সাংবাদিকতা

0
Want create site? Find Free WordPress Themes and plugins.

সাংবাদিকতা সাম্প্রতিক ঘটনার ওপর তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, পত্রিকায় ও ম্যাগাজিনে লেখা অথবা অনলাইন গনমাধ্যম, রেডিও, টেলিভিশনে সংবাদ সম্পাদনা করা ও প্রকাশ করা। সাংবাদিকতা একটি ব্যাপক এবং বহুমাত্রিক অর্থে ব্যবহূত শব্দ। ব্যাপক অর্থে বিজ্ঞাপন এবং জনসংযোগ কর্মী ও গণযোগাযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত পেশাজীবী ব্যক্তিদের কাজকেও সাংবাদিকতার সংজ্ঞাভুক্ত করা যায়।
সাংবাদিকতা ঘটনার বিবরণ প্রদান এবং তথ্য যোগান প্রথা বাংলা ও ভারতের অন্যান্য অংশে প্রাচীন এবং মধ্যযুগেও সীমিতভাবে চালু ছিল। প্রাচীন ভারতে পাথর বা স্তম্ভে খোদিত শব্দাবলি তথ্যের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহূত হতো। সম্রাট অশোক পাথর ও স্তম্ভে খোদিত আদেশ তাঁর সাম্রাজ্যের সর্বত্র এবং বাইরেও প্রজ্ঞাপন করেন। তিনি তথ্য সংগ্রহের জন্য দেশে এবং বিদেশে গুপ্তচর নিয়োগ করেন। সুলতানি আমলে ‘বারিদ-ই-মামালিক’ বা গোয়েন্দা প্রধান কর্তৃপক্ষকে সাম্রাজ্যের তথ্য সরবরাহ করার দায়িত্ব পালন করতেন। সুলতান আলাউদ্দিন খলজির মুনহি বা গুপ্তচররা সুলতানকে অতি তুচ্ছ বিষয়সমূহও অবহিত করত। মুগল শাসনামলে সংবাদ সার্ভিস নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘ওয়াকই-নবিশ’, ‘সাওয়ানিহ-নবিশ’ এবং ‘খুফিয়ানবিশ’ চালু ছিল। এ ছাড়াও ‘হরকরা’ এবং ‘আকবর-নবিশ’ নামে সুলতানদের সাধারণ তথ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ছিল। ভাট, কথক এবং নরসুন্দর মানুষকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক খবর জানাত। কিন্তু মুগল আমলের বাংলায় সাংবাদিকতা ছিল শুরুর পর্যায়ে, প্রকৃত অর্থে সাংবাদিকতা হিসেবে বিষয়টি তখন বিকশিত হতে পারে নি। আধুনিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে সাংবাদিকতার উৎপত্তি অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপে। উপনিবেশ হওয়ার কারণে এশিয়ার অন্য যে কোন দেশের আগেই বাংলা অঞ্চলে সাংবাদিকতা শুরু হয়।
১৭৮০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে কলকাতা থেকে প্রকাশিত জেমস অগাস্টাস হিকি-র বেঙ্গল গেজেট প্রকাশনার মাধ্যমে বাংলায় আধুনিক সাংবাদিকতার ইতিহাস শুরু হয়। পত্রিকার বিজ্ঞাপনে উলেখ করা হয়েছিল, সকল পক্ষের জন্য উন্মুক্ত
হলেও এটি কারও দ্বারা প্রভাবিত নয় এমন একটি সাপ্তাহিক, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক পত্রিকা। ১৮১৮ সালে বাংলা সাংবাদিকতা যাত্রা শুরু করে। সে বছর বাঙ্গাল গেজেট (কলকাতা), দিগদর্শন (কলকাতা) এবং সমাচার দর্পণ (শ্রীরামপুর) নামে তিনটি সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথম বাংলা সংবাদপত্র সমাচার দর্পণ শ্রীরামপুর থেকে ১৮১৮ সালে প্রকাশিত হয়।
বাংলাদেশের বর্তমান ভূখন্ড থেকে প্রথম প্রকাশিত সাপ্তাহিক রংপুর বার্তাবহ প্রকাশিত হয় রংপুর থেকে ১৮৪৭ সালে এবং ঢাকা থেকে প্রথম প্রকাশিত সাপ্তাহিক ঢাকা নিউজ প্রকাশিত হয় ১৮৫৬ সালে। ঢাকা প্রকাশ ১৮৬১ সালে এবং ঢাকা দর্পণ ১৮৬৩ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। বিশ শতকের শুরুতে সাংবাদিকতা পেশা এক নতুন মোড় নেয়। জাতীয়বাদী আন্দোলন, মুসলিম জাতীয়তাবাদের উত্থান, প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ এবং প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের সূচনা প্রভৃতি কারণে সংবাদপত্রসমূহের চাহিদা ও পাঠকসংখ্যা দ্রুত বিস্তার লাভ করে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ এবং পূর্ববাংলার রাজধানী হিসেবে ঢাকার উত্থান সাংবাদিকতার বিস্তারের ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ভূমিকা পালন করে।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে বেশ কিছু পত্রিকার মালিক-সম্পাদক দেশান্তরি হওয়ায় পূর্ববঙ্গে সংবাদপত্র প্রকাশনায় একটি শূন্যতা সৃষ্টি হয়। ঢাকায় এ সময়ে প্রকাশিত কোন দৈনিক পত্রিকার সন্ধান মেলে না। ঢাকার প্রধান পত্রিকা ছিল তখন দৈনিক আজাদ, ইত্তেহাদ এবং মর্নিং নিউজ। এগুলি প্রকাশিত হতো কলকাতা থেকে। অবশ্য বছর দুয়েক-এর মধ্যে পত্রিকাগুলি ঢাকায় চলে আসে। পরে এখান থেকে প্রকাশিত হয় ইত্তেফাক, সংবাদ, পাকিস্তান
অবজারভার (পরে বাংলাদেশ অবজারভার) প্রভৃতি পত্রিকা যা আজও দেশের প্রথম সারির দৈনিক হিসেবে প্রকাশিত হয়ে চলেছে (উল্লেখ্য জুন ২০১০ থেকে অবজারভার পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেছে)। বাংলাদেশ সরকারের ফিল্ম অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অধিদপ্তরের ১ জুলাই ২০১৮হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রকাশিত মিডিয়া তালিকাভুক্ত পত্রপত্রিকার সংখ্যা প্রায় ৫০০টি।
প্রিন্ট জার্নালিজমের পাশাপাশি ইলেক্ট্নিক জার্নালিজমও বাংলাদেশে এখন একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে গেছে। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে All India Radio (AIR) এই উপমহাদেশে বেতার সম্প্রচার শুরু করে। ঢাকা ধ্বনি
বিস্তার কেন্দ্র নামে একই বছর AIR ঢাকাতে বেতার সম্প্রচার আরম্ভ করে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর এর নাম হয় পাকিস্তান রেডিও সার্ভিস এবং জন্মের পর থেকেই এটি একটি সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হতে থাকে। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত রেডিও পাকিস্তান হিসেবে এটি কার্যক্রম পরিচালনা করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে ১৯৭১ সালে এদেশের বেতার সম্প্রচার ব্যবস্থা বাংলাদেশ বেতার নামে সরকারি মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে পরিচালি হয়। পরবর্তী সরকারগুলি এটিকে রেডিও বাংলাদেশ নামকরণ করে। ১৯৯৬ সাল থেকে আবারও তা বাংলাদেশ
বেতার নামে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বেতারকর্মীদের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। তাদের উদ্যোগে ১৯৭১ সালে স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সম্পূর্ণ সরকারি মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ বেতার ছাড়াও বর্তমানে আরও ৪/৬টি বেসরকারি বেতার চ্যানেল বেতার সাংবাদিকতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। একইভাবে ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সরকারি মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বেসরকারি মালিকানাধীন প্রায় ১৫/১৮টি টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাদেশের টেলিভিশন সাংবাদিকতায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে।

