নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বৃক্ষ মেলা কি সবুজের বার্তা পৌছিয়ে দেয়ার জন্য না নিছক নিজেদের ব্যবসার জন্য আয়োজন করেছে নান্দনিক চট্টগ্রাম মেয়র অ্যাওয়ার্ড ও সবুজ মেলা, অপরিকল্পিত আয়োজন দেখে এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে দর্শনার্থী ও মেলায় অংশগ্রহনকারী ষ্টল মালিকদের। গত ৮অক্টোবর ২০২২ইং তারিখে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও তিলোত্তমা নামে একটি অনিবন্ধিত সংগঠনের যৌথ উদ্যেগে নগরীর প্যারেড মাঠে সপ্তাহ ব্যাপী সবুজমেলা শুরু হয়েছিল । সপ্তাহব্যাপী এই মেলা চলার কথা। সেই হিসেবে ৮ অক্টোবর শুরু হয়ে শুক্রবার (১৪ অক্টোবর) আনুষ্ঠানিক সমাপনী অনুষ্ঠানও করা হয়। তবে সেই মেলা চলছে এখনও। মাঠের কোন সংস্কার কাজ না করে তড়িগড়ি করে সবুজমেলা উদ্বোধন করা হয়। যার ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই মাঠে পানি জমে গেছে। মেলায় কাদাযুক্ত মাঠ ষ্টল মালিক, দর্শনার্থী ও ক্রেতাদের চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। নার্সারীর মালিক ও দশনার্থীরা হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে কয়েকজন বিক্রেতা বলেন, আমরা ভাড়া দিয়েছি, ষ্টল করেছি, এবং কর্মচারী খাটিয়েছি, মনে হচ্ছে এই মেলা থেকে লাভতো দুরের কথা, খরচ তুলে আনতে পারবোনা। পুরো মাঠ কাদাযুক্ত হওয়ায় কাঙ্খিত ক্রেতা ও দর্শনার্থী আসেনি। গাছ যা এনেছি এখনো ২০ভাগ গাছ বিক্রি হয়নি। আমাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে তিনদিন পর চিকন রাস্তার মতো করে ইট বিছিয়েছে। যা দুজন ক্রেতা গাছ নিয়ে একসাথে হেটে যেতে পারবেনা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নার্সারী মালিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই সময় বৃস্টির কোন ঠিক ঠিকানা নেই, মেলা শুরু থেকে ইট ও বালি দিয়ে মাঠকে উপযুক্ত করা হলে মাঠে পানি জমে কর্দমাক্ত হতনা। ক্রেতা ও দর্শনার্থিদের দ্বারা মাঠ মিলনমেলা হয়ে যেত। আমরা বিক্রিতে ভাল সাড়া পেতাম। এই পরিবেশে দশনার্থীরা কিভাবে নাসার্রীর স্টলে আসবে বা আমরা কিভাবে গাছের চারা বিক্রয় করব।
তবে মেলার একাধিক নার্সারি স্টলের মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিলোত্তমার শাহেলা আবেদীনের হাতেই মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিন ১০ হাজার টাকা এবং গত ১৪ অক্টোবর শুক্রবার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির দিন বাকি ১০ হাজার টাকা দেন নার্সারীর দোকানিরা। তবে এই টাকার বিনিময়ে কোনো ধরনের রশিদ দেয়নি মেলা আয়োজন সহযোগী প্রতিষ্ঠানটি। এক নার্সারি মালিক জানান, এর আগে যতগুলো মেলা হয়েছে তাতে পে-অর্ডারের মাধ্যমেই নির্ধারিত ফি দিয়ে স্টল বুকিং করেছেন সবাই। কিন্তু এবারেই তার ব্যতিক্রমটা দেখা গেছে। টাকা দেওয়ার পরও কাঙ্খিত সুযোগ সুবিধা পায়নি বলে আয়োজকদের প্রতি ক্ষোভ জানান মেলায় আসা দোকানিরা। তবে দিনশেষে হতাশা ও ক্ষতিতেই দোকান ছাড়তে হচ্ছে দোকানীদের। মেলার অব্যবস্থাপনা, বৃষ্টি ও চাঁদাবাজির জন্য আয়োজকদেরই দোষ দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এর আগে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আয়োজনে একাধিক মেলায় অংশগ্রহণ করলেও এবারের মত বাজে পরিস্থিতি আগে কখনও দেখতে হয়নি বলে জানান তারা।
দর্শনার্থীদের কয়েকজন বলেন, মাঠে পানি জমে আছে ইচ্ছা থাকলেও গাছ দেখতে যেতে পারছি না। কাদা ঠেলে গাছ কিনতে ইচ্ছা জাগছে না। আসলে মেলা শুরু করার আগেই চলাচলের জন্যে ইট বিছানো বা পরিবেশটা মেলার আমেজে করা উচিত ছিল।
এর মধ্যে আয়োজক তিলোত্তমার পক্ষে দেওয়া প্রেস রিলিজে দেখা যায়, প্রায় ১৮টি নার্সারী ও খাবারের দোকান মেলায় অংশগ্রহণ করছে। প্রতিটি দোকান থেকে ২০হাজার টাকা করে নেন সংগঠনটি । জানা যায়, চসিকের পক্ষ থেকে ৫ লক্ষ টাকা অনুদান পান। স্পন্সর সাইফ পাওয়ার টেক ও ইস্পাহানী থেকে বড় ধরণের অনুদান নেওয়ার কথাও শুনা গেছে। সেই সাথে সাহাবুদ্দিন ডেকোরেটার্সের স্বত্বাধিকারী সাহাবুদ্দিন মিয়া বলেন, আমিতো শুধু ডেকোরেশনের জিনিসপত্রের ভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন ধরেছি। কোন ডেকোরেশন ফি ধরি নাই। চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষ মোজাহেদুল ইসলাম চৌধুরীর কাছে মেলার জন্য দেয়া মাঠের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বৃক্ষমেলার কথা বলাতে আমরা মাঠ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছি। কোন ভাড়া বা অর্থ নির্ধারন হয়নি।
নগরীর চকবাজারের মতো জায়গায়, চট্টগ্রাম কলেজের মাঠে এই মেলাটিতে আয়োজকরা খরচ করলে অনেক নান্দনিক ও লাভজনক হতে পারতো। অনেক ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের ভীড় থাকতো। কিন্তু কতৃপক্ষ মেলার আয়োজন করলেও মেলার আমেজ দিতে পারেনী নগরীর সবুজ প্রেমী মানুষদের। দুএকজন স্টলের কর্মচারী বলছে, যারা আয়োজন করেছে তাদের উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসা। তাদের ব্যবসা তারা করে ফেলেছে। এখন আমাদের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারলে হলো।
তিলোত্তমার প্রধান সাহেলা আবেদীনের কাছে জানতে চাইলে তিনি জবাবদিহিকে বলেন, চট্টগ্রাম নগরীর মানুষকে সবুজ গাছ সম্পর্কে নতুন করে জানাতে চট্টগ্রাম কলেজের মাঠে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আয়োজনে এবং তিলোত্তমা সংগঠনের উদ্যগে করা হয় বৃক্ষমেলা। তার সংগঠনের নিবন্ধন আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিবন্ধন নেই, নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। এছাড়া মেলার অব্যবস্থাপনার কথা জানতে চাইলে সাহেলা আবেদীন বলেন, আমি সবুজ নিয়ে কাজ করি। মেলার মাধ্যমে আমি মানুষকে সবুজের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মেসেজ দিতে চাই। মানুষ যাতে গাছকে ভালবাসে, পরিবেশকে সুন্দর করে। গাছ বিক্রেতাদের থেকে ভাড়া নেয়া ও সিটি কর্পোরেশন থেকে ৫ লক্ষ টাকা অনুদান ও স্পন্সরদের থেকে সহযোগীতা নিয়ে তিনি কেন মাঠ সংস্কার করেননি এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তার উত্তর এড়িয়ে আয়োজকের ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড জানার জন্য বলেন।
সিটি কর্পোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি আব্দুল্লা আল ওমরকে মেলার অব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, অন্যান্য বার বার আমরা মেলার আয়োজন করলেও তিলোত্তমা সাহেলা আবেদিনের আগ্রহের কারনে বৃক্ষ মেলাকে অগ্রাধিকার দিয়ে তাকে আমরা মেলার দায়িত্ব দিয়েছি, এবং সিটি কর্পোরেশন থেকে ৫ লক্ষ টাকা অনুদান দিয়েছি। মাঠ কাদাযুক্ত হওয়ার পর মাঠে বালূ ও ইটও কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে সরবরাহ করা হয়েছে। এই মেলাটা সম্পূর্নভাবে তিনিই আয়োজন করার কথা। মেলার দোকান বা স্পন্সরদের থেকে কত নিয়েছেন, তা আমরা এখনো অবগত নই। সিটি কর্পোরেশন এই মেলা থেকে কোন লাভ পাবে কিনা এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান।