শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার

0

করোনাকালে সমগ্র বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থায় চরম হতাশাগ্রস্ত অবস্থা বিরাজমান। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক কেউই জানেন না কেমন করে চলবে শিক্ষা কার্যক্রম। অপরদিকে সরকারও করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলার পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পরিস্থিতি আনার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার যেভাবে হচ্ছে তাতে শিখন কার্যক্রম কতটা পূর্ণতা পাচ্ছে তা নিয়েও সবার মধ্যে এক ধরনের উৎকণ্ঠা আছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষায় আইসিটি ব্যবহারে আরো যতœশীল হওয়া প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তবে কীভাবে সেটা সম্ভব তা নিয়ে একটা পর্যবেক্ষণের সময় এসেছে। যদি করোনা পরিস্থিতি অচিরেই স্বাভাবিক না হয় এবং শিক্ষাক্ষেত্রে যে নতুন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তাতে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

বাংলাদেশের কথা বলতে গেলে অনলাইন ক্লাস অনেকটা ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ অর্থাৎ শিক্ষক ও শিক্ষার্থী টেকনোলজিতে সুদক্ষ না হওয়ায় অনলাইন ক্লাস বেশিরভাগই সংসদ টেলিভিশন ও ফেসবুকে তথা ভিডিও ক্লাসের মধ্যেই আবদ্ধ, অবশ্য অল্পবিস্তর উচ্চবিত্ত প্রতিষ্ঠানের কথা ভিন্ন। প্রকৃতপক্ষে অনলাইন ক্লাস যাকে বলে তার অনেকাংশেই ব্যাহত হচ্ছে, কেননা ক্লাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে ইন্টারেকশন হওয়া জরুরি। শিখন কার্যক্রমে যেসব উপকরণের ব্যবহার, বক্তব্য ও আচার-অনুষ্ঠান প্রয়োজন তার সবই অনলাইনে করা সম্ভব। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যদিও আমাদের পক্ষে অনেকাংশে উন্নততর অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় তবুও কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে, যেগুলো সরকারের পক্ষে একেবারেই সহজসাধ্য।

আমাদের দেশের শহরাঞ্চল বাদ দিলে বিপুল পরিমাণ অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা গ্রামের শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করতে পারছে না। এর অনেকগুলো কারণ থাকলেও প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে-

ক) শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ইন্টারেক্টিভ অনলাইন ক্লাসের ক্ষেত্রে টেকনোলজিতে সহজলভ্যতা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই।
খ) অনলাইন ক্লাসগুলো সংসদ টিভি, ফেসবুক ও ভিডিওনির্ভর হওয়াতে অভিভাবকরাও শিক্ষার্থীদের তা থেকে দূরে রাখছেন। কারণ হিসেবে তারা মনে করেন তাদের সন্তান ফেসবুকে অনলাইন ক্লাসের ভিডিও দেখার চেয়ে অপ্রয়োজনীয় বিষয়ই বেশি দেখবে; ‘পাছে সন্তানটি নানা বিষয়ে আসক্ত হয়ে যায়’।
গ) দরিদ্র শিক্ষার্থীদের টেকনোলজি এবং উচ্চমূল্যের ইন্টারনেট ব্যবহারের সামর্থ্য একেবারেই নেই।
ঘ) শিক্ষার্থীর স্বভাবসুলভ মনোভাব হলো পড়ালেখায় ফাঁকি দেয়া ইত্যাদি।
উপরোক্ত সমস্যাগুলোর সমাধান ভিন্নতর তবুও উত্তরণের সহজ কিছু উপায় নিয়ে আমাদের কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

সরকারের শিক্ষক বাতায়নে ক্লাসকন্টেন্টের অভাব নেই তবে বিষয়ভিত্তিক আরো কিছু উপযুক্ত কন্টেন্ট তৈরি করে আপলোড করা যেতে পারে এবং এর একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করে দেয়া যেতে পারে, যাতে শিক্ষার্থীও শিক্ষার্থী হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করবে। উল্লিখিত অ্যাপের মাধ্যমে তার প্রতিষ্ঠানের নাম, আইডি ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করলেই সে তার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের তালিকা থেকে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নির্বাচন, কখন কোন বিষয়ের কী কী সমাধান সে চায় তার জন্য আবেদন করতে পারবে এবং শিক্ষকরা যথাসময়ে এর সমাধান দিতে পারবেন। প্রয়োজনে শিক্ষক পরীক্ষাও নিতে পারবেন (অবশ্য অনলাইন পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে নানা মত রয়েছে) এবং তিনি যে কোনো সময়ই শিক্ষার্থীর পড়ালেখার অগ্রগতি সম্পর্কে অবগত হতে পারবেন। এক কথায় শিক্ষার্থীকে শিক্ষকের যথাযথ নজরে থাকার জন্য অনলাইন প্লাটফর্মটি করোনা পরিস্থিতি ছাড়াও উপযুক্ত মাধ্যম হতে পারে।

এ ব্যাপারে জিটসি নামক ওপেনসোর্স যে ভিডিও কনফারেন্সিং সফটওয়্যারটি সম্পূর্ণ লাইসেন্স ফ্রিতে ব্যবহার করা যায় তাতে এমন সব ফিচার আছে যে ইন্টারনেট প্রটোকল ব্যবহার না করেই ইন্টারেক্টিভ অনলাইন ক্লাসের সুবিধাগুলো নেয়া সম্ভব, অপরদিকে জুম মিটিং বা গুগল মিটিং ইত্যাদি উচ্চমূল্যে ব্যবহার করতে হয়। প্রশ্ন হলো, নেটওয়ার্ক প্রটোকলের সঙ্গে ডিভাইসটি সংযুক্ত হবে কীভাবে? আমাদের মোবাইল অপারেটরগুলো তাদের এই সেবা দেয়ার সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে। তারাও তাদের প্রচার-প্রচারণার স্বার্থে এই সেবা দিতে পারে, অপরদিকে সরকারের কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মোবাইল অপারেটরদের এই সেবা দিতে আকর্ষণ করতে পারে। আমার জানা মতে, সব মোবাইল অপারেটরই তাদের নিজস্ব আউটলেটগুলোতে কাস্টমাইজড ট্যাব ও অ্যাপ দিয়ে অভ্যন্তরীণ কিছু কার্যক্রম করে থাকে। ব্যাংকগুলোও অনুরূপ কার্যক্রম করে। এই আদলে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেবাও দেয়া যেতে পারে।

করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে যে যোগাযোগের দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে ভবিষ্যতে এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলে মনে হচ্ছে বিধায় আমাদের শিক্ষাবিষয়ক নীতিনির্ধারকদের এ বিষয়ে ভাববার সময় এখনই। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর টেকনোলজি ব্যবহার সহজতর করতে না পারলে এবং অভিভাবকদের প্রযুক্তির অন্তরালে সন্তান পথভ্রষ্ট হওয়ার ভীতি দূর করতে না পারলে করোনার নিষ্ঠুরতা পাশ কাটিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশ সাধারণ শিক্ষা কার্যক্রমের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারবে কিনা জানি না, আমাদের জন্য বেশ কঠিনই হবে মনে হচ্ছে।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.