সিটিং সার্ভিসের নৈরাজ্য বন্ধে যাত্রী কল্যাণ সমিতির ১২ দফা সুপারিশ

0

ন্যাশনালনিউজ২৪বিডি: ঢাকা মহানগরীর যাত্রীরা বাস-মিনিবাসে সিটিং সার্ভিসের নৈরাজ্যের শিকার হচ্ছে। ভাড়া নৈরাজ্য ও পিকআওয়ারে দরজা বন্ধ করে বাসচলাচলের কারণে মাঝপথের যাত্রীরা রোধবৃষ্টিতে ভিজে পুড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে গাড়ী পায়না। একই দুরত্বে একেক বাসে একেক হারে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। আবার সিটিং সার্ভিস গাড়ীর গায়ে লিখে সরকার নিধার্রিত ভাড়ার দিগুন, তিনগুন কোন কোন ক্ষেত্রে ৫ গুন পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করার পাশাপাশি বাদুড়ঝোলা করে যাত্রীও বহন করা হচ্ছে। একদিকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য, অন্যদিকে অতিরিক্ত যাত্রী বহন, তথা এইসব সিটিং গাড়ীতে দাড়িয়ে যাত্রী বহনের কারনে যাত্রী, চালক ও পরিবহন শ্রমিকদের সাথে প্রায়শ বশচা, হাতাহাতি-মারামারি ঘটনাও ঘটছে। কিছুদিন যাত্রীরা প্রতিবাদ করলেও প্রশাসন, মালিক ও শ্রমিক সংগঠন, বিআরটিএ বা পুলিশ কারো কোন সহযোগিতা না পেয়ে এক সময় এই নৈরাজ্যর কাছে যাত্রীরা আত্বসমর্পন করতে বাধ্য হচ্ছে।

আজ ৫ নভেম্বর সকালে নগরীর জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির আয়োজিত “সিটিং সার্ভিসের নামে নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানী বন্ধে” করনীয় শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এইসব কথা উঠে এসেছে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ঢাকা মহানগরীর যাত্রী সাধারনের দীর্ঘদিনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য পর্যবেক্ষন উপ-কমিটির ৫ সদস্যের একটি টিম গত তিন মাস ব্যাপী নগরীতে চলাচলরত ১০৩০টি বাস-মিনিবাসের যাত্রী সেবা, গাড়ীর অবস্থা, ভাড়া, পারিপাশ্বিক অবস্থাসহ সার্বিক বিষয়ে পর্যবেক্ষনের পাশাপাশি চালক, হেলপার, যাত্রী, মালিক সমিতি, শ্রমিক সংগঠন, ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিআরটিএ এর কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সরকার কর্তৃক বাস ও মিনিবাসে ভাড়া নির্ধারণ করা আছে। ঢাকা মহানগরীতে বাস ভাড়া (ব-সিরিজ) প্রতি কিঃমিঃ ১.৭০ টাকা ও মিনিবাস ভাড়া (জ-সিরিজ) প্রতি কিঃমিঃ ১.৬০ টাকা। সর্বনিম্ম ভাড়া ৩ কিঃমিঃ পর্যন্ত বড় বাসে ৭ টাকা, মিনিবাসে ৫ টাকা হলেও নগরীতে চলাচলরত ৯৬ শতাংশ বাস-মিনিবাস অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্যের সাথে জড়িত। তারা সরকার নির্ধারিত ভাড়া বা সর্বনিম্ম ভাড়া কিছুই মানেন না। নামমাত্র কিছু বাসে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়না। বিভিন্ন বাস কোম্পানী কর্তৃক তাদের পরিবহনের জন্য কোম্পানি কর্তৃক প্রণীত ভিন্ন ভিন্ন ভাড়ার চার্ট অনুসরন করে ভাড়া আদায় করা হয়। অথবা বাসে উঠার সময় হেলপারের মূখে উচ্চারিত ভাড়া এখানে আদায় করা হচ্ছে। এই কারনে সরকারের ভাড়া নির্ধারনের আইনগত যোগ্যতা এখানে চরমভাবে প্রশ্নের সম্মূখীন বলে দাবী করেন তিনি।

এতে বক্তব্য রাখেন, বিআরটিএ এর সাবেক চেয়ারম্যান আইয়ুবুর রহমান, ডিটিসিএ এর সাবেক নিবার্হী পরিচালক ড. সালেহ উদ্দীন আহমেদ, দৈনিক সমকালের সহযোগী সম্পাদক ও সিটিং সার্ভিসের নৈরাজ্য বন্ধে সরকার গঠিত কমিটির সদস্য অজয় দাশ গুপ্ত, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কুদ্দুস আফ্রাদ, বুয়েটের অধ্যাপক ড. মাহবুবুল আলম তালুকদার, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্নয়ক জোনায়েদ সাকি, সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক হুমায়ুন কবির হিরু, সমাজ সেবা অধিদপ্তরের সাবেক উপ-পরিচালক হারুন অর রশিদ, সমাজতান্তিক শ্রমিক ফ্রন্ট এর নারী বিষয়ক সদস্য সামশুন্নাহার প্রমূখ।

বিআরটিএ এর সাবেক চেয়ারম্যান আইয়ুবুর রহমান বলেন, বিআরটিএ’র আইনে সিটিং সার্ভিস বলতে কিছুই নেই। মালিকরা অতিরিক্ত মুনাফার লোভে এইসব বিষয় আবিষ্কার করেছে। ভাড়া নির্ধারণে যাত্রীস্বার্থ প্রধান্যদিতে হবে।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সালেহ উদ্দীন আহমেদ বলেন, আমাদের জিডিবির ৩৭ শতাংশ ঢাকা থেকে উৎপাদিত হয়, অথচ ঢাকা যানবাহনের গতি দিনদিন কমছে এই কারনে জাতীয় উন্নয়ন ব্যহত হবে। তাই গণপরিবহনকে প্রাধান্যদিতে হবে। সিটিং সার্ভিস ও লোকাল সার্ভিস উভয়ের নৈরাজ্য ও হয়রানী বন্ধ না হলে ব্যক্তিগত গাড়ী বাড়তে থাকবে।

সিটিং সার্ভিসের নৈরাজ্য বন্ধে সরকার গঠিত কমিটির সদস্য বিশিষ্ট সাংবাদিক অজয় দাশ গুপ্ত বলেন, আমরা জানি মালিক-শ্রমিক মানে তেল আর পানি, তারা কখনো এক হবার নয়। কিন্তু পরিবহন সেক্টরে মালিক-শ্রমিকনেতারা তাদের কায়েমী স্বার্থের জন্য দুধ আর পানি হয়ে যায়। এতে যাত্রী হয়রানী ও ভাড়া নৈরাজ্য বাড়ে। তিনি যেই প্রক্রিয়ায় বাস ভাড়া এত বেশি বাড়ানো হয়েছে তার জন্য আমাদের মালিক-শ্রমিক-আমলা-মন্ত্রী সকলেই দায়ী বলে অভিযোগ করেন।

আলোচনা সভায় বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে সিটিং সার্ভিসের নৈরাজ্য বন্ধে ১২ দফা সুপারিশ করা হয় ঃ
১) সরকার নির্ধারিত ভাড়ায়, নির্ধারিত ষ্টপেজ অনুযায়ী সিটিং সার্ভিস বাস চালাতে হবে। ভাড়ার অংক ও দুরত্ব উল্লেখ করে টিকিট দিয়ে ভাড়া আদায় নিশ্চিত করতে হবে। সুস্পষ্ট ভাড়ার তালিকা বাসে ও বাস কাউন্টারে প্রর্দশনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

২) সিটিং সার্ভিসে মালিকদের মর্জি মতো ভাড়া আদায় ও ষ্টপেজ নিধারর্ণ করা যাবে না। মাঝপথের যে কোন ষ্টপেজে নামলে শেষ গন্তব্য পর্যন্ত ভাড়া আদায় করা যাবেনা। কয়টি ষ্টপেজ থাকবে যা সরকার-মালিক-শ্রমিক-যাত্রী প্রতিনিধির সাথে আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করতে হবে।

৩) মালিকগন চালকদের নিকট দৈনিক চুক্তিতে বাস ইজারা দেয়া যাবেনা।

৪) প্রতিটি সিটিং সার্ভিসের বাসের আসন থাকবে পরিষ্কার পরিচ্ছন, বাহ্যিক দিক থেকে দেখতে দৃষ্টি নন্দন। দরজা-জানালা কাঁচ ঠিক থাকবে। এইসব বাসে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বাসে ফ্যানের ব্যবস্থা থাকবে। জানালার পর্দা ও সিট কভারের ব্যবস্থা থাকতে হবে। সময়ে সময়ে এগুলো পরিষ্কার করতে হবে।

৫) প্রতিটি সিটিং সার্ভিস বাসে নিবন্ধনে অনুমোদিত আসনের অতিরিক্ত আসন থাকতে পারবেনা। আসন আরামদায়ক হতে হবে।

৬) প্রতিটি সিটিং সার্ভিস বাসে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধি যাত্রী ও অসুস্থ যাত্রীদের উঠানামায় অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাদের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন সংরক্ষণ করতে হবে।

৭) ঢাকা শহরের চলাচলরত মোট বাসের ২৫ শতাংশ সিটিং সার্ভিস হিসেবে চলাচল করতে পারে। এইসব বাস হবে মানসম্মত। সিটিং সার্ভিসের অনুমোদন নেই এমনবাস সিটিং হিসেবে চালালে আটক করার বিধান করতে হবে। আইন অমান্যকারী পরিবহন মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

৮) সিটিং সার্ভিসের বাসের আলাদা কালার থাকতে হবে।

৯) সিটিং সার্ভিসের বাসে নির্ধারিত ষ্টপেজের বাইরে রাস্তার মাঝ পথ থেকে যাত্রী নিতে পারবে না। দাড়িয়ে যাত্রী নেওয়া নিষিদ্ধ করতে হবে।

১০) সিটিং সার্ভিসের বাস রুট পারমিটের শর্তানুযায়ী চলাচল নিশ্চিত করতে হবে।

১১) যাত্রী সেবার মানোন্নয়নে সরকার-মালিক-শ্রমিক-যাত্রী প্রতিনিধির সমন্নয়ে মনিটরিং কমিটি গঠন করতে হবে। গঠিত কমিটির সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবায়ন হলো নির্দিষ্ট সময় পরপর গণশুনানির আয়োজন করতে হবে।

১২) সিটিং সার্ভিসের বাস মিনিবাসের জন্য রুট প্রেঞ্চাইজের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি রুটে একই কোম্পানির আওতায় এক টিকিটে যাত্রী পরিবহন নিশ্চিত করতে হবে। লোকালবাসে ঝুঁকিপূর্ণ ভাবে বাদুঁড়ঝোলা করে যাত্রী বহন করা যাবে না। এইজন্য বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.