একুশ ও আমাদের পরিচয়

0
Want create site? Find Free WordPress Themes and plugins.

আরিফ চৌধুরী:-
মহান ভাষা আন্দোলন ও আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস আমাদের জাতীয় ইতিহাসে একটা অবিস্বরণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ দিন। বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবীতে বাঙালির আত্বত্যাগের সঙ্গে একুশে ফেব্রুয়ারি গভীরভাবে জড়িত। একটি জাতির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক, সামাজিক চেতনাকে দীপ্ত রাখার জন্য যে ঘটনা উৎস হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যায় বাঙালি জাতির জীবনে একুশ তেমনি একটি প্রেরণার নাম। মুলত: এ আন্দোলন ছিলো বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষা, আত্ববিকাশ ও আত্ব উপলব্দির আন্দোলন । কারণ তৎকালীন পুর্ববাংলার ভূখন্ডের মধ্য যে বা যাদের মাতৃভাষা বাঙলা মূলত তারাই সবাই বাঙালি। ভাষা আন্দোলন পুর্ববাংলার জনসাধারণের মনে ও চেতনায় জাগ্রত করে ও ভাষাভিক্তিক অস্ম্প্রদায়িক চেতনা, জাতীয়তাবোধের উদ্ভোধন করে। এ আন্দোলন থেকে একটি জাতি ভাষাভিক্তিক জাতীয়তাবাদের চেতনার নতুন ভীত রচনা করেছে বলেই বাঙালী জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভংঙ্গির গভীরতায় এ আন্দোলনের ব্যাপ্তি ও বিস্তৃতি ঘটেছিলো সর্বত্র। মূলত: সাহিত্য , সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের লালন ক্ষেত্র হচ্ছে আমাদের স্বদেশ। যার বিস্তৃত পটভূমি সুদীর্ঘ ইতিহাস প্রাচীন। প্রাচনিকালে যে ভূখন্ডকে বাংলা বলা হতো তার অবস্থান বর্তমান বাংলাদেশের সীমানায়। ইংরেজ আমলে এ দেশের সীমানা নানান সময়ে পরিবর্তিত হলেও ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা দীর্ঘদিনের না হলেও আমাদের এ মাতৃভূমি বহন করছে হাজার বছরের ইতিহাসের উত্তরাধিকার। আর এ অষ্ণলে হাজার বছর আগে বৌদ্ধ ধর্মীয় সাধকেরা তাদের আষ্ণলিক ও মেীলিক ভাষার গান রচনা করে বাংলাকে সাহিত্যের মর্যাদা প্রদান করেছিলেন। এ বাংলা তটে ও বাংলাদেশে মুসলিম বিজয়ের সুচনা হলে বাংলা ভাষা প্রথম বারের মতো রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা লাভ করে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ও পৃষ্টপোষকদের মধ্যে মুসলিম শাসকরাই ছিলো অন্যতম ভূমিকায়। আরকার রাজসভায় বাংলা সাহিত্য চর্চা তারই পরিচয় বহন করে।
অন্যদিকে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য তরুণদের আত্বদানে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রæয়ারিতে রচিত হয় আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একটা গৌরবময় অধ্যায়। সেদিনের এ ঘটনা আমাদের শুধু নতুন সত্যের মুখোমুখি করেনি, নতুন এক পরিচয়ে পরিচিত হতে নতুন ভিত্তিমূল গড়ে তুলেছিলো। সেদিনের সেই রক্তভেজা সংগ্রাম, স্বাধীকার আন্দোলনেরপর আমাদেও দেশের সাংস্কৃতির উপড় অধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাকে প্রতিহত করতে জনসাধারণের সংগ্রামশীল চেতনা, শক্তিশালী তরুণ প্রজন্মের সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় রুপ নেয় আমাদের স্বাধীকার আন্দোলন। মানুষের জীবনদান, আত্বত্যাগ ও অপরিশীম স্বদেশ চেতনার কারণে জন্ম নেয় আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য সংগঠিত বাঙালি জাতির অর্জন ও তার পরবর্তীতে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মধ্য দিয়ে আর্থ সামাজিক আন্দোলন সংগ্রামের পরিণতিতে স্বাধীন স্বার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।
অন্যদিকে, একুশে ফেব্রুয়ারির এ দিনে এ পৃথিবীর প্রতিটি জাতি মাতৃভাষার প্রতি সন্মান প্রদর্শন করে। একুশের প্রেরণা তাই কেবল আজ বাঙালি জাতির মধ্য সীমাবদ্ধ নয় তা ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিটি জাতির মধ্য। কারণ একুশের ঘটনা কোন আকস্মিক ঘটনা নয় তা স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন অন্যায় অত্যাচার অনিয়মের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিস্বত্বার বিকাশে একুশ ছিলো বাঙালির একটি সফল আন্দোলন।
এ আন্দোলনে জাতীয়তাবাদের চেতনার উন্মেষ ঘটেছিলো বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে এবং আমাদের বাংলা ভাষা, সংস্কৃত, বর্ণমালা, সাহিত্য ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে প্রতিনিয়ত। ভাষা আন্দোলনের যে লক্ষ্য কে সামনে রেখে আমাদের পথ চলা শুরু হয়েছিলো তার মূলেই ছিলো জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাংলাভাষার প্রচলন ও জীবন সমাজ শিক্ষা সর্বত্র প্রচার প্রসার ও ব্যবহারে এগিয়ে আসা। কিন্তু একুশ শতকে এসে মুক্তবাজার অর্থনীতির পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের সংবিধানে বাংলা একমাত্র ভাষা রাষ্ট্রভাষা রুপে অভিষিক্ত হেেলও আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনের কারণে আজ বাংলা ভাষার আশানুরুপ ব্যবহার সংকুচিত হয়ে এসেছে। বাংলা ভাষা চেতনা ওমুক্তিযুদ্ধের যে ভাবমুর্তি ছিলো আমাদের মাঝে, তা আজ কেন জানি অন্তশারশূন্য হয়ে পড়েছে। দেশব্যাপি যে সামাজিক অস্থিরতা, নৈরাজ্য, বৈষম্য ও অর্থনৈতিক দৈনতা আমাদের মাঝে বিরাজ করছে তা থেকে পরিত্রান পেতে হলে সন্মিলিতভাবে আন্তরিকভাবে, পরিকল্পিত ভাবে সকলে প্রচেষ্টা চালিয়ে মাতৃভাষায় শিক্ষার উপড় গুরুত্ব দিতে পারলে তবেই মার্তভাষার জন্য জীবনদানের মধ্য দিয়ে যে পরিচয় আমরা গড়ে তুলেছি তার মার্যাদা রক্ষা করা সম্ভব হবে সর্বত্র।
একুশ পরবর্তী বিভিন্ন আন্দোলন ছিলো আমাদের একুশের চেতনার প্রতিফলন ও আমাদের মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম একুশের চেতনার একটা প্রতিফলন। একুশের চেতনার প্রধান শিক্ষা ছিলো সুন্দর সমাজ ও আদর্শবান জাতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে এগিয়ে নেয়া সমাজ রাষ্ট্রের গঠনের মধ্য দিয়ে। কারন একুশের আন্দোলনই ছিলো প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক গণতান্ত্রিক আন্দোলন। এ দেশের গনতান্ত্রিক মুল্যবোধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ও আমাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার মূলে একুশের চেতনার আন্দোলনের ভূমিকা ছিলো অপরিশীম। সেই চেতনায় একুশ আজ কেবলি বাঙালির নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার প্রতীক নয় শুধু তা পৃথিবীর সকল নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠীর ভাষা ঐতিহ্য মৃল্যবোধ রক্ষার অনুপ্রেরণা হয়ে আছে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিতে। আমাদের বীরেরা দুর্জয় সাহস নিয়ে বায়ান্নোর মতো অধিকার প্রতিষ্ঠা প্রত্যয়ে একটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো স্বাধীন মাতৃভূমি বাংলাদেশ। তা থেকে বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস নতুন রুপ লাভ করলো। কারণ একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে আমরা যে সংগ্রাম করেছি তা আমাদের সামনে নিয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধ, বিজয় ও স্বাধীনতার মতো গৌরবময় অর্জনের পথে। কিন্তু একুশের চেতনাকে আমরা যথার্থভাবে নিজেদের মনে স্থান দিতে পারিনি। তাই বাঙালি হয়ে বাংলাকে ভালোবেসে আমরা বাঙালি হয়ে উঠার মধ্য দিয়ে আমাদের এর তাৎপর্য মিলতে পারে। পৃথিবীর পঁচিশ কোটি মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হলেও অথচ এখন ও আমরা দেশের অভ্যন্তরে ও আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলে আমাদের বাংলাভাষাকে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা ও আমাদের মানবিক চিন্তা ও চেতনার মুল্যবোধ জাগিয়ে এর বিকাশ ও একে প্রসারিত করতে পারিনি।
