চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৪১ জন। রাঙামাটিতে মৃতের সংখ্যা ৯৮ থেকে বেড়ে ১০৬-এ পৌঁছেছে। রাঙামাটি থেকে ১০৬ জন, চট্টগ্রাম থেকে ২৯ জন, বান্দরবানে ছয়জন এবং খাগড়াছড়ি থেকে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের হিসেব মতে পাহাড় ধস, জলোচ্ছাস, দেয়াল চাপা পড়ে চট্টগ্রামে মহানগরী ও জেলায় সর্বমোট ২৯ জন নিহত হয়েছেন।নিহত প্রত্যেক ব্যক্তির পরিবারকে নগদ ২০ হাজার টাকা এবং ত্রিশ কেজি করে চাল প্রদান করা হয়েছে। আহতদের পরিবারকে দেয়া হয়েছে নগদ ৫ হাজার টাকা করে। এছাড়া প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে রাঙ্গুনিয়া ও রাউজান উপজেলার জন্য ১০ টন করে ২০ টন, চন্দনাইশ উপজেলার জন্য ৫ টন এবং লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া উপজেলার জন্য ৩ টন করে ৬ টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে।
বান্দরবানের কালাঘাটা এলাকায় তিনটি স্থানে পাহাড়ধসে তিন শিশুসহ ছয়জন নিহত হয়ছে। রাঙামাটিতে নিহতদের মধ্য মানিকছড়ি আর্মি ক্যাম্পের দুই সেনা কর্মকর্তাসহ চার সেনা সদস্যও রয়েছেন।উদ্ধারকাজ চালানোর সময় পাহাড়ধসের কবলে পড়েন তাঁরা। শুধু চট্টগ্রাম রাঙ্গুনিয়াতেই মারা গেছে ২১ জন। নিখোঁজ রয়েছে সাতজন।

আজ বুধবার রাঙামাটি থেকে আরও আটজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ভেদভেদি থেকে মা-মেয়েসহ পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মায়ের নাম পন্তি সোনা চাকমা (৩৫) ও মেয়ের নাম সান্ত্বনা চাকমা (৯)। যুব উন্নয়ন এলাকা থেকে একই পরিবারের তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন রুপালি চাকমা (৩৫) ও তাঁর দুই মেয়ে জুঁই চাকমা (১২) ও ঝুমঝুমি চাকমা (৭)। রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক প্রকাশ কান্তি চৌধুরী জানান, রাঙামাটিতে মৃতের সংখ্যা ৯৮ থেকে বেড়ে ১০৬-এ পৌঁছেছে। এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্যমতে, ভারী বর্ষণের ফলে রাঙ্গুনিয়ায় পাহাড় ধসে ১৬ (ষোল) জন, পাহাড়ি পানির ঢলে ০৬ (ছয়) জন, চন্দনাইশে পাহাড় ধসে ০৪ (চার) জন, রাউজানে পাহাড়ি পানির তোড়ে ০১ (এক) জন এবং গতকাল রাতে আকস্মিক টর্নেডোয় বাঁশখালীতে ঘরের দেয়াল ধসে ০১ (এক) জন, চট্টগ্রাম মহানগর এর উত্তর হালিশহর ২৬ নং ওয়ার্ডে ঘরের দেয়াল ধসে ০১ (এক) জনসহ সর্বমোট ২৯ (ঊনত্রিশ) জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া, চন্দনাইশে ০২ (দুই) জন, উত্তর হালিশহরের ২৬নং ওয়ার্ডে দেয়াল ধসে ০৫ জন, বাঁশখালীতে ০২ (দুই) জনসহ মোট ০৯ (নয়) জনআহত হয়েছেন এবং রাঙ্গুনিয়ায় ০৪ (চার) জন নিখোঁজ রয়েছেন। পাহাড় ধস শুরু হবার পর মহানগর এবং উপজেলাগুলোর পাহাড়ি এলাকা এবং পাহাড় সংলগ্ন অবৈধ বসতিগুলো থেকে প্রায় ৫০০ পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে সরানো হয়েছে।
প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির পরিবারকে নগদ ২০,০০০/- (কুড়ি হাজার) টাকা এবং ত্রিশ কেজি চাল প্রদান করা হয়েছে। প্রত্যেক আহত ব্যক্তিকে নগদ ৫,০০০/- (পাঁচ হাজার) টাকা প্রদান করা হয়েছে। আহতদেরকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে রাঙ্গুনিয়া ও রাউজান উপজেলার জন্য ১০(দশ) টন করে ২০(কুড়ি) টন, চন্দনাইশ উপজেলার অনুকূলে ০৫(পাঁচ) টন এবং লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া উপজেলার অনুকূলে ০৩ (তিন) টন করে ০৬ (ছয়) টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকার লোকজনকে সরিয়ে নেয়ার কাজ এবং উদ্ধার তৎপরতা কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক সমন্বয় করা হচ্ছে। পাহাড় ধ্বস, জলাবদ্ধতা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত কারণে ক্রমাগত ক্ষয়-ক্ষতির সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। এ বিষয়ে সময়ে সময়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রেরণ করা হবে।
সোমবার রাত ও গতকাল ভোরে পাহাড়ধসের এসব ঘটনা ঘটে। পরে বৃষ্টির মধ্যেই সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় লোকজন উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। তবে বৃষ্টির কারণে দুর্গম এলাকায় তাত্ক্ষণিকভাবে উদ্ধারকাজ শুরু করা যায়নি। ফলে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায়নি। মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয়রা জানিয়েছে, অনেক জায়গায় ধসের মাটি সরানো যায়নি।
রাঙামাটি শহরের বিভিন্ন এলাকায় বেলা ১১টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টায় শহরের ভেদভেদি, রাঙ্গাপানি, যুব উন্নয়ন, টিভি স্টেশন, রেডিও স্টেশন, রিজার্ভ বাজার, মোনঘর, শিমুলতলি ও তবলছড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। আজ সকাল নয়টার দিকে ঘটনাস্থলের দিকে ফায়ার সার্ভিসের দুটো গাড়িকে যেতে দেখা গেছে।
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শোক:
পাহাড়ধসে হতাহতের ঘটনায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। খবর পেয়ে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক গতকাল বিকেলেই ঘটনাস্থলে পৌঁছেন। তিনি উদ্ধার কার্যক্রম পরিদর্শন করেন এবং হতাহত সেনা সদস্য ও তাঁদের শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আজ বুধবার রাঙামাটির দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করবেন।
জাতীয় সংসদে শোক:
চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও বান্দরবানের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে শতাধিক ব্যক্তির প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে জাতীয় সংসদ। আজ বুধবার স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী অধিবেশনের শুরুতেই জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকে এই শোক প্রকাশ করেন।
ইইউ রাষ্ট্রদূতের শোক:
চট্টগ্রাম ও পার্বত্য তিন জেলায় পাহাড়ধসে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনায় ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদুন গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। আজ এক বিবৃতিতে তিনি নিহত ব্যক্তিদের আত্মার শান্তি কামনা করেন। প্রয়োজনে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব উপশমে ইইউ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন এই রাষ্ট্রদূত।