যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসাবে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন বাইডেন। সাধারণ একটি পরিবার থেকে উঠে এসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়া বাইডেনের দীর্ঘ লালিত স্বপ্নের এই পথ মসৃণ ছিল না। অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। হাল না ছেড়ে লেগে থাকার মধ্য দিয়েই কূলে ভিড়েছে তরী। তবে বিভিন্ন সময় নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়লেও সেগুলো কাটিয়েও উঠেছেন। ভাগ্যে বিশ্বাস রয়েছে দীর্ঘ ৫০ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ বাইডেনের।
তিনি একবার বলেছেন, নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও তিনি যেগুলো করতে ও যা হতে চান, তা কীভাবে যেন শেষ পর্যন্ত হয়ে যায়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বেলাতেই প্রথম দুইবার না হয়েও শেষ বার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে এই লড়াকু মার্কিন রাজনীতিকের।
জো বাইডেন একজন লড়াকু মানুষ। তিনি লক্ষ্য স্থির করে কাজ করেন। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিয়ের পর ৩০ বছর বয়সে সিনেটর হওয়ার লক্ষ্য স্থির করেন। ১৯৭২ সালে ডেমোক্রেটিক দল বাইডেনকে ডেলাওয়ারের রিপাবলিকান জনপ্রিয় সিনেটর জে ক্যাবেল বোগসের বিরুদ্ধে প্রার্থী করে।
বাইডেন তরুণ প্রার্থী হিসেবে বোগসকে হারিয়ে তাক লাগিয়ে দেন। ২৯ বছর বয়সে হন সবচেয়ে কম বয়সী সিনেটর। কিন্তু দায়িত্ব নেয়ার আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান স্ত্রী ও মেয়ে নাওমি। ওই ঘটনায় বাইডেন এমনই ভেঙে পড়েন, তিনি আর রাজনীতি না করার সিদ্ধান্ত নেন। এমনকি আত্মহত্যার কথাও ভাবেন। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন যাজক হবেন এবং দুই ছেলেকে মানুষ করবেন।
নিজের স্মৃতিকথায় বাইডেন লিখেন, একটা পর্যায়ে ঈশ্বরের ওপর তার রাগ হয়। মনে হয় ঈশ্বর তার সঙ্গে নিষ্ঠুর খেলা খেলছেন। তিনি সন্ধ্যাবেলা একাকি ঘুরে বেড়াতেন গুণ্ডা ও মাস্তানপ্রবণ এলাকায়। তার প্রচণ্ড ইচ্ছে হতো মারামারিতে জড়িয়ে পড়ার। কিন্তু দলের অনুপ্রেরণায় আবারও ফিরে আসেন।
এছাড়া ছোটবেলা থেকে তোতলানোর অভ্যাস থাকায় সহপাঠী, এমনকি শিক্ষকদের কাছ থেকেও বিদ্রুপের শিকার হতেন তিনি। সুন্দর করে কথা বলা ও সাবলীল উপস্থাপনার জন্য অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। মানুষের উপহাস-বিদ্রুপকে আমলে না নিয়ে লেগে থাকার ফল পেয়েছেন বিশ্বের সবেচেয় ক্ষমতাশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ের মধ্য দিয়ে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড়ে বাধা : প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন বাইডেনের দীর্ঘ দিনের সেই ১৯৮৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নামেন তিনি। কিন্তু ১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী হওয়ার দৌড় থেকে সরে দাঁড়াতে হয় অন্যের বক্তব্য চুরি ও অসততার অভিযোগে।
কিন্তু সেটা ছিল ভুলের কারণে, তার ইচ্ছায় নয়। দ্বিতীয়বার তিনি প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করেন ২০০৮ সালে। কিন্তু তখন হেরে যান ডেমোক্রেটিক দলের ক্যারিশমাটিক প্রার্থী বারাক ওবামার কাছে। তবে এই হার থেকেও তার প্রাপ্তি আছে। অভিজ্ঞ রাজনীতিক বাইডেনকে ওবামা তার রানিং মেট হিসেবে বেছে নেন।
২০০৮ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করে অভিজ্ঞতার ঝুলি আরও ভারি করেন তিনি।
২০১৫ সালে তিনি যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার, তখন ঘটে আরও বড় দুর্ঘটনা। তার ছেলে বো বাইডেন মস্তিষ্কের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এই ছেলে নিজেও রাজনীতি করতেন। ডেলাওয়ারের অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন এবং পরবর্তী সময় গভর্নর হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তার মৃত্যুতে বড় ধাক্কা খান বাইডেন এবং ২০১৬ সালে প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত বদলান।
শেষ পর্যন্ত এ বছর অনেক প্রতিকূলতা জয় করে প্রার্থী হন। নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর আগ থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে ‘স্লিপি জো’ ‘মিথ্যাবাদী’ ইত্যাদি বলে হেয় করেন। এছাড়া অনেকে তাকে মন্দ ও বাজে ক্যান্ডিডেট বলে কটাক্ষ করে। শেষ পর্যন্ত সব কিছু পেছনে ফেলে হোয়াইট হাউসে বসতে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রনীতি ও মার্কিন রাজনীতিতে অভিজ্ঞ বাইডেন।
বর্তমানে ৭৭ বছর বয়স তার। ২০ নভেম্বর ৭৮-এ পা দেবেন। আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনিই ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক মার্কিন প্রেসিডেন্ট হবেন।