পথ শিশু এবং আগামী বাংলাদেশ

0
Want create site? Find Free WordPress Themes and plugins.

মো.মুজিব উল্ল্যাহ্ তুষার:
এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান,
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তুপ-পিঠে
চলে যেতে হবে আমাদের ।
চলে যাব-তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপনে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি–
নব জাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার ।
কবিতায় শিশুদের জন্যে পৃথিবীকে বসবাস উপযোগী করে যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার করেছিলেন কবি সুকান্ত বহুকাল আগে। কিন্তু যার কিংবা যাদের সবার আগে এই অঙ্গীকার করা উচিত ছিলো সেই রাষ্ট্/সরকার কিংবা রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে চিরকাল উদাসীন ছিলো, এখনো তাই আছে। ঘুরে ঘুরে দিন-মাস-বছর গেছে, সরকার বদল হয়েছে কিন্তু কবিতায় করা অঙ্গীকার কবিতার পাতাতেই আটকে থেকেছ। রাষ্ট্র কিংবা সরকার সেই অঙ্গীকারের ধারে কাছেও ঘেঁষার চেষ্টা করেনি কোনদিন।

জাতিসংঘের শিশু সনদ ও আমাদের দেশের শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সীদের কে শিশু বলা হয়েছে। বিভিন্ন তথ্য মতে বাংলাদেশে জন্যসংখ্যার প্রায় ৪৫% ভাগ শিশু। যার ৪০% শিশু বাস করে দারিদ্র সীমার নিচে। দেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা এখন প্রায় ৭৯ লাখ। শিশু শ্রমিক ছাড়াও রয়েছে পথ শিশু। যাদের নিদিষ্ট কোন ঠিকানা নেই, রেলস্টেশান, ফেরিঘাট কিংবা বাস স্টেশান যাদের ঠিকানা।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ও মোস্ট অ্যাট রিস্ক অ্যাডেলেসেন্ট (এমএআরএ) নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সময়ে জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে চার লাখ ৪৫ হাজার পথ শিশু আছে। কিন্তু বেসরকারী ভাবে পরিচালিত নানান জরিপে এই পথ শিশুর সংখ্যা দশ লক্ষের অধিক। সরকারী তথ্য মতে পথ শিশুদের মধ্যে রাজধানীতে থাকে তিন লাখেরও বেশি। শিশু শ্রমের সাথে জড়িত ৭৯ লাখ শিশু এবং প্রায় ১০ লক্ষ পথ শিশু অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি শিশু স্কুলে যায় না। এ বিশাল জনগোষ্ঠিকে শিক্ষা-খাদ্য-বাসস্থান সহ জীবনের সকল মৌলিক অধিকার থেকে দূরে রেখে কাঙ্খিত উন্নয়ন কি করে সম্ভব?

গত কয়েক দশকে বাংলাদের আর্থ-সামজিক অবস্থার বিস্ময়কর উন্নতি হয়েছে, শিক্ষার হার বেড়েছে, রিজার্ভ ব্যাংক ফুলে উঠেছে। জাতীয় প্রবৃদ্ধি নামক অচিন পাখিও তরতর করে বেড়ে চলছে। কিন্তু এত সব অর্জন কোন কাজে আসেনি সুবিধা বঞ্চিত পথ শিশুদের। দিন দিন বেড়েই চলেছেে এই সংখ্যা। যে শিশুরা শৈশব আর কৈশোরের অবাধ স্বাধীন জীবনকে বিসর্জন দিয়ে দু-মুঠো ভাতের জন্যে পথে পথে ঘুরছে, কামলা দিচ্ছে, তাদের কাছে রিজার্ভ ব্যাংক আর প্রবৃদ্ধি ফাঁকা বুলি ছাড়া কিছু না। রাজনৈতিক নেতাদের নানান আলোচনা কিংবা বক্তিতায় শুনি দেশ ডিজিটাল হওয়ার কারণে নাকি অনেক দূর এগিয়ে গেছে, আমি অল্পবুদ্ধির মানুষ তাই রাজনৈতিক নেতাদের ডিজিটাল আমি ঠিক বুঝি না! আমার সল্প জ্ঞানে যতটুকু বুঝি তা হলো দেশের একটি মানুষও যতদিন পর্যন্ত শিক্ষা-খাদ্য-চিকিৎসা-বাসস্থান সহ মৌলিক অধিকারের বাইরে থাকবে ততদিন পর্যন্ত ডিজিটাল দেশ একটা মিথ্যে লোক দেখানো বুলি হয়ে থাকবে। যে বয়সে এই সমস্ত শিশুদের যাওয়ার কথা ছিলো স্কুলে, বন্ধুবান্ধবের সাথে খেলার মাঠে উৎসবে মেতে উঠার কথা সেই বয়সে তাদের কে নামতে হয়েছে জীবনযুদ্ধে। আমরা সবাই জানি অভাবের তাড়নায় এরা জড়িয়ে পড়ছে অপরাধের জগতে, মাদকের জগতে। বাংলাদেশে যত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে তার প্রায় সবটুকু এদের দ্বারা সংঘটিত হয়ে থাকে, এমনকি রাজনৈতিক সহিংসতায় এরাই প্রধান সেনা। গাড়িতে আগুন দেওয়া, বোমা মারা, ভাঙচুর করার কাজগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা এদের দ্বারাই সংঘটিত করিয়ে থাকে। মাত্র চার-পাঁচশ টাকার জন্যে এরা মানুষ খুন করতে পারে অবলীলায়। শৈশব থেকেই অন্ধকার অনিশ্চিত একটা পৃথিবীর দিকে তাদের যাত্রা শুরু হয় আর সেই অন্ধকার জীবনের সুযোগ নেয় নষ্ট-ভ্রষ্ট রাজনৈতিক নেতারা।
এত বিপুল সংখ্যক একটা জন গোষ্ঠিকে খাদ্য-শিক্ষা-বাসস্থান সহ নিরাপদ একটা শৈশব থেকে বঞ্চিত করে কি করে আলোকিত বাংলাদেশ হবে? এত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় নিয়ে কোন দল/সরকারের কোন কালে মাথা ব্যাথা দেখলাম না। অথচ একটু পরিকল্পনা মাফিক আন্তরিকতার সহিত কাজ করলে কয়েক বছরের মাঝেই এই পথ শিশু শূন্যের কোটায় আনা সম্ভব। কিভাবে সেটি সম্ভব?

প্রতিটি জেলায় না হোক অন্তত বিভাগীয় শহরগুলোতে অন্তত একটি করে পথ শিশু সেন্টার গড়ে তুলতে হবে সবার আগে, ঢাকা-চট্রগ্রামে একের অধিক। এইসব সেন্টারে অন্ন-বাসস্থান আর শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা দেওয়া হবে। পথ শিশুদের মূলস্রোতে নিয়ে আসতে রিজার্ভ ব্যাংকে হাত দিতে হবে না। শুধু মাত্র আন্তরিকতা আর ভালোবাসা থাকলেই এ কাজটি করা সম্ভব। আমি ব্যাক্তিগত ভাবে কিছু প্রস্তাব রাখছি, আপনারা নিজেরাও নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে পরামর্শ জানাতে পারেন। সবার অংশগ্রহনে একটা খসড়া তৈরি করা যায়। আমরা আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটের ইশতেহারে এই বিষয়টা অর্ন্তভুক্তির দাবি জানাতে পারি। সারা দেশে এই বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে কাজ করা যায়।
১। পথ শিশুদের জন্যে জাতীয় বাজেটে একটা ফান্ড রাখা হবে অর্থাৎ তাদের জন্যে আলাদা একটা বাজেট থাকবে।
২। মোবাইল কিংবা বাড়ি-জমির কর বাড়িয়ে ওদের জন্যে ফান্ডের অর্থ সংগ্রহ করা যেতে পারে।
৩। রেমিট্যান্সের একটা নিদিষ্ট অংশ (১০-১৫%) এ কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
৪। কালো টাকা সাদা করার ক্ষেত্রে ১০% ভাগ পথ শিুশর জন্যে ফান্ডে দিয়ে সাদা করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। (কালো টাকা তো এই দেশে সাদা হয় ই কোন না কোন পথে)
৫। সমাজের উচ্চবিত্ত এবং বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ফান্ড সংগ্রহের কাজে যুক্ত করা যেতে পারে।

এগুলো করা কি খুব কঠিন? আমার মনে হয়না, এগুলো করা খুব কঠিন। ওদের জন্যে ভালোবাসা টা হৃদয় থেকে আসলে, সবার জন্যে মোটমুটি সাম্য একটা সমাজ ব্যবস্থা চাইলে (যেখানে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যটা কম থাকবে) এবং রাজনীতি থেকে সহিংসতা দূর করতে চাইলে এ কাজটি করা অসম্ভব কিছু না। ঈদ আর শীতকাল আসলে দেখি এই সব শিশুদের জন্যে একদিনের ভালোবাসা প্রকাশে রাষ্ট্র কিংবা কিছু প্রতিষ্ঠান ফটোসেশানে ব্যস্ত হয়ে যায়। অসহায়দের মাঝে কম্বল বিতরণ, নতুন কাপড় বিতরণের সময়কার বিশ্বজয়ের ছবি পত্রিকা কিংবা ফেসবুকে দেখি। এ লোক দেখানো একদিনের বিতরণ তাদের জীবনে কোন পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে না এবং পারবেও না কোনদিন। তাই স্থায়ী সমাধানের দিকে যেতে হবে আর সেই সমাধানটি হলো তাদের জন্যে খাদ্য-শিক্ষা-বাসস্থান নিশ্চিতকরণ। আর সেটি করতে পথ শিশু সেন্টার গড়ে তুলতে হবে। সেটি করতে পারলেই আগামীর বাংলাদেশে কমে আসবে ধনী-দারিদ্রের বৈষম্য, কমে আসবে অপরাধ। সত্যিকার আলোকিত এক বাংলাদেশ গড়তে চাইলে অবশ্যই পথ শিশুদের জন্যে শিক্ষা-বাসস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে।

( সাংবাদিক, সংগঠক ও মানবাধিকার কর্মী)

Did you find apk for android? You can find new Free Android Games and apps.

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.