চীনের কোলে বসল নেপাল!

0
Want create site? Find Free WordPress Themes and plugins.

ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু নেপাল ও ভুটানকে দেশটির ‘অ্যাডভান্সড গার্ড’ (অগ্রণী প্রহরী) বলে অভিহিত করেছিলেন। দেশ দুটির অন্যতম নেপাল ঝুপ করে চীনের কোলে বসে পড়ায় অনেকটাই উদ্বেগে বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের আশঙ্কা, এই ঘটনা আগামী দিনে ভারতের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তে উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে। ভবিষ্যতে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে ভুটানও।

সম্প্রতি কাঠমান্ডু জানিয়েছে, পুণেতে ভারতসহ ‘বিমসটেক’ জোটের দেশগুলোর সঙ্গে চলতি সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় ৭ দিনের যৌথ সেনা মহড়ায় তারা যোগ দেবে না। তবে তার একদিন পর থেকে চেংদুতে চীনের সঙ্গে যে ১২ দিনের সেনা মহড়া হবে, তাতে অংশ নেবে নেপাল।

কাঠমান্ডুর এই ঘোষণায় অশনি সংকেত দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।তাঁরা বলছেন, তিব্বতের লাসা থেকে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি চালু হয়ে গেলে ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাটিকে আর দুর্গম রাখবে না। ফলে, ভারতের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তা রীতিমতো বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। সহায়ক হয়ে উঠতে পারে চোরাকারবার ও পাচার-বাণিজ্যের।

দায় এড়াতে পারে না ভারত
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের দুই অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক পুরুষোত্তম ভট্টাচার্য ও সংযুক্তা ভট্টাচার্যের মতে, এর জন্য কিছুটা দায়ী ভারতই। গত কয়েক দশক ধরে ভারতই বারবার নেপালের রাজনীতিতে নাক গলানোর চেষ্টা করেছে।নেপালের রাজতন্ত্রকে এক সময় টিঁকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে। আবার পরে রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের সময় নেপালকে সংবিধান প্রণয়নের জন্য আগ বাড়িয়ে পরামর্শ দিতে গেছে দিল্লি। এটা কাঠমাণ্ডুর পছন্দ হয়নি। তাই ২০১৫-এ নেপালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর দিল্লির অর্থ সাহায্যের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল কাঠমান্ডু। তারপরেও নেপালের তরাই অঞ্চলে থাকা হিন্দিভাষী (মদেশি)-দের সমর্থনে কেন্দ্রীয় সরকার কলকাতা বন্দর দিয়ে নেপালি পণ্য পরিবহণে যেভাবে বাধার সৃষ্টি করেছিল, তা ভারত সম্পর্কে নেপালকে অন্যভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে। বিকল্প হিসেবে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়তে উৎসাহিত করেছে।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শিবাশিস চট্টোপাধ্যায় ও বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিভাগীয় প্রধান শিবাজীপ্রতীম বসু বলছেন, চীনের সামরিক শক্তির কথা মাথায় রেখে ছয়ের দশক থেকেই নেহরু চেয়েছিলেন, নেপাল ও ভুটানের মতো রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে। ভৌগোলিকভাবে এই দু’টি রাষ্ট্র যে ভারতের ‘বর্ম’ হতে পারে, দূরদর্শী নেহরু তা বুঝেছিলেন সেই সময়েই। তাই, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে আলাদা ভাবে ‘ট্রেড ও ট্রানজিট’ চুক্তি করেছিল ভারত। ’৪৯-এ ভূটানের সঙ্গে আর ’৫০ সালে নেপালের সঙ্গে। নেপালের রাজতন্ত্রকেও এক সময় কার্যত মদত দিয়ে গেছে দিল্লি। যদিও পরে ’৬২-র যুদ্ধে চীনের কাছে ভারতের পরাজয়ের পর রাজা মহেন্দ্রর সময় থেকেই চীন ও ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যের রাজনীতি শুরু হয় নেপালের।

বিরোধের সূত্রপাত রাজীব গান্ধীর সময় থেকেই
তবে ভারতের সঙ্গে নেপালের মতবিরোধ যে মোদী সরকারের আমলেই প্রথম দেখা দিয়েছে, তা কিন্তু নয়। এর সূত্রপাত হয় রাজীব গান্ধীর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়েই।

পুরুষোত্তম ও শিবাজীপ্রতিমের কথায়, ১৯৮৮ সালে রাজীব গান্ধীর সময় থেকে ওই ট্রেড ও ট্রানজিট চুক্তির পুনর্নবীকরণ নিয়ে দিল্লির সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দেয় কাঠমান্ডুর। আপত্তি ওঠে সেই চুক্তির কয়েকটি শর্ত নিয়ে। নেপাল মনে করতে শুরু করে ভারত ‘দাদাগিরি’ চালাচ্ছে।

শিবাশিস বলছেন, বলা যায়, সেই শুরু। তারপর নেপালি কংগ্রেসের পরিবর্তে কে পি ওলির মতো র‌্যাডিকাল, বামপন্থীদের হাতে নেপালের ক্ষমতা চলে যেতে শুরু করায় ভারতের ‘দাদাগিরি’কে নেপালের অস্বীকার করার উৎসাহ বেড়ে যায়। ওলি প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পরেই তার সূত্রপাত। কিন্তু সেবার তাঁর ততটা ক্ষমতা ছিল না। এবার তাঁর সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংশয় নেই। তাই ভারতকে অস্বীকার করার নেপালি উৎসাহে এই জোয়ার লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

নেপালের কী স্বার্থ, চীনেরই বা কী?
শিবাজীপ্রতিমের বক্তব্য, চীন চাচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়া ও এই উপমহাদেশে ভারতকে একদিকে পাকিস্তান অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটানের মতো তার পছন্দের, তার ওপর নির্ভরশীলদের নিয়ে সাজানো ‘স্ট্রিং অফ পার্ল’-এর মতো দেশগুলো দিয়ে ঘিরে ফেলতে। এজন্য ওই দেশগুলোকে বেশি বাণিজ্য-সুবিধা দেবে বেজিং। দেবে অর্থসাহায্য। প্রযুক্তি সাহায্য। বিভিন্ন পণ্যের ওপর চাপানো শুল্কে দেবে ছাড়। এটা নেপাল, ভুটানের মতো ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলির খুব প্রয়োজন। নেপাল কার্যত ‘ল্যান্ড-লক্‌ড স্টেট’। তার এক দিকের কিছুটা তিব্বত, কিছুটা ভূটান। অন্যদিকে নেপালের সীমান্তের বেশির ভাগটাই ভারতের সঙ্গে। এর ফলে, ভারতের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল নেপাল। কলকাতা আর বিশাখাপত্তনম বন্দর ছাড়া নেপালের সামনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আর কোনো ‘রুট’ এতদিন খোলা ছিল না। চীন, তিব্বত বা অন্য দেশের মাধ্যমে নেপালের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অনেক বেশি ব্যয়সাপেক্ষ হয়, সেখানকার বন্দরগুলি অনেক দূরে বলে। চীন এবার তার দু’টি বন্দর নেপালকে ব্যবহার করতে দেবে বলেছে। যদিও দূরত্বে তা কলকাতা বা বিশাখাপত্তনম বন্দরের চেয়ে অনেক বেশি। তবে তারচেয়েও বড় কথা, লাসা থেকে কাঠামান্ডুর অত্যন্ত দুর্গম পথে চীন উন্নত সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নেপালকে। এতে সত্যিই অনেকটা উপকার হবে নেপালের। ভারতের ওপরেও তার নির্ভরতা কমবে।

তবে শিবাজীপ্রতিম এও মনে করেন, চীনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ার খেসারত অবশ্য দূর ভবিষ্যতে ভালই দিতে হবে কাঠমান্ডুকে। নেপালের রাজনীতিতে নাক গলাবে চীন। সেটা বামপন্থীরা ক্ষমতায় থাকলে নেপালের পক্ষে মেনে নেয়া যতটা সম্ভব হবে, জাতীয়তাবাদীরা ক্ষমতাসীন হলে তা ততটা হবে না।

তবে ভৌগোলিক কারণেই নেপালের কাছে ভারতের গুরুত্ব কমে যাবে না বলে মনে করছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক অনিন্দ্যজ্যোতি মজুমদার। তাঁর কথায়, কাঠমান্ডু থেকে কলকাতা আর বিশাখাপত্তনম বন্দরের দূরত্ব অনেকট কম। নেপালকে যে দু’টি বন্দর দেয়ার আশ্বাস দিয়েছে চীন, কাঠমান্ডু থেকে তাদের দূরত্ব প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার। ফলে, পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে খরচ পোষাতে ভারতকে ভুলে গেলে ক্ষতিই হবে নেপালের।

এদিকে সংযুক্তা মনে করছেন, লাসা থেকে কাঠমান্ডু সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা পুরোপুরি গড়ে উঠলে সীমান্তে ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার যথেষ্টই আশঙ্কা রয়েছে।

সংযুক্তার ধারণা, আগামী দিনে ভুটানও কিছুটা ঝুঁকে পড়তে পারে চীনের দিকে।

পুরুষোত্তমও বলছেন সে কথাই। তাঁর বক্তব্য, এখনো পর্যন্ত ভুটান নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েই চলার চেষ্টা করছে। চেষ্টা করছে ভারত ও চীনের মধ্যে তার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে চলার। তাই ডোকলাম তার নিজের ভূখণ্ডে হলেও ভারত ওই ইস্যুতে যতটা মুখ খুলেছে, ভুটান ততটাই থেকেছে মুখে কুলুপ এঁটে। এতেই ইঙ্গিত, ভবিষ্যতে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ার জোরালো সম্ভাবনাটা জিইয়ে রাখতে চাইছে ভুটানও।
কারণটাও অর্থনৈতিক। পণ্যের প্রাচুর্য, বিভিন্নতা, দাম- এসব কিছু নিয়ে অর্থনীতিতে অনেকটাই শক্তিশালী চীনের অর্থ সাহায্যের ক্ষমতাও বেশি।

সংযুক্তার কথায়, যে কারণে আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশই এখন তাইওয়ান (চীন মানতে চায় না বলে)-কে স্বীকৃতি দিতে চায় না, সেই একই কারণে, চীনা অর্থ সাহায্যের মোহে ভারতের আরো একটি ‘অ্যাডভান্সড গার্ড’ দেশ ভুটানও নেপালের মতো বেজিংয়ের দিকেই কিছুটা ঝুঁকে পড়তে পারে। সূত্র: আনন্দবাজার।

Did you find apk for android? You can find new Free Android Games and apps.

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.