বাংলাদেশের জন্য গতকাল রবিবার ৪ জুন সাফল্যের একটি মাইলফলক হয়ে থাকল। তখনো রবিবারের ভোরের আলো ফোটেনি। মধ্যরাত ৩টা ৭ মিনিটে একটি কার্গো রকেট মহাকাশে রওনা হয় বাংলাদেশের বানানো প্রথম ন্যানো স্যাটেলাইট ‘ব্র্যাক অন্বেষা’কে নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে গতকাল রোববার বাংলাদেশ সময় ভোর ৩টা ৭ মিনিটে স্যাটেলাইটটির সফল উৎক্ষেপণ করা হয়। এটি স্পেসএক্স ফ্যালকন-৯ রকেটে চড়ে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (আইএসএস) উদ্দেশে রওনা হয়েছে।
ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উেক্ষপণের আগে নাসার এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ফ্লোরিডায় আমাদের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলীয় স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৭ মিনিটে ফ্যালকন ৯ রকেট উেক্ষপণ করা হবে। ’
ব্র্যাক অন্বেষার তিন তরুণ নির্মাতাদের একজন রায়হানা শামস্ আশা করছেন, আইএসএসে অবস্থানরত নভোচারীরা দুই দিনের মধ্যেই বাংলাদেশি স্যাটেলাইটবাহী কার্গো মহাকাশযানটি পেয়ে যাবেন। এরপর তাঁরা এটিকে কক্ষপথে পাঠানোর সময় নির্ধারণ করবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, আইএসএসগামী ‘ড্রাগন’ কার্গো মহাকাশযানটি সব মিলিয়ে প্রায় ৬ হাজার পাউন্ড বা অন্তত ২ হাজার ৭২১ কেজি পরিমাণ প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী নিয়ে গেছে।
মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী গত শুক্রবার ব্র্যাক অন্বেষার উৎক্ষেপণের কথা ছিল। সব ধরনের প্রস্তুতিও সম্পন্ন ছিল। কিন্তু উৎক্ষেপণের ঠিক আগ মুহূর্তে বজ্রপাতসহ প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ওই দিনের পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়।
‘ব্র্যাক অন্বেষা’র গ্রাউন্ড স্টেশন ও লিগ্যাল ইস্যু নিয়ে কাজ করেছেন মো. মোজাম্মেল হক সৌরভ। তিনি জানান, ‘ব্র্যাক অন্বেষা’ থেকে প্রথম যে ডাটা রিসিভ করা হবে সেটা হচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। এটি বিশ্বের যেকোনো দেশ থেকে বিশেষ বিশেষ দিনে হ্যাম রেডিওর মাধ্যমে শোনা যাবে। এই স্যাটেলাইটটিকে একটি স্পেস কার্গোর মাধ্যমে আইএসএস-এ পাঠানো হয়েছে।
সৌরভ জানান, এশিয়ার উদীয়মান দেশগুলোকে ন্যানো স্যাটেলাইট বানানো শেখাতে ২০০৯ সালে একটি প্রকল্পের প্রস্তাবনা দেয় জাতিসংঘের অফিস ফর আউটার স্পেস অ্যাফেয়ার্স; ২০১৩ সালে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়। এ প্রকল্পের ঘাঁটি হিসেবে বেছে নেওয়া হয় জাপানের কিউসু ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিকে (কিউটেক)। এ প্রকল্পের আওতায় চারটি দেশ এ প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট তৈরি করেছে।
এর আগে বাংলাদেশের ব্র্যাক অন্বেষা দলের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইন্টারন্যাশনাল স্পেস সেন্টারে পৌঁছানো ও ন্যানো স্যাটেলাইটটি কক্ষপথে স্থাপন নিয়ে আপডেট পরবর্তী সময়ে জানানো হবে। ’
