Monday, July 27

পুলিশকে ঘুষখোর না বলি, পুলিশ সদস্যদের মনোবল বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিজেদের মনোভাব পরিবর্তন করি

0

লেখক: মোহাম্মদ সাব্বির রহমান, অফিসার ইনচার্জ নানিয়ারচর থানা, রাঙ্গামাটি।

বাঙ্গালী জাতি যুদ্ধ দেখেছে ১৯৭১ সনে। সেই যুদ্ধের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে প্রথম প্রতিরোধ করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিল পুলিশ।

কোভিড-১৯ যুদ্ধে দেশ মাতৃকার সেবাই এবারও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে প্রথম মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে পুলিশ। করোনার মহাযুদ্ধে পুলিশের কোন প্রশিক্ষণ নেই। তারপরও ‍জীবন দিয়েই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।

দেশের সাধারণ মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সম্মুক সময়ে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। অদৃশ্য এক অনুজীবের বিরুদ্ধে কঠিন এ যুদ্ধে সংক্রমিত প্রায় ৪.১০ মিলিয়ন মানুষ।

আমরা অনেকেই পুলিশ দেখলে ঘুষখোর পুলিশ বলি। মানে হলো বাংলাদেশের সরকারী কর্মচারীদের মধ্যে একমাত্র পুলিশ ঘুষ খায়। আর সবাই সাধু। অথচ ঘুষ খেয়ে কিংবা দূর্নীতির দায়ে ক-জন পুলিশ গ্রেপ্তার হয়েছে তার খবর কেউ কি রাখি? পুলিশ দেখলে কেউ কেউ নাক সিটকাই। কেউ দূরে সরে যায়। পুলিশ বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা চাইলে অবজ্ঞা করে এড়িয়ে যান অনেকেই। এখন এসব ঘুষখোর লোকের বেশি প্রয়োজন হচ্ছে ।

আজ পুলিশের অব্যাহত মানবিক দৃষ্টান্ত সমাজ জীবনে ঘটেছে আলোর বিচ্ছুরন। প্রতিদিন শহর কিংবা গ্রাম, দিন কিংবা রাত সর্বত্রই ছুটে চলেছে বাংলাদেশ পুলিশ। দুবির্ষহ গরমে ও বৃষ্টির মধ্যেই রাস্তায় পুলিশ সদস্য সবর্দাই জনগণের সেবাই নিয়োজিত।

করোনাভাইরাসের কমিউনিটি সংক্রমণ প্রতিরোধকল্পে জনগণকে নিরাপদে ঘরে রাখতে পুলিশ সদস্যরা মাঠে থেকে দিনরাত আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।

সারাদেশে রোবাস্ট কনভয় পেট্রোলিং, শক্তিশালী চেকপোস্ট, মোবাইল পেট্রোলিং, উচ্চপ্রযুক্তিসম্পন্ন সিসিটিভি মনিটরিং, বিভিন্ন সোসাইটিকে সম্পৃক্তকরণের মাধ্যমে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত ও মানুষদের নিরাপদে ঘরে রাখার জন্য বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে।

কর্মহীন, অসহায়, দুস্থ নিম্ন আয়ের মানুষ বিশেষ করে নিম্ন মধ্যবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত যারা হাত পাততে পারেন না এরকম ক্ষুধার্ত প্রায় ১ লক্ষ পরিবারকে তাদের পরিচয় গোপন রেখে বাসায় গিয়ে ১ এপ্রিল থেকে খাদ্য সহায়তা পৌঁছাচ্ছে এসব কথিত ঘুষখোর পুলিশ। বর্তমানে পুলিশের এই পদ্ধতি অনুসরণ করে অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নিম্ন মধ্যবিত্ত/মধ্যবিত্তদের মাঝে খাদ্য সহায়তা প্রদান করতে দেখা যাচ্ছে।

কোভিড-১৯ যুদ্ধে পুলিশ প্রকাশ্যে গোল চিহ্ন দিয়ে বাধ্যতামূলক সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করেই বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের অর্থে খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে। প্রতিদিন অসংখ্য দুস্থদের মাঝে রান্না করা খাবার বিতরণ করছে। নিজেদের বেতনের টাকা দিয়ে নিয়মিতভাবে জীবাণুনাশক স্প্রে করছে। কাঁচাবাজার ও সুপারশপ, ওষুধ ও নিত্যপণ্যের দোকানে স্টিকার কিংবা রং দিয়ে সামাজিক দূরত্ব নির্দিষ্টকরণ করছে।

যখন স্বামী-সন্তান তার স্ত্রী-মাকে জঙ্গলে ফেলে রেখে আসছে, তখন এসব কথিত ঘুষখোর পুলিশ করোনাভাইরাস আক্রান্তদের হাসপাতালে পাঠানো, ছাড়াও বিভিন্ন বাসায় ওষুধ ও নিত্যপণ্য পৌঁছাচ্ছে। আবাসস্থল সংলগ্ন এলাকা লকডাউন ও আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টিন নিশ্চিতে সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে মানবিক পুলিশ সদস্যরা কাজ করছে।

করোনাভাইরাসে মৃত ব্যক্তির সৎকার করতে যখন কেউ এগিয়ে আসছে না তখনও নিবেদিত এসব কথিত ঘুষখোর পুলিশ সদস্যরা ধর্মীয় বিধি মেনে মৃত ব্যক্তির সৎকার নিশ্চিত করে চলেছেন। শিক্ষার্থীদের দিচ্ছে শিক্ষা উপকরন। সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব সর্বোপরি সাধারণ মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই সর্বস্ব বিলিয়ে এই পুলিশ সদস্যরা তৎপর এই করোনাভাইরাসের মহাদুর্যোগ থেকে সবাইকে রক্ষা করার জন্য। এসব কাজ করতে গিয়ে ইতিমধ্যে সারাদেশে প্রায় ২ হাজার পুলিশ সদস্য করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। অনেকেই কোয়ারেন্টিনে আছেন। তারপরও এই দুর্গম পথ পাড়ি দিতে এসব কথিত ঘুষখোর পুলিশ সদস্যরা নিবেদিত মানবতার দীপ্তশপথে বলীয়ান।

তাই আসুন, আর পুলিশকে ঘুষখোর না বলি, পুলিশ সদস্যদের মনোবল বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিজেদের মনোভাব পরিবর্তন করি। ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মচারীদের জন্য সরকার ১০০ কোটি টাকা প্রনোদনা ঘোষনা করেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের মতো পুলিশ সদস্যরা কি প্রনোদনার যোগ্য নয়? মহান আল্লাহপাক আমাদের এই মহামারী হতে রক্ষা করুক, এই হোক সকলের প্রার্থনা।

লেখক: মোহাম্মদ সাব্বির রহমান, অফিসার ইনচার্জ নানিয়ারচর থানা, রাঙ্গামাটি।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.