Friday, November 6

প্রথমবারের মত পালিত হচ্ছে রাজশাহী মুক্ত দিবস

0

হাবিব জুয়েল, রাজশাহী:: ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাজশাহীকে শত্রুমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। এই দিনটিকে পালন করার জন্য রাজশাহী নগরীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে ১৮ ডিসেম্বর বিকেল ৩টায় এক সমাবেশের আয়োজন করেছে আতাউর রহমান স্মৃতি পরিষদ। স্বাধীনতার পর যা প্রথম।

এ নিয়ে বদ্ধভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন, রাজশাহীতে গণহত্যা নিয়ে সরকারি উদ্যোগে প্রামাণ্যচিত্র তৈরিকরণ, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য নির্মাণ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের শাখা স্থাপনসহ বিভিন্ন দাবি নিয়ে নগরীতে লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রাহক ওয়ালিউর রহমান বাবু বলেন, স্বাধীনতা অর্জনের ৪৬ বছর পর সমাবেশ আকারে প্রথমবারের মতো এবার রাজশাহী মুক্ত দিবস পালন করা হবে। এর আগে এই দিবস পালন করা হয়েছে। তবে খুব ছোট এবং ঘরোয়া পরিবেশে। কিন্তু রাজশাহীতে অনেক অনুষ্ঠান করা হয় ঘরের বাইরে। সে চিন্তা থেকে আমরা এবার বাইরে বড় আকারে মুক্ত দিবস সমাবেশ করে পালন করবো। এতে করে সব শ্রেণি পেশার মানুষ রাজশাহীর স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস জানতে পারবেন।

মুক্তিযুদ্ধকালে রাজশাহী ছিল ৭ নম্বর সেক্টরের অধীনে। সেক্টর কমান্ডার মেজর নাজমুল হক শহীদ হবার পর এই সেক্টরের দায়িত্ব নেন কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান (বীর উত্তম)। এর আগে পাকিস্তানি সৈন্যরা রাজাকার আলবদর পাকিস্তানপন্থী অবাঙালি ও দোসরদের মদদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমিতে নির্যাতন করে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার বন্দিকে হত্যা করে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ৭ নম্বর সেক্টর লাল গোলা সাব সেক্টর কমান্ডার মেজর গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী (বীর বিক্রম )ও শেখপাড়া সাব সেক্টর কমান্ডার মেজর রশিদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা উত্তর, পূর্ব পশ্চিম ও দক্ষিণে পদ্মা নদীর চরাঞ্চলে প্রতিরোধ গড়ে তুলে রাজশাহী শহরের দিকে এগিয়ে আসছিল। মিত্রবাহিনীর যুদ্ধ বিমানকে স্বাগত জানাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে স্বাধীনতাকামীরা। পাকিস্তানি সৈন্যদের পরাজয় তখন কেবল সময়ের ব্যাপার। রাজধানী ঢাকার কাছে পৌঁছে গেছে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর বিশাল বহর। এ খবর ছড়িয়ে পড়তে থাকলো মুখে মুখে। রোজা রাখেন নানা বয়সী স্বাধীনতাকামী নারী পুরুষেরা। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা হাত তুলে কৃতজ্ঞতা জানাতে থাকে সৃষ্টিকর্তার কাছে। বাড়িঘরে বেতার যন্ত্রের সামনে অপেক্ষা করে অবরুদ্ধ স্বাধীনতাকামী মানুষেরা। পাকিস্তানপন্থীরা দাঙ্গা বাঁধানোর অপচেষ্টা করতে থাকলো। বাড়িঘর থেকে বেরিয়ে পড়লো অবরুদ্ধ থাকা স্বাধীনতাকামীরা। স্বজন হারানোর শোক বিজয়ের আনন্দে উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠতে থাকলো চারিদিকে। আত্মগোপন করলো রাজাকার, আলবদর ও পাকিস্তানপন্থীরা। মুখোশ পাল্টিয়ে বেশ কিছু দোসর মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাগত জানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

এরপর মুক্তিবাহিনীর অগ্রগামী একটি দল সাদা পতাকা উড়িয়ে সাদা পাগড়ি আর আত্মসমর্পনের বার্তা নিয়ে রাজশাহী শহরের উপকণ্ঠে আসে। পাকিন্তানি সেনাদের গুলিতে প্রাণ