ন্যানো স্যাটেলাইটটি তৈরির ৩ কারিগর হচ্ছেন রায়হানা শামস্ ইসলাম, আবদুল্লাহ হিল কাফি ও মাইসুন ইবনে মনোয়ার। তিনজনই ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল (ইইই) বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছেন। বর্তমানে তাঁরা জাপানে মাস্টার্স করছেন। গতকাল স্যাটেলাইটটি উেক্ষপণের পর তাঁরা ভিডিও পোস্টে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। ভিডিওতে মাইসুন বলেন, ‘এটি আইএসএস-এ পৌঁছানোর পর একে কক্ষপথে স্থাপন করা হবে। তারপর আমরা এটি থেকে সিগন্যাল পাওয়া শুরু করলেই পুরো কাজ সম্পন্ন হবে। ’
জানা যায়, এ স্যাটেলাইটটি গত ২ জুন আইএসএসের উদ্দেশে উেক্ষপণের কথা ছিল। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে জাপানে এক অনুষ্ঠানে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক সৈয়দ সাদ আন্দালিব কিউশু ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যানো স্যাটেলাইটটি গ্রহণ করেন। একই অনুষ্ঠানে জাপান অ্যারোস্পেস এক্সপ্লোরেশন এজেন্সির কাছে মহাকাশে উেক্ষপণের জন্য হস্তান্তর করা হয়।
নকশা তৈরি, উপকরণ সংগ্রহ, তারপর ন্যানো স্যাটেলাইট তৈরির সব কাজই করেছেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির জাপানে অবস্থানরত ওই তিন শিক্ষার্থী। অন্যদিকে গ্রাউন্ড স্টেশনে ছয়জন শিক্ষার্থী প্রাথমিকভাবে কাজ শুরু করেন যেখানে পরবর্তী সময়ে আরো দুই শিক্ষার্থী যোগ দেন। তাঁরা হলেন মোহাম্মদ সৌরভ, বিজয় তালুকদার, আইনুল হুদা, সানন্দ চয়ন, জামিল আরিফিন, আরাফাত হক, মো. শাকিলউজ্জামান এবং আদনান সাব্বির। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির দুজন শিক্ষক উপদেষ্টা হিসেবে গ্রাউন্ড স্টেশন টিমকে দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। তাঁরা হলেন সহযোগী অধ্যাপক ড. খলিলুর রহমান ও সহকারী অধ্যাপক ড. মো. হাসানুজ্জামান সাগর।
এন্টেনা সংযোজন, টাওয়ার স্থাপন ও স্টেশন নির্মাণের কাজে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্ট ও ব্র্যাকের কনস্ট্রাকশন ডিপার্টমেন্ট। স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে ইতিমধ্যেই এই গ্রাউন্ড স্টেশন মার্কিন ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (নোয়া) ‘নোয়া-১৮’ ও ‘নোয়া-১৯’ এর মতো আবহাওয়া স্যাটেলাইট এবং বিভিন্ন ন্যানো স্যাটেলাইটের বিকন (ডাটা) রিসিভ করা শুরু করেছে।
এই ন্যানো স্যাটেলাইটটি পৃথিবীর চারপাশে প্রদক্ষিণ করে আসতে ৯০ মিনিটের মতো সময় নেবে। এটি বাংলাদেশের ওপর দিয়ে দিনে চার থেকে ছয়বার উড়ে যাবে। নানা বিষয়ে গবেষণার জন্য উচ্চমানের ছবি তুলে পাঠাবে স্যাটেলাইটটি। মহাকাশসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ করা হবে এর অন্যতম কাজ।
গত ২৫ মে গ্রাউন্ড স্টেশনের উদ্বোধন হয় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির মহাখালী ক্যাম্পাসের ৪ নম্বর ভবনের ছাদে। উদ্বোধন করেন ব্র্যাকের চেয়ারপারসন ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারপারসন স্যার ফজলে হাসান আবেদ।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির গবেষকরা তাঁদের গবেষণা ও শিক্ষাদান কার্যক্রমে ন্যানো স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করবেন। মহাকাশ গবেষণা এবং স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল তৈরি করাও এই গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপনের একটি অন্যতম বিশেষ উদ্দেশ্য বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।