স্বাধীনতা অর্জনে যারা আত্বত্যাগ করে, জীবনের বিনিময়ে দেশকে স্বাধীন করেছিলো তাদের ত্যাগ কে স্মরণ করে বর্তমান প্রজন্মের সকলকে নিয়ে আপামর জনগনের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করে ঐক্যমতের ভিক্তিতে সকলে এগিয়ে আসতে পারলে তবেই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করে তাকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। কারণ আমাদের ভাষা আন্দোলন ও মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামকে যে পাকিস্তানী উপনিবেশিক সাম্প্রদায়িক শাসক গোষ্টী বিদেশী চক্রান্ত বলে আখ্যায়িত করেছিলো তারা আজ এ দেশে সাধারণ মানুষের মনকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্পে ভারাক্রান্ত করে তোলার কাজে লিপ্ত রয়েছে। আমাদের একুশের অস্ম্প্রদায়িক চেতনাকে বিলুপ্ত করার কৌশল অবলম্বন করছে নিত্য। তা থেকে পরিত্রান পেতে হলে সন্মিলিতভাবে সবাই এগিয়ে এসে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে চেতনাকে জাগ্রত করে সকল অঙ্গীকারে ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলা ভাষাকে সমুন্নত রাখতে চেষ্টা করতে হবে।
আজ এদেশের সর্বক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সাহিত্য সংস্কৃতি ,ইতিহাস ও ঐতিহ্যের উপড় ভিত্তি করে গড়ে তোলা আমাদের মাতৃভাষার মাধ্যমে সংস্কৃতিবান ও আধুনিক আলোকিত মানুষ গড়ে তোলা সম্ভবপর হবে যদি মাতৃভাষা চর্চায় আমরা সবাইকে নিয়ে এগিয়ে আসি। তবেই একুশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্য দিয়ে আমরা একটা সুন্দর সমাজ, দেশ ও আদর্শবান জাতি হিসেবে নতুন পরিচয়ে অভিষিক্ত করতে পারবো নিজেদের একুশের মুক্তির চেতনাবাহী ধারার মধ্য দিয়ে। যে ধারা অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই। কারণ, মানুষের একটি ভাষা দীর্ঘকাল সমাজ ও সভ্যতার মাঝে টিকে থাকে ভাষা ও সংস্কৃতির বিপুল বিকাশ তার অধ্যায়ণ, মুল্যায়ন, চর্চা, সকলের গ্রহণের মধ্য দিয়ে।
তাই, একুশের প্রোজ্জল শিখাকে সমুন্নত রাখতে বাঙালি জাতিস্বত্বার বোধ, বাঙালি সংস্কৃতি,কৃষ্টি, সভ্যতাকে সমুজ্জল রাখতে সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধে নিজস্ব পরিচয়ে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের । নিজস্ব সংস্কৃতির ভিক্তিতে বাঙালি জাতীয়বাদী চেতনাকে শক্তিশালী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মনে ধারণ করতে পারলেই তবেই রাষ্ট্র ও সমাজে একুশের চেতনার নতুন পরিচয় ও ফলপ্রসু সুফল আমরা দেখতে পাবো অচিরেই। সপ্তদশ শতাব্দীর কবি আবদুল হাকিমের ভাষায় বলতে হয়-

‘যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী
সে সবার রীতি নির্ণয় না জানি
মাতা পিতা ক্রমে বঙ্গেতে বসতি।
দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি
দেশী ভাষা বিদ্যা ঘরে মনে না জুড়ায়
নিজ দেশ ত্যাগী কেন বিদেশ না যায়’।

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক।

Did you find apk for android? You can find new Free Android Games and apps.

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.