বিজয় কুমার, গাইবান্ধা থেকেঃ চার দিকে বন্যার পানিতে থৈ-থৈ, হাজারো মানুষ পানিবন্দী, কোথাও শকুনো মাটির চিহ্ন মাত্র নেই। নেই বিশুদ্ধ পানি, গরু ছাগল, হাঁস-মুরগি রাখার ব্যবস্থা, নেই স্যানিটেশন ব্যবস্থার সুযোগ। ঘন্টার পর ঘন্টা গলা পানিতে নেমে শিশু সন্তানদের নিয়ে দাড়িয়ে থাকতে হয় বানের পানিতে। সারাদিন অন্তর একবেলা রান্না-বান্নাও চলে চরম কষ্টে। শিশুরাও ভরা বন্যা আর নদীর স্রোতের সাথে যুদ্ধ করে বাবা-মার সাথে সময় পার করে মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে। প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের কষ্টও সীমাহীন। আবাদি জমি আর বাড়ির আঙ্গিনায় সবজি ক্ষেত পানির নীচে। এই চিত্র গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলার বন্যা কবলিত ফজলপুর ইউনিয়নের ১০ গ্রাম ও চরের। ইউনিয়নটির এমন একটি বাড়িও খুঁজে বের করা দুঃস্কর যে বাড়িতে কোমড় পর্যন্ত পানি ওঠেনি। কিন্তু ব্যতিক্রম হল শুধুমাত্র একটি পাড়ায়। বন্যা দুর্ভোগের বিন্দুমাত্র ছোঁয়ামাত্র নেই ১৫টি পরিবারের মাঝে। নেই পানি, রান্না-বান্না, পয়ঃনিস্কাশন, চলাফেরা, শিশুদের খেলা-ধূলা, পড়া-লেখার সমস্যা এমনকি গরু-ছাগল পালনেরও। স্বাভাবিক সময়ের মতই চলছে তাদের জীবনযাত্রা। সবজি চাষও করা হচ্ছে এখানে। ব্যতিক্রমী এই সামান্য উদ্যোগটি ব্যাপক সাঁড়া পড়েছে আশপাশের চরাঞ্চলে। রীতিমতো হিংসায় হচ্ছে আশপাশে পানিতে হাবু-ডুবু খাওয়া মানুষগুলোর মধ্যে। বিগত বছরের সর্বশেষ বড় বন্যার বিষয়টি চিন্তা করেই ফজলুপুর ইউনিয়নে বাজে তিলকুপি ক্লাস্টার ভিলেজটি তৈরি করা হয়। এর ফলেই বন্যাকালীন সবধরনের সুবিধাভোগ করছেন এখানে বসবাসকারী নাছিমা, সাহানা, হাছিনা, মিনারা বেগমের মতো পরিবারগুলো।
এ বছর জুন মাসেই ৭০ শতক জমির উপর ১ লাখ ৫৪ হাজার ঘণফুট মাটি কেটে নির্মান করা হয় একটি ক্লাস্টার ভিলেজ। দাতা সংস্থা ক্রিশ্চিয়ান এইড এর অর্থায়নে স্থানীয় সংস্থা গণ উন্নয়ন কেন্দ্র (জি.ইউ.কে) এই ক্লাস্টার ভিলেজটি নির্মানে সহায়তা করে। ১৪ লাখ ৫৫ হাজার ৭৫০ টাকা ব্যয়ে ক্লাস্টার ভিলেজ নির্মানে শ্রমিকদের মাটি কাটার মজুরী, প্রতিটি পরিবারের জন্য ল্যাটিন, ৪টি নলকুপ, বাড়ি প্রতি সোলার এমনকি ছাগল-ভেড়াও প্রদান করা হয় এককালীন এই টাকার মধ্যেই। ৮৮’, ৯৮’ এর ভয়াবহ বন্যার কথা চিন্তা করেই ক্লাস্টার ভিলেজটির উচ্চতা করা হয়-যাতে এর চেয়েও বড় বন্যা হলেও এখানে পানি উঠতে না পারে। আর হয়েছেও তাই। চলমান বন্যার পানি ক্লাস্টার ভিলেজের ধার কাছেতেও নেই। একারনেই এখানে বসবাসরত ১৫টি পরিবারের ৭৫ জন নারী-পুরুষ, শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বেশ ভালই আছেন। আশ-পাশ থেকে আরোও ৩০টি পরিবার তাদের সহায়সম্পদ নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন এখানে।
বাজের তেলকুপি গ্রামের পাশেই কাবিলপুর গামের কুলসুম বেগম জানান, এই কষ্ট প্রতিবছরের, কিন্ত কোন সমাধান হয় না। ্বন্যা হলেই বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র যেতে হয় অথবা অত্যন্ত কষ্টে দুর্ভোগে সময় পার করতে হয়। এই সময়ে যতসামান্য ত্রাণ পাওয়া যায়। একারনেই তিনি সাময়িক ত্রাণের পক্ষে না। তিনিও দাবী করের বাজে তেলকুপির মতো আশ্রয় কেন্দ্রের।
স্থানীয় জনগণের মতামত ও অভিজ্ঞতার আলোকে কাজ করলে তা টেকসই ও ফলপ্রসূ হয় এবং মানুষের দুর্ভোগও হ্রাঁস পায়। ক্লাস্টার ভিলেজের এই মডেলটি অনুকরণ করেই সরকার- দাতা সংস্থা কিংবা এনজিও চরাঞ্চলে বাড়ি, পাড়া বা ক্লাস্টার ভিলেজ এমনকি বন্যা আশ্রয় নির্মান করতে পারে এমন অভিমত ব্যক্ত করেন গণ উন্নয়ন কেন্দ্র (জিইউকে) এর নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস সালাম।
বেসরকারি এই সংস্থাটি বিভিন্ন দাস্থা সংস্থার অর্থায়নে বাজে তেলকুপির মতো আরো ৪৬টি ক্লাস্টার ভিলেজ ও ৭টি বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র নির্মান করেছে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তার চরাঞ্চলে। এই মডেলটি ফলো করে উত্তরের চরাঞ্চলে বন্যা মোকাবেলায় বাড়ি উচু কিংবা ক্লাস্টার ভিলেজ নির্মান করলে প্রতিবছরের এই দুর্ভোগ থেকে লোকজন রক্ষা পাবে এবং নিরাপদ থাকতে পারবে তাদের সহায় সম্পদ নিয়ে।