প্রাণের টানে বাড়ি ফিরছেন ঈদের ঘরমুখো মানুষ

0

 প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ আনন্দ উপভোগ করতে সঙ্গে নিয়ে গেছেন নানা উপহার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। বৃষ্টি, ভাঙাচোরা সড়ক, অপ্রতুল গণপরিবহন এবং পথে পথে যানবাহনে বাড়তি ভাড়া সত্ত্বেও থেমে নেই ঈদ আনন্দযাত্রা।

এত দুর্ভোগ পেরিয়ে যখন ঘরমুখো মানুষ কাক্সিক্ষত বাস, ট্রেন বা লঞ্চে উঠেছেন, তখন তাদের চোখে-মুখে ছিল আনন্দ ও তৃপ্তির ছাপ।এবার মহাসড়কগুলোয় তেমন যানজট না থাকায় অনেকটা স্বস্তিতে বাড়ি গেছেন যাত্রীরা। তবে ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানবাহনের বাড়তি চাপ ছিল।

শিমুলিয়ায় ঘাটে যানবাহনের দীর্ঘ সিরিয়াল ছিল। গণপরিবহনের সংকট থাকায় অনেকে ট্রাকে চড়েও গন্তব্যের দিকে রওনা হয়েছেন। কমলাপুর থেকে কয়েকটি ট্রেন ছাড়া বাকিগুলো ছেড়ে গেছে নির্ধারিত সময়ে। সব ট্রেনে ছিল যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়।একই চিত্র দেখা গেছে ঢাকা সদরঘাটে। দক্ষিণাঞ্চলগামী লঞ্চগুলোর ছাদেও ঝুঁকি নিয়ে গন্তব্যে গেছেন অনেকেই। বেশিরভাগ লঞ্চে যাত্রী ভরে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই ছাড়তে বাধ্য করেছে প্রশাসন।

এদিকে রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাসস্ট্যান্ড, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ও সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে বৃহস্পতিবার সকালে ভিড় ছিল না। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং কলকারখানায় ছুটি হওয়ার পর বিকাল থেকে এসব টার্মিনালে মানুষের ঢল দেখা গেছে।

সন্ধ্যা হতেই প্রতিটি টার্মিনাল যাত্রীতে টইটম্বুর ছিল। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে আনফিট বাস চলাচল ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়েরও হিড়িক পড়ে। গাবতলীতে গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট না থাকা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগে কয়েকটি বাস কর্তৃপক্ষকে জরিমানা করেছেন মোবাইল কোর্ট।

রংপুর যাওয়ার উদ্দেশে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে এসেছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, বৃষ্টিতে ঢাকায় কাবু হয়ে গেছি। ধানমণ্ডি থেকে গাবতলী আসতেই সিএনজিচলিত অটোরিকশা ভাড়া নিয়েছে চারশ’ টাকা। অনেক ঘোরাঘুরির পর হানিফ পরিবহনের টিকিট পেয়ে খুব ভালো লাগছে।

তিনি বলেন, মাকে কথা দিয়েছি, যেভাবেই হোক বাড়ি ফিরব। তাই বৃষ্টিতে ভিজেই রওনা হয়েছি। এদিকে রাস্তার কারণে মহাসড়কে কোনো যানজট নেই বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। যানজট এড়াতে মহাসড়কে যারাই উল্টোপথে গাড়ি চালাবে, তাদের বিরুদ্ধে পুলিশকে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন তিনি।

বৃহস্পতিবার মহাখালী বাসটার্মিনাল পরিদর্শন শেষে তিনি এ কথা বলেন।এর আগে মন্ত্রী যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেন।মন্ত্রী বলেন, দেশের সড়ক ও মহাসড়কগুলোয় যানজট নেই। ঈদে ঘরমুখো মানুষ অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে বাড়ি ফিরছেন। সব সড়ক যানবাহন চলাচলের উপযোগী আছে।

যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেয়ার অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গেই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ঈদে বাসযাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়ার মুখে গুম-খুনের কথা শোভা পায় না। তাদের ইতিহাস ঘাঁটতে বেশি দূর যেতে হবে না। ২০০১ সালে তারা ক্ষমতায় ছিল, সে সময়ে আওয়ামী লীগের শত শত নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে। তাদের ফিরিয়ে দিতে পারবেন? কাজেই কেঁচো খুঁড়তে বিষধর সাপ বেড়িয়ে আসবে।

খালেদা জিয়ার উদ্দেশে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, গুম-খুনের কথা বলেন, আপনি ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিনকে ফিরিয়ে দিন, আমাদের আহসান উল্লাহ মাস্টার, মমতাজ উদ্দিন, আইভি রহমানকে ফিরিয়ে দিন। পারবেন ফিরিয়ে দিতে? তাই আর যাই হোক, আপনার মুখে গুম-খুনের কথা মানায় না।

বাড়তি ভাড়া : যাত্রীদের বাড়তি চাপের সুযোগে কয়েকটি বাসে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।বরিশালের যাত্রী আবদুল্লাহ আল কাফি অভিযোগ করেন, ঈগল পরিবহনের বাসে বরিশাল পর্যন্ত ভাড়া নেয়া হচ্ছে ৬২০ টাকা। সাধারণ সময়ে ওই ভাড়া ৪৫০ টাকা।

এ বিষয়ে বাস কাউন্টারের টিকিট বিক্রেতারা বলেন, ভাণ্ডারিয়া পর্যন্ত বাসের টিকিট ৬২০ টাকা। বরিশাল গেলেও ওই ভাড়াই আদায় করছি। কারণ বরিশাল থেকে ভাণ্ডারিয়া পর্যন্ত যাত্রী পাওয়া যায় না। ওই টিকিট বিক্রেতা আরও জানান, বিভিন্ন রুট থেকে ঢাকায় বাস আসার সঙ্গে সঙ্গে ওই সব বাসের টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। যানজটের আশঙ্কায় এসব গাড়ির টিকিট আগে বিক্রি করিনি। এখন যানজট না থাকায় গাড়িগুলো ভালোভাবেই ফিরছে।

বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ভাড়া যাই-ই হোক, যশোর যাওয়ার গাড়ির টিকিট পাচ্ছি না। দীর্ঘ সময় শৌখিন পরিবহনের সামনে অপেক্ষায় আছি।তিনি বলেন, টাকা ফ্যাক্টর নয়, গন্তব্যে যাওয়াই টার্গেট। শৌখিন কাউন্টারের ম্যানেজার সাইফ বলেন, আরিচা-মানিকগঞ্জে যানজটের কারণে গাবতলী টার্মিনালে গাড়ি আসতে পারছে না। কখন আসবে, তা-ও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না।

এদিকে বাড়তি ভাড়া আদায় ও গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় গাবতলীর হানিফ এন্টারপ্রাইজ ও সুমন ডিলাক্স পরিবহনকে ১৪ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গাড়ির রুট পারমিট ও অন্যান্য কাগজ না থাকায় হানিফ পরিবহনকে ১২ হাজার ও বাড়তি ভাড়া আদায় করায় সুমন ডিলাক্সকে ২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

ট্রেনের ছাদে যাত্রী : সরেজমিন কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে দেখা গেছে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। প্রতিটি ট্রেনের ছাদে যাত্রী দেখা গেছে। সিট না পেয়ে এসব যাত্রী ছাদে উঠেছেন বলে জানান। ছাদ ছাড়াও ইঞ্জিন ও দুই বগির সংযোগস্থলেও ঝুলে যেতে দেখা গেছে।

কমলাপুর রেলওয়ের স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী জানান, অফিস শেষ হওয়ায় বৃহস্পতিবার যাত্রীর চাপ বেশি ছিল। আমরা যাত্রীদের ছাদে না ওঠার জন্য অনুরোধ জানিয়েছি।

অপরদিকে বৃহস্পতিবার সকালে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে কিছু ট্রেন বিলম্বে ছেড়ে গেছে। সকালে রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস, খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস এবং রংপুর এক্সপ্রেস নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে ছেড়ে গেছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক যাত্রী। আবার অনেকে দেরিতে হলেও গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হতে পেরে খুশি।

রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. হাবিবুর রহমান জানান, চিলাহাটিগামী নীলসাগর ট্রেন আড়াই ঘণ্টা, রংপুর এক্সপ্রেস দুই ঘণ্টা, ধূমকেতু এক্সপ্রেস এক ঘণ্টা ও সুন্দরবন এক্সপ্রেস দেড় ঘণ্টা দেরি করে ছেড়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন গন্তব্যের কয়েকটি ট্রেন ১৫ থেকে ২০ মিনিট দেরি করে স্টেশন ছেড়ে গেছে।

যাত্রী ভরপুর হলেই ছেড়ে যাচ্ছে লঞ্চ : বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রীদের মোটামুটি ভিড় দেখা গেলেও বিকালে তা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। লঞ্চে যাত্রী ভরপুর হলেই তা নির্ধারিত সময়ের আগেই ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে ৬২টি লঞ্চ ছেড়ে যায়। গভীর রাত পর্যন্ত প্রায় দেড়শ’ লঞ্চ গেছে। এর আগের দিন বুধবার লঞ্চ গেছে ১১৭টি।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, যাত্রী নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। এ কারণে আড়াই শতাধিক পুলিশ ও র্যা ব সদস্য সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। পল্টুনে সিসি ক্যামেরা রয়েছে। পাশাপাশি নৌপথে দুর্ঘটনা এড়াতে লঞ্চে যাত্রী হলেই তা ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ঈদের সময়ে যাত্রী চাপ থাকায় নির্ধারিত সময়ে লঞ্চ ছাড়ার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না।ঢাকা নদীবন্দরে দেখা গেছে, তুষখালীগামী মানিক-১, ঝালকাঠিগামী এমভি ফারহান, ভাণ্ডারিয়াগামী টিপু, হুলারহাটগামী রাজদূত-৭সহ অর্ধশতাধিক লঞ্চে যাত্রী তোলা হচ্ছে। এসব লঞ্চে ছাদেও যাত্রী ছিল। তবুও যাত্রী তুলতে দেখা গেছে।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.