আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে ছাত্রলীগ বিষয়ে আজ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। সন্ধ্যা ৭টায় আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এতে ছাত্রলীগের বর্তমান অবস্থা, আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন, স্থানীয় নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীকে শোকজ-পরবর্তী করণীয় এবং মদদদাতাদের বিষয়সহ নানা বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। আলোচ্যসূচিতে এসব রাখা হয়েছে। দলীয় সূত্রে এসব জানা গেছে।
এদিকে ছাত্রলীগের নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে গণমাধ্যমে শোভন-রাব্বানীর দোষারোপমূলক বক্তব্যে ক্ষুব্ধ মনোভাব ব্যক্ত করেছেন ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা বলেন, না জেনে-না বুঝে ঢালাওভাবে ছাত্রলীগের আগের কমিটিগুলোর সমালোচনা করা হয়েছে। এ সমালোচনার মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী ছাত্রলীগের সোনালি অর্জনে কলঙ্ক এঁটে দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ করে এবং কিছু নেতা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত এমন মন্তব্য করে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে। ‘আওয়ামী লীগের শত্রু আওয়ামী লীগ’- এমন মন্তব্য করাও ঠিক হয়নি।
উল্লেখ্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য ১ হাজার ৪৪৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নির্বিঘ্নে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ঈদুল আজহার আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ টেন্ডার কমিটির কাছ থেকে দুই কোটি টাকা নেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখান থেকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগকে এক কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে। তবে পুরো প্রকল্প থেকে ছয় ভাগ চাঁদা দাবি করেন শোভন-রাব্বানী।
৮ আগস্ট রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের সঙ্গে তার বাসভবনে দেখা করে এই চাঁদা চান দুই নেতা। উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার পেয়েছে—এমন কোম্পানির কাছ থেকে ভিসিকে টাকার ব্যবস্থা করে দিতে বলেন তারা। কিন্তু ভাইস চ্যান্সেলর তাতে রাজি না হওয়ায় তার সঙ্গে দুই নেতা রূঢ় আচরণ করেন। পরে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করেন ভিসি। এতে চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন শেখ হাসিনা।
আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের একাধিক সদস্য জানান, এমন একটি মুহূর্তে দলের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক ডাকা হয়েছে যখন ছাত্রলীগের নেতৃত্ব নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। নতুন নেতৃত্বের সন্ধান করা হচ্ছে। তারা বলেন, বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে জোরালো আলোচনা ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এছাড়া জাতীয় সম্মেলনের দিনক্ষণ এগিয়ে এলেও কবে হবে, নাকি আদৌ হবে না- তা এখনও ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে। শনিবারের বৈঠকে এ বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
স্থানীয় নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের ব্যাপারে তারা বলেন, এরই মধ্যে ১৭৭ জন বিদ্রোহী প্রার্থীকে শোকজ লেটার দেয়া হয়েছে। এ সপ্তাহ থেকে মদদদাতাদেরও চিঠি পাঠানো হবে। তাদের শাস্তি কী হবে সেটিও নির্ধারণ হতে পারে বৈঠকে। এছাড়া দেশের চলমান বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করা হবে।
গত বুধবার রাতে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশে একটি চিঠি লিখেছেন। যা প্রধানমন্ত্রীকে পৌঁছে দিতে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমানের হাতে দিয়েছিলেন রাব্বানী। চিঠিতে তিনি নিজেদের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেন, ‘আপনি মুখ ফিরিয়ে নিলে যাবার কোনো জায়গা নেই।’ চিঠিতে শেখ হাসিনাকে ‘মমতাময়ী নেত্রী’ সম্বোধন করে কয়েকটি প্রোগ্রামে দেরিতে যাওয়ার কারণও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
জানা গেছে, রাব্বানীর চিঠিটি আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর কাছে পাঠানোর কোনো চেষ্টাই করা হয়নি। এর আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও দায়িত্বপ্রাপ্ত চার নেতা দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে দেখা করে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাননি। তাই এখন আর কোনো চিঠি নিয়ে দেখা করতে চান না তারা।
গত ৭ সেপ্টেম্বর গণভবনে আওয়ামী লীগের যৌথসভায় ছাত্রলীগের দুই নেতার ধারাবাহিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে কমিটি ভেঙে দেওয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এখনো প্রধানমন্ত্রী তার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন। ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষুব্ধ মনোভাব জানার পর সংগঠনটির পরবর্তী নেতৃত্বে কারা আসছেন- সেই আলোচনা এখন সর্বত্র। বর্তমান কমিটির মেয়াদ আরও ১০ মাস রয়েছে। তাই আগাম সম্মেলন হবে, নাকি সম্মেলন ছাড়াই নতুন নেতৃত্ব আসবে সেই আলোচনাও রয়েছে।
আজ শনিবার সবার নজর গণভবনের দিকে। সন্ধ্যা ৭টায় আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে অন্যান্য এজেন্ডার পাশাপাশি শোভন-রাব্বানীর ভাগ্য নির্ধারণ হবে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপি সংশ্লিষ্ট সকলকে যথাসময়ে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।
২০১৮ সালের ১১ ও ১২ মে ছাত্রলীগের সম্মেলন হওয়ার পর ৩১ জুলাই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সম্মতিতে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি ও গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।