টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে গণধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার জাকিয়া সুলতানা রুপার বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। একমাত্র উপার্জনক্ষম ও প্রাণবন্ত রুপাকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ পরিবারের সদস্যরা। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের ভরণপোষণের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। তবে একবারের জন্যও নিজের লক্ষ্য থেকে পিছু হটেননি তিনি। বেতন বাড়ানোর কথা মাকে জানিয়ে চমক দেওয়ার ইচ্ছা ছিল তাঁর।কিন্তু সেটা আর হলো না রূপার (২৯)। সবকিছু গুছিয়ে আনার আগেই তাঁকে হত্যা করা হলো। চলন্ত বাসে ধর্ষণ করে ঘাড় মটকে তাঁকে হত্যা করে টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর বন এলাকায় ফেলে রাখা হয়।
কাঁদতে কাঁদতে মা হাছনাহেনা বেগম গতকাল বুধবার জ্ঞান হারালে তাকে তাড়াশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। রুপার পরিবারের মতো গ্রামবাসীও আহাজারি করছেন, ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। এদিকে ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ফুঁসে উঠছে তাড়াশসহ পুরো সিরাজগঞ্জ জেলার সাধারণ মানুষ।
নিহত রুপা সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল গোলচত্বর থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরে তাড়াশ উপজেলার আসানবাড়ি গ্রামের মৃত জেলহক প্রামাণিকের মেয়ে। রুপার বড় বোন জিয়াসমিন খাতুন জানান, আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন ছিল রুপার। স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষ করে বড় উকিল হবে। কিন্তু মানুষরূপী হায়েনারা তার স্বপ্নপূরণ হতে দিল না।
রুপার ছোট বোন পপি খাতুন জানান, দুইবোন এক সঙ্গে চাকরি করতাম। আপু থাকতো শেরপুরে। আর আমি থাকতাম জামালপুরে। শুক্রবার দিন সকালে আপু ফোন দিয়ে বলল, আমি বগুড়ায় শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি। পরীক্ষা শেষে আমি ময়মনসিংহ হয়ে শেরপুরে ফিরব। বিকাল ৫টার দিকে বলে আমি ছোঁয়া পরিবহনের বাসে উঠেছি। রাত ৮টার দিকে ফোন দিলে আপু বলে আমি সিরাজগঞ্জ রোডে খাবার খাচ্ছি। আমি তাকে তাড়াশের বাড়িতে যেতে বলি। কিন্তু আপু বলে অফিসে না গেলে চাকরি থাকবে না। এ জন্য আবার গাড়িতে ওঠে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে পপি বলেন, বাসের চালক-হেলপাররা আপুকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করেছে। হত্যাকারীদের সরকার যেন এমন শাস্তি দেয় যাতে আর কোনো পুরুষ কোনো মেয়ের প্রতি এমন নিষ্ঠুর আচরণ না করে।
রুপার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী জানান, আপু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত। তাহাজ্জুদের নামাজ পর্যন্ত পড়ত। এতো ভালো একজন মানুষকে এভাবে মানুষ মেরে ফেলবে কল্পনাই করতে পারি না। যারা আপুকে হত্যা করেছে তারা মানুষ নয়-মানুষরূপী জানোয়ার।
বাড়ির ঘর ও আসবাবে দারিদ্র্যের ছাপ। বাবা ছিলেন কৃষক। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে রূপা তৃতীয়। বড় ভাই মো. হাফিজুর রহমান পড়েছেন উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত। আর মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে না–পেরোতেই বিয়ে হয়ে যায় বড় বোন জেসমিন খাতুনের। তবে রূপার এই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া মোটেই সহজ ছিল না।
রূপার ছোট বোন পপি খাতুন উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর ২০০৮ সালে নাটোরে খালার বাসায় চলে যান। সেখান থেকে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতক পাস করেন। রূপা এবং তিনি একই সঙ্গে একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে প্রমোশনাল ডিভিশনে চাকরি করতেন। রূপার সর্বশেষ কর্মস্থল ছিল শেরপুরে আর পপির কর্মস্থল ছিল গাজীপুরে। বুধবার (গতকাল) কোম্পানির বারিধারার অফিস থেকে মাসের বেতন নিয়ে মিরপুর থেকে দুই বোন পরিবারের ঈদের কেনাকাটা করবেন এমনটাই কথা ছিল। বোনের মৃত্যুর খবরে পপি মঙ্গলবারই বাড়ি চলে এসেছেন। কাঁদছেন অনবরত।
পপি বলছিলেন, পরিবারের আর্থিক অনটন যখন চরমে, তখন দুই বোন মিলে ঢাকায় চলে যান। তত দিনে তাঁর স্নাতক শেষ হয়েছে। রূপার শেষ হয়েছে স্নাতকোত্তর। সাভারের একটি ফ্যাশন হাউসে মান নিয়ন্ত্রকের কাজ নেন দুই বোন। এভাবে চলতে চলতেই একদিন আইন নিয়ে পড়া শুরু করেন রূপা। ২০১৫ সাল থেকে কাজ শুরু করেন বহুজাতিক এই কোম্পানিতে। পপি বলেন, সর্বশেষ মাসিক ১৮ হাজার টাকা করে বেতন পেতেন দুই বোন। এই মাস থেকেই তাঁদের বেতন বাড়ানোর কথা। রূপার ইচ্ছা ছিল বেতন বাড়লে মাকে চমক দেবেন।
হাসপাতালে বেডে শুয়ে থাকা অসুস্থ মা হাছনাহেনা বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন আর বলছেন আমাকে এখন কে দেখবে? কে মা বলে ডাকবে? মেয়ে আমার অনেক বড় অফিসার হতে চেয়েছিল। খুব কষ্ট করে লেখাপড়া করছিল-কষ্ট করে ছোট বোন ও ভাইদের খরচ চালাতো।
তাড়াশ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হক জানান, দেশে এখনো মেয়েদের জন্য নিরাপদ নয়। রাস্তাঘাটে প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে মেয়েরা। এর সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। রুপা হত্যা মামলার দ্রুত তদন্ত শেষে চার্জশিট প্রদান এবং মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের মাধ্যমে দ্রুত বিচারকার্য সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন তিনি।
সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহমেদ ঘটনাটিকে ন্যক্কারজনক ও বেদনাদায়ক উল্লেখ করে বলেন, প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য টাঙ্গাইল পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক কামরুন নাহার সিদ্দীকা জানান, সংবাদ পাবার পরপরই উপজেলা প্রশাসনকে রুপার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। তাদের নিরাপত্তাসহ সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।