চউকে সরকারী আদেশের বিরুদ্ধে পরিকল্পনাবিদদের কর্মবিরতি. সপ্তাহ পেরুলেও নেই পদক্ষেপ

0

কিউ এইচ কবির ঃ চট্টগ্রাম উন্নয়ন কতৃপক্ষ(চউক) এর প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ পদের নতুন স্থলাভিষিক্ত এক অফিস আদেশের বিরুদ্ধে বৃদ্ধাঙ্গলী দেখিয়ে  সপ্তাহজুড়ে জনদুর্ভোগের কর্মবিরতি পালন করছে সিডিএর পরিকল্পনা শাখার কর্মিরা। সাধারণ সেবা গ্রহিতাদের অভিযোগ, সরকারী আদেশের বিরুদ্ধে সরকারী কর্মচারীরা আইন বর্হিভুত কর্মবিরতি করলেও কেন নেয়া হচ্ছেনা তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগ করলে দেশের সরকারী, আধাসরকারীও স্বায়ত্বশাষিত অনেক প্রতিষ্ঠানের ফ্যাসীবাদী মনমানসিকতার পদধারীরা স্বেচ্ছায় পদত্যাগের হিড়িক পড়ে। তাদের স্থলাভিষিক্ত হয় বৈষম্যের শিকার সিনিয়র বা জৈষ্ঠতার ভিত্তিতে যোগ্য অনেক কর্মকর্তা। সেইক্ষেত্রে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কতৃপক্ষও বাদ যায়না। অপরিকল্পিত নগরায়ন, পাহাড় কাটা, পুকুর ভরাটসহ নানা জায়গার এনওসিসহ নকসা অনুমোদনের জুড়ি নাই। এনিয়ে নগর জুড়ে রয়েছে অনেক সমালোচনা ও অভিযোগ। বিগত সতেরো বছরে সিডিএ একটি রামরাজত্বের সংস্থা হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। একটি সিন্ডিকেট নিজের মতো চালাচ্ছিল সিডিএকে। কামিয়েছে কোটি কোটি টাকা। দুদুকে কয়েকটি অভিযোগ পড়লেও তদন্তের কালক্ষেপনে সিন্ডিকেটরা চালিয়ে গেছে নিজেদের আখের গোছানোর কর্ম। এই প্রতিষ্ঠানের  চীফ ইঞ্জিনিয়ার নিজেই এই প্রতিষ্ঠানের পাঁচটি পদ দখল করে ছিলেন। উপ প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ইসা আনসারী তিনটি পদের দায়িত্ব পালন করতেন।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সুত্রে জানা যায়, ১৫ আগস্ট সিডিএর সচিব রবী›ন্দ্র চাকমা স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রকৌশল ও পরিকল্পনা বিভাগের কাজের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, গতিশীলতা আনয়ন, জনসেবা নিশ্চিতকরণ এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার স্বার্থে সিডিএর ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামসকে প্রধান প্রকৌশলী, (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে রেখে নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মঞ্জুর হাসানকে তত্বাবাবধায়ক প্রকৌশলী-১ (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। একইসাথে তিনি নির্মাণ বিভাগ২, ৩ এবং ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যানিং বিভাগের কাজের তদারকিও করবেন বলে অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলামকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্ব দেয়ার পাশাপাশি প্রকল্প বিভাগ ও এরিয়া প্ল্যানিং বিভাগের কাজের তদারকি করারও দায়িত্ব দেয়া হয়। নির্বাহী প্রকৌশলী এজিএম সেলিমকে জৈষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (চলতি দায়িত্ব) প্রদান করা হয়। এই তিনজন প্রকৌশলীকে দীর্ঘদিন ধরে পদবঞ্চিত রাখা হয়েছিল বলে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, তারা নানা বঞ্চনার শিকার। তাই তাদেরকে অফিস আদেশের মাধ্যমে পদায়ন করা হয়েছে।
সরকার পতনের পর চলতি মাসের ১৫ আগস্ট এক অফিস আদেশে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদসহ তিনজন প্রকৌশলীকে পদায়নের প্রেক্ষিতে সংস্থার উপ প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আবু ইসা আনসারীসহ সাতজন কর্মকর্তা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবরে পত্র পাঠিয়েছেন। তাদের বক্তব্য সিডিএর আইন না মেনে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সেলিমকে করায় একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের দায়িত্ব দিয়ে সরকার ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেক্ষেত্রে ইসা আনসারী উপ নগর পরিকল্পনাবিদ ও অভিজ্ঞতার আলোকে হওয়ার কথা ছিলো। জানা যায়, নগর পরিকল্পনা শাখার অধিনে রয়েছে চারটি শাখা তারমধ্যে অথোরাইজেশন, কম্পিউটার শাখা, স্থাপত্য শাখা ও পরিকল্পনা শাখা। জানা যায়, নির্বাহী প্রকোশলী এজিএম সেলিমকে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের পদপ্রাপ্ত আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুদ্ধ হয়ে পরিকল্পনা শাখার কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা এই আদেশের বিরুদ্ধে কর্মবিরতি পালন করছে। ফলে চরমভাবে সেবা গ্রহীতারা সেবা থেকে বঞ্চিতসহ জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। এটা সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের আইন বর্হিভুত কাজ হলেও সিডিএ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছেনা। সেবা গ্রহিতারা সেবা বঞ্চিত হয়ে অনেকে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা বলছে এসব উপ নগর পরিকল্পনাবিদ ইছা আনছারীর বিষয়ে অনেক অভিযোগ রয়েছে। তাই নিজের অপকর্ম আড়ালে রাখতে তিনি প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ নির্বাহী প্রকোশলী সেলিমকে মেনে নিতে পারছেন না।
জানা যায়, সিডিএর পরিকল্পনা বিভাগের সাতজন কর্মকর্তা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবরে সম্প্রতি একটি পত্র প্রেরণ করেছেন। পত্রটিতে উপ প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ আবু ঈসা আনছারী, নগর পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ জহির আহমেদ, সাইয়েদ ফুয়াদুল খলিল আল ফাহমী, সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ কামাল হোসেন, আশরাফুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, জান্নাতুল ফেরদৌস স্বাক্ষর করেন। পত্রে বলা হয়, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) যোগ্যতাসম্পন্ন পরিকল্পবিদকে বাদ দিয়ে ‘প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ’ পদে বিধি বহির্ভূতভাবে একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে পদায়ন করা হয়েছে। প্রকৌশলীরা এই পদায়ন বাতিল করারও আবেদন জানিয়েছেন।
এদিকে চউকের একটি সুত্রে জানা গেছে, গত ২০০৮ সালে তৎকালীন চৌকশ চেয়ারম্যান শাহ্ মুহাম্মদ আকতার উদ্দীন চট্টগ্রাম মহানগরকে অপরিকল্পিত নগরায়নের সৃষ্ঠ উপদ্রব থেকে উদ্ধারের জন্য এই শাখায় নতুনভাবে লোকবল নিয়োগ করেন। এ সময় আবু ঈশা আনসারী ওই বছরের ২০ নভেম্বর সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ হিসাবে যোগদান করেন। এ শাখায় ওই সময় যাদেরকে নিয়োগ দিয়েছেন তাদেরকে সম্পূন্ন অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত তারা “চউকের জনবল অবকাঠামোতে”বা তাদের নাম মূল “অর্গানোগ্রামে” নেই। ফলে তারা এখনো অস্থায়ী। বর্তমানে চউক কর্তৃপক্ষ যে অর্গানোগ্রামটি মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করেছে তা এখনো পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি, তা আদৌ দেখবে কিনা তা বলাবাহুল্য। এছাড়াও ভুমি ব্যবহার ছাড়পত্র অনুমোদনে যথেষ্ঠ কালক্ষেপনসহ ঘুষ দুর্ণীতির আতুরঘর হিসাবে এ শাখাটি সৃষ্ঠ হওয়ার পর থেকে আলোচিত ও সমালোচিত।
সুত্রটি আরো জানান, বিগত ২০০৯ সালে প্রকল্প কর্মকর্তা রাজীব দাশ তৎসময়ে অফিস শৃংখলা ভঙ্গ করে জুনিয়র কর্মকর্তা এটিপি আবু ঈশা আনচারীকে নগর পরিকল্পনাবিদ হিসাবে চলতি দায়িত্ব প্রদান করায় কর্তৃপক্ষ বরাবরে অভিযোগ দাখিল করেছিলেন। এর পরে ২০১০ সালে তার অবৈধ পদোন্নতিকে চ্যালেঞ্জ করে সহকারী প্রকৌশলী সাহবুদ্দীন খালেদ, আহম্মেদ মাঈনুদ্দীন, বর্তমান অথরাইজড অফিসার-১ পিডি হাসান ও বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম বাদী হয়ে চট্টগ্রামের চীফ জুডিশিয়াল আদালতে মামলা নং-৬২৩০/২০১০ তারিখ ৫/৯/২০১০ দায়ের করেন। পরে অবশ্য মামলাটি উভয়ের আপোস মিমাংসানুযায়ী নথিজাত হয়। মূলত এ প্রতিষ্ঠানে অনিয়মই নিয়ম বলে পরিগনিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। নিয়মের কোন বালাই নেই এ প্রতিষ্ঠানে। যারা ডেপুটেশনে বড় কর্তা হয়ে আসে তারাই এ অনিয়মকে রহস্যজনক কারণে নিয়মে পরিণত করেছে। বিশেষকরে দীর্ঘ ১৭ বছরের এ অনিয়মের বিরুদ্ধে কোন কর্তাব্যক্তি টুশব্দও করেনি। ফলে সুযোগ সন্ধানী কথেক কর্মকর্তা শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছে।
এ বিষয়ে সিডিএ সচিব রবিন্দ্র চাকমা বলেন, প্রধান নগর পরিকল্পনা পদটি নিয়ে প্ল্যানাররা কর্ম বিরতি করছে যা সরকারী কর্মচারী হিসাবে আইন বর্হিভুত। আমি এদের বিষয়ে মন্ত্রনালয়ে চিঠি লিখেছি। আশা করি তাদের বিরুদ্ধে খুব শীঘ্রই মন্ত্রনালয়ের নির্দেশ পাবো। শীঘ্রই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উপ নগর পরিকল্পনাবিদ ইছা আনসারীকে মুঠোফোনে ও হোয়াটসআপে ফোন দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.