩ সেপ্টেম্বও একটি সাংবাদিক সম্মেলন করেন। যা নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এলাকাবাসীর সাধারন জনগণের কয়েকজন জানান, সন্ত্রাসী রেদোয়ানকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের অভিযানে গ্রেফতার করলেও নতুন ভাবে ক্ষমতায় আসা নেতৃত্বদের কাছে যেন আবার জিম্মি হয়ে পড়েছি। জানিনা কি হয়। ভয় আর আতংক যেন কাটছেনা ছিন্নমুল এলাকার অসহায় সাধারণ মানুষদের। কি করবো, কোথায় যাবো। গুটি কয়েক নেতা পরিচয়ধারী সন্ত্রাসীর কাছে এভাবে বছরের পর বছর জিম্মি জীবন কাটাতে পারছিনা।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.