ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন: সর্বাত্মক প্রস্তুতিতে বিএনপি

0

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি, পাল্টাপাল্টি মিছিল, সহিংস সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ডে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে নির্বাচনি পরিবেশ। এসব ঘটনার প্রভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনি রাজনীতি উত্তপ্ত হওয়া বাংলাদেশে নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে এবারের পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক। তফসিল ঘোষণার পরদিনই গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীতে ঢাকা–৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির ওপর গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটে। প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। তবে ১৮ ডিসেম্বর রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সারাদেশে বিক্ষোভ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষুব্ধরা বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগ চালায়। একইসঙ্গে হামলা, ভাঙচুর ও আগুনের হাত থেকে রেহাই পায়নি গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানও। এসব ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

এর বাইরে দেশের বিভিন্ন স্থানে নৃশংস সহিংসতার ঘটনাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। গত ৪৮ ঘণ্টায় লক্ষ্মীপুরে বসতঘরের বাইরে থেকে তালা দিয়ে আগুন লাগিয়ে একটি শিশুকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। একই সময়ে ময়মনসিংহে এক যুবককে পিটিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যার খবর পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

লক্ষ্মীপুরের ঘটনাটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, একাধিক দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে এবং জড়িতদের শনাক্তে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

ময়মনসিংহের ভালুকায় ঘটে যাওয়া ঘটনাটি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ তুলে দিপু চন্দ্র দাস (২৭) নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, হঠাৎ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি মানুষের মধ্যে ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। রাজনৈতিক মতভেদ স্বাভাবিক হলেও সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড নির্বাচনকালীন স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তবে সে জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি শিথিলতা দেখায়, অপরাধীরা আরও সক্রিয় হয়ে উঠবে।

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটলিয়নের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে র‌্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় দুই শতাধিক টহল দল মাঠে রয়েছে। সহিংসতা ও নাশকতার অভিযোগে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ময়মনসিংহের ঘটনায় ইতোমধ্যে সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম জানান, নির্বাচন সামনে রেখে পুলিশ পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের সঙ্গেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাসউদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট প্রধানদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বৈঠক রয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। লক্ষ্য হলো এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে ভোটাররা নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবেন।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.