কিকিউ মার্মা, বান্দরবান প্রতিনিধি: প্রাণঘাতী মহামারী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে নাজেহাল সারা বিশ্ব। প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হতে পারছে না। ঠিক তখনই গত ২১ এপ্রিল থানচিতে দুই জনের দেহে করোনা রোগ ধরা পড়লে গোটা উপজেলায় থমথমে আতংঙ্ক বিরাজ করছিল স্থানীয়দের মধ্যে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী লকডাউন অবস্থার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছিলেন থানচি বাসিন্দারা। ঠিক সেই মুহুর্তেই গত ২৭ এপ্রিল ভোরে হঠাৎ করে থানচি বাজারে আগুন লাগলে প্রায় ২’শত ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেই আগুনে সবকিছু পুড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে তারা। এতে কারো কাছে মাথা গোঁজার ঠাই না পেয়ে, সহায়হীন এসব পরিবারকে এখন বাধ্য হয়ে বাস করতে হচ্ছে নদীর চড়ে পলিথিনের তাঁবু করে কেউবা গাছের ঝুপরিতে খোলা আকাশের নিচে অমানবিক জীবন অতিবাহিত করছে দিন-রাত।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেই ভয়াবহ আগুনে পুড়ে সহায়-সম্বলহীন এই মানুষগুলোর যাওয়ার কোনও জায়গা নেই। বেঁচে থাকার তাগিদে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। ব্যবসায়ীরা কোনরকম তেরপাল ও পলিথিনের তাঁবু তৈরি করে হাইস্কুল মাঠে অস্থায়ী বাজারে নতুন করে ব্যবসায় শুরু করছেন। কেউবা নিজেদের পোড়া জায়গাটুকু পরিষ্কার করে বাঁশ আর পলিথিন দিয়ে কোনমতে তাঁবু তৈরি করে, অনেকে আশ্রয় কেন্দ্রে পরিবার-পরিজনদের নিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রয়াস চালাচ্ছেন। বান্দরবান উপজেলার থানচি বাজারে অগ্নিকান্ডের এলাকা ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
ক্ষতিগ্রস্থ কাঁচামাল ব্যবসায়ী শামসুর আলম বলেন, ‘আমার সহায়-সম্পত্তি যা ছিল আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কোন উপায় না পেয়ে দু’মুঠো ভাতের কথা চিন্তা করে কোন রকম ধারদেনা করে বাজারে বসেছি।’
ডিলার ব্যবসায়ী মো: একরাম কান্না ভরা কন্ঠে বলেন, সেহেরি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মসজিদের মাইকে শুনতে পাই আগুন আগুন। ওঠে দেখি দোকানের চালে আগুন জ্বলছে। পড়নের এক কাপড় নিয়ে জীবন বাঁচাতে বের হয়ে পড়ি।’
মেঘনা গ্রুপে প্রায় ২ লক্ষ টাকা ও যমুনা গ্রুপে ১৫ লক্ষ টাকা, মুদি দোকানে চাউল,ডাল, গমসহ দোকানে যা ছিল আগুনে পুড়ে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।
বাজার করতে আসা ভোক্তা ডেভিড ত্রিপুরা বলেন, ‘চারটি ইউনিয়ন মিলে থানচি বাজারটা হচ্ছে একমাত্র সম্বল। আগুনে পুড়ে যাওয়াতে টাকা থাকলেও নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করতে পারছি না। বিশেষ করে ঔষধের দোকানগুলি পুড়ে যাওয়াতে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে জনসাধারণদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।’
থানচি বাজার কমিটি সা: সম্পাদক জয়নুল আবেদীন সিকদার জানান, বাজার স্থানটি নদীর কিনারে হওয়ায় স্থানীয়দের বুঝে ওঠার আগেই বাতাসের গতিতে চারিদিকে আগুন ছড়িয়ে পড়লে মুহুর্তেই সম্পূর্ণ পুড়ে ধুলিসাৎ হয়ে গেছে। আগুনে পুড়ে যেভাবে নি:স্ব হয়ে পড়েছে, এখান থেকে উত্তরণের জন্য সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে। আমরা পুনরায় যাতে করে মনোবল নিয়ে ব্যবসায় শুরু করতে পারি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে থানচি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থোয়াইহ্লামং মারমা জানান, এই অগ্নিকান্ডের খবর শোনা মাত্র ছুটে আসেন চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপি। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আর জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের নগদ ১০ হাজার টাকা এবং নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রদান করা হয়েছে। যতক্ষণ পযর্ন্ত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না ততক্ষণ পর্যন্ত এই অসহায় মানুষদের পাশে আমাদের সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
এমন বৃষ্টির দিনে করুণ জীবন কাটতে হচ্ছে তাদেরকে এমন প্রশ্ন করা হলে এই প্রতিবেদককে তিনি জানান, এই অসহায় মানুষ গুলো যেভাবে তাদের দোকান এবং ঘর হারিয়ে বসে অাছে। তাদের এখন মাথায় গোঁজার ঠাঁই নেই, যেহেতু করোনা ভাইরাসের কারণে স্কুল বন্ধ। তাই আমরা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত হিসেবে তাদের জন্য থানচি সরকারি মডেল প্রাইমারি আর হাইস্কুল আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে খুলে দিয়েছি। তাছাড়া প্রশাসনের পক্ষ থেকে অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় মানুষদের জন্য রান্না করে দুই বেলা খাবার বিতরণ করে যাচ্ছি। যতদিন পর্যন্ত স্বাভাবিক না হয় ততদিন পর্যন্ত চালিয়ে যাবেন বলে আশ্বাস প্রদান করেন এই জনপ্রতিনিধি।