বাংলাদেশকে ‘হাই রিস্ক কান্ট্রি’ বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করে ইউরোপে পণ্য পরিবহন দেশের তালিকা হালনাগাদ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। গত সোমবার ঢাকায় ইইউয়ের একটি প্রতিনিধিদল বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সঙ্গে দেখা করে এ তথ্য জানিয়েছে।
একই দিনে বিষয়টি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কেও জানিয়েছে বেবিচক। মন্ত্রণালয় হয়ে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত গড়িয়েছে বলে জানা গেছে।
গত সোমবার ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদুনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সিভিল এভিয়েশন অথরিটি’র চেয়ারম্যান এহসানুল গনি চৌধুরীসহ এভিয়েশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। সেখানে ইইউ’র বিধি-নিষেধের বিষয়ে চেয়ারম্যানকে অবহিত করা হয়। বৈঠকে ঢাকায় নিয়োজিত ইইউ রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদুও উপস্থিত ছিলেন।
সিভিল এভিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে কুয়েত, সোমালিয়া, মিশর ও ইয়েমেনকে উচ্চ ঝুঁকির দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ইইউ। এ কারণে উড়োজাহাজে করে কার্গো পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তল্লাশি বাড়ানোর অনুরোধ করেছে ইইউ। বিমানবন্দরে বিস্ফোরক শনাক্তকরণ যন্ত্র যুক্ত করার তাগিদও দিয়েছে তারা।
বৈঠকে মায়াদু জানান, সম্প্রতি ইইউয়ের সিদ্ধান্তের আলোকে বাংলাদেশকে ইইউ কমিশন ইপ্লিমেন্টিং রেগুলেশন (ইইউ) ২০১৫/১৯৯৮-এ বর্ণিত অ্যাটাচমেন্ট ৬-১-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ অন্তর্ভুক্তির ফলে ইউরোপীয় কমিশন বাংলাদেশ থেকে আকাশ ও নৌপথে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে পাঠানো সব কার্গো ও মেইলের চালান উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কার্গো ও মেইল হিসেবে বিবেচনা করবে। তাই বাংলাদেশ থেকে ইইউভুক্ত যেকোনো দেশে আনলোড, ট্রানজিট অথবা ট্রান্সফারের উদ্দেশে বহন করা সব কার্গোকে তিন স্তরে নিরাপত্তা তল্লাশি করতে হবে। এগুলো হচ্ছে বিস্ফোরক শনাক্তকরণ পদ্ধতি (ইডিএস) দিয়ে সব কার্গো ও মেইল শতভাগ তল্লাশি করা, শতভাগ এক্স-রে স্ক্যানিং ও শতভাগ এক্সপ্লোসিভ ট্রেস ডিটেকশন (ইটিডি) এবং শতভাগ এক্স-রে স্ক্যানিং বা বিস্ফোরক শনাক্তকারী কুকুর দিয়ে কার্গো ও মেইল তল্লাশি করা।
ইইউ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের দেওয়া নিরাপত্তা তল্লাশির শর্ত পূরণ করা না হলে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কোনো কার্গো ইইউতে প্রবেশ করতে পারবে না। শিগগির এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। সে ক্ষেত্রে অন্য কোনো দেশে কার্গো ও মেইল তল্লাশি করে তা ইউরোপে পাঠানো যাবে। তবে এর জন্য যে অতিরিক্ত খরচ হবে তা বাংলাদেশকে বহন করতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে ইইউভুক্তসহ অন্য দেশগুলোতে যেসব কার্গো যায় সেগুলোর নমুনা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তল্লাশি করা হয়। কোনো কার্গো বা পণ্য আকাশপথে সরাসরি যুক্তরাজ্যে এবং জার্মানিতে প্রবেশ করতে পারে না। গত বছর দেশ দুটি এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এ নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ওঠার আগেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউরোপভুক্ত অন্যান্য দেশ নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দিতে যাচ্ছে।
আকাশ ও নৌপথে পরিবহন করা কার্গোর ক্ষেত্রে তল্লাশির শর্ত আরোপের কথা বাংলাদেশকে জানিয়েছে ইইউ। তারা বলেছে, যে ধরনের স্ক্যানিং করে কার্গো বিমানে তোলা হয়, সে ধরনের স্ক্যানিং করেই সমুদ্রগামী জাহাজে কার্গো তুলতে হবে। জাহাজের কার্গো তোলার ক্ষেত্রে আংশিক স্ক্যানিং চলবে না।
ইইউয়ের এমন সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইউরোপের যুক্তরাজ্য ও জার্মানি ছাড়াও ইতালি, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্সে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ গার্মেন্টস সামগ্রী রপ্তানি করা হয়। এ ছাড়াও পাট, কাচা পণ্য ও হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি করা হয়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে তৈরি পোশাক শিল্প। মোট প্রবৃদ্ধির ছয় থেকে আট শতাংশ আসে এ খাত থেকে। আর পোশাক শিল্পের প্রায় পুরোটাই রপ্তানি হয় সমুদ্র পথে।
বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, ইইউ নৌ পথে পণ্য পরিবহনে বিধি-নিষেধ দিলে অন্যান্য দেশও তা অনুসরণ করতে পারে। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা উন্নয়নে বাংলাদেশ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। যুক্তরাজ্যের বেসরকারি একটি নিরাপত্তা সংস্থাকে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। এ ছাড়া আড়াই শতাধিক কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশেষ বাহিনীও গঠন করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও ইই আকাশ পথে কার্গো পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা চিন্তা করছে। অস্ট্রেলিয়াসহ আরো কয়েকটি দেশ ইউরোপীয়দের অনুসরণ করছে। এ ক্ষেত্রে সমুদ্র পথে পণ্য রপ্তানির ওপর এ ধরনের বিধিনিষেধ এলে অন্যরাও তা অনুসরণ করবে।
উল্লেখ্য, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রায় এক বছর আগে ঢাকা থেকে সরাসরি কার্গো পরিবহন বন্ধ করে দেয় বৃটেন। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে বৃটিশ প্রতিষ্ঠান রেড লাইনকে নিয়োগ দেয়াসহ নানামুুখি উদ্যোগ নেয়া বাংলাদেশ। কিন্তু তার পরও বৃটেনের সেই নিষেধাজ্ঞা এখনও প্রত্যাহার হয়নি। এ অবস্থায় ইইউ’র ওই নতুন বিধি-নিষেধ এলো।
সোমবারের বৈঠকে বেবিচক চেয়ারম্যান ইইউ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেবিচক ইতিমধ্যে দুটি ইডিএস মেশিন কিনেছে। এগুলো দুই মাসের মধ্যে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া বর্তমানে ছয়টি ডুয়েল ভিউ এক্স-রে স্ক্যানিং মেশিনসহ পর্যাপ্ত ইটিডি মেশিন রয়েছে। পাশাপাশি সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ডিএমপি, ৎসব, বিজিবিএর সহায়তায় স্বল্প পরিসরে বিস্ফোরক শনাক্তকারী কুকুর (ইডিডি) ব্যবহার করে একটি টিম মোতায়েন করা হয়েছে। বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধীনে একটি নতুন ইডিডি টিম গঠনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এ নিয়ে গতকাল নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, প্র্যাকটিক্যালি আমাদের উপর কোনো কার্গো ব্যান্ড (নিষেধাজ্ঞা) আরোপ করা হয়নি। এটা হয়েছে যে, বাংলাদেশ অ্যাজ এ হোল কান্ট্রি হিসেবে ইইউ হাইরিস্ক কান্ট্রি হিসেবে ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ হাই রিস্ক বা উচ্চ ঝুঁকির দেশগুলোর তালিকায় ইইউ বাংলাদেশকেও রেখেছে। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো চিঠিপত্র বা কোনো কমিউনিকেশন কখনই হয়নি। তারই পরিপ্রেক্ষিতে নিউজটা এসেছে। মন্ত্রী বলেন, সেখানে সেকেন্ডলি স্ক্যানিংয়ের ব্যাপারে বিমানকে তারা চিঠি দিয়েছে। বলেছে, সেকেন্ড ইন্সপেকশন বা পরিদর্শন হতে হবে। অ্যাজপার ইইউ রেগুলেশন। অর্থাৎ এটাই ইইউ’র নীতি। মন্ত্রী বলেন, এটা কেবল এয়ার কার্গোর ক্ষেত্রে নয়, শিপিংয়ের ক্ষেত্রেও তাই।
বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, আকাশ ও সমুদ্রপথে কার্গো পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে ইইউ তিনটি শর্ত দিয়েছে। এর মধ্যে ইটিডি সংযোগ, ইডিএফ সংযোগ ও ডগ স্কোয়াড রয়েছে। আমরা ইইউয়ের এসব শর্ত পূরণে কাজ করে যাচ্ছি। জুলাই কিংবা সর্বোচ্চ আগস্টের মধ্যে প্রথম দুটি শর্ত পূরণ করা হবে। আর ডগ স্কোয়াড নিশ্চিতকরণের কাজ ইতিমধ্যে চলছে। ইইউ গত সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে এসব শর্ত আরোপ করে। তবে তারা কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। তারা বলছে, এই তিন শর্ত পূরণে বাংলাদেশ ব্যর্থ হলে তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে কার্গো পণ্য পাঠাতে হবে। এ জন্য চার্জ দিতে হবে বাংলাদেশকে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইটিডি ও ইডিএফ যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। সেগুলো দেখার জন্য জুনে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল যুক্তরাষ্ট্রে যাবে। ’
মেনন বলেন, ইইউ বলেছে, হাইরিস্ক কান্ট্রি হওয়ার ফলে তিনটা অলটারনেটিভ ব্যবস্থা করবে স্ক্যানিংয়ের ব্যাপারে। একটা হলো এক্সপ্লোসিভ ডিটেকটিভ সিস্টেম (ইডিএস) দ্বারা সকল কার্গো ও মেইল শতভাগ তল্লাশি করা, শতভাগ এক্সপ্লোসিভ টেস্ট ডিটেককশন (ইটিডি) বা শতভাগ এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন ডগ (ইডিডি)।
সিভিল এভিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, হযরত শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিস্ফোরক শনাক্তকরণ যন্ত্রসহ আধুনিক স্ক্যানিং যন্ত্র বসানো প্রক্রিয়া চলছে। যাত্রীদের লাগেজ তল্লাশি, যানবাহন তল্লাশি, তরল বিস্ফোরক শনাক্ত করতে আলাদা আলাদা যন্ত্র বসানো হচ্ছে। বৃটিশ প্রতিষ্ঠান রেডলাইনের পরামর্শে এসব যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। এর মধ্যে বেশকিছু যন্ত্রপাতি সংযোজনের কাজ চলছে। এছাড়া বেশকিছু যন্ত্রপাতি শাহ্জালালে সংযোজন হয়েছে, কিছু সংযোজনের কাজ চলমান রয়েছে। বাকি যন্ত্রপাতি ঢাকায় এলে সংযোজন করা হবে। এর আগে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ২০১৬ সালের মার্চে হযরত শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সরাসরি কার্গো ফ্লাইট পরিচালনার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে যুক্তরাজ্য। এরপর যুক্তরাজ্যের পরামর্শে শাহ্জালালের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে বৃটিশ প্রতিষ্ঠান রেড লাইন। ইইউ’র শর্ত পূরণ না করলে কী হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে বিমানমন্ত্রী মেনন বলেন, এই মাল যখন যাবে তখন থার্ড কান্ট্রিতে ইডিএস ইন্সপেকশন হবে।
বিজেএমইএ সূত্রে জানা গেছে, শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কার্গো ভিলেজ থেকে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ টন কার্গো বিভিন্ন দেশে যায়। এর মধ্যে ৯০ শতাংশই তৈরি পোশাক। বাকি ১০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে ওষুধ ও পচনশীল বিভিন্ন পণ্য। ইইউ’র সিদ্ধান্তে বড় ধরনের আঘাত আসবে তৈরি পোশাক খাতে- এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।