এদেশে পত্রপত্রিকার প্রকাশ এবং তা অব্যাহত রাখা কখনই মসৃণ ছিল না। ১৭৮০ সালে হিকির বাঙ্গাল গেজেট থেকে শুরু করে অদ্যাবধি এদেশের পত্রিকাগুলির আইনি প্রক্রিয়ায় ডাক সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়া; সম্পাদক, মালিক ও সাংবাদিকের কারাবরণ; অর্থদন্ড ও জরিমানা, প্রেস বাজেয়াপ্ত হওয়া, নির্যাতন-হত্যার মুখোমুখি দাঁড়ানো ও শিকার হওয়া; পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাওয়া এমনতর বহু ধরণের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। কোন আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই সাংবাদিকতার চর্চা বহাল ছিল। সাংবাদিকতা পেশা পূর্বে শিক্ষানবিশি হিসেবে এবং এই পেশার সঙ্গে দীর্ঘ সংশ্লিষ্টতার মাধ্যমেই শিখতে হতো। সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হলেও তা বর্তমানে বাংলাদেশেও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশের ৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৬/৭টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগ রয়েছে। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন ইনস্টিটিউট ও সেন্টারে সাংবাদিকতা শিক্ষা/প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণের জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি) দীর্ঘকাল
ধরে প্রশিক্ষণের কাজটি চালিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়াও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ম্যাস কমুনিকেশন (NIMCO) এবং স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান হিসেবে BCJDC, MMC সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করে চলেছে।
সাংবাদিকদের সাধারণ এবং শাখাভিত্তিক ইউনিয়ন বা সংস্থা রয়েছে। কেবল পেশাগত স্বার্থে সহায়তা প্রদানই নয়, সাংবাদিকতার নৈতিকতা এবং পেশাগত সম্ভাবনা উন্নয়নের জন্য সাংবাদিক সংস্থাগুলি ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল সাংবাদিকতার পেশাগত নৈতিকতার দিকটি দেখভাল করে। বাংলাদেশে অধিকাংশ সাংবাদিকই পেশাগত ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য। এ সকল ট্রেড ইউনিয়ন সাংবাদিকদের সুযোগসুবিধা ও অধিকার সংরক্ষণে ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবে কাজ করে। সাংবাদিকতা এখন সম্মানজনক পেশা হিসেবে বিবেচিত, যদিও দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এই পেশাকে বিশেষ দুঃসাহসী কাজে পরিণত করেছে। কোন কোন সময় ঘটনার সঠিক তথ্য ও বিশেষণের জন্য সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক নেতা ও রাজনৈতিক দলের চেয়ে সাংবাদিকদের ওপর বেশি নির্ভর করে।
অপরদিকে তথ্য সংগ্রহ এবং ঘটনার বিবরণের জন্য সবাংবাদিকরা কখনও কখনও সরকারসহ কায়েমি স্বার্থের আঘাতের লক্ষ্যবস্ত্ততে পরিণত হয়। সে কারণেই কায়েমী স্বার্থের দ্বারা সাংবাদিকের প্রতি হামলা, খারাপ আচরণ, পঙ্গু করে দেয়া, এমনকি হত্যাকান্ডের ঘটনা পর্যন্ত ঘটে থাকে। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা বলা যায়, এখনও খানিকটা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পথ চললেও ক্রমশ তা পেশাদারিত্ব নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ সহ পৃথিবীতে অনলাইন গনমাধ্যম ব্যাপক হারে ভূমিকা রাখছে।

মো.মুজিব উল্ল্যাহ্ তুষার
(সাংবাদিক,সংগঠক ও মানবাধিকার কর্মী)

Did you find apk for android? You can find new Free Android Games and apps.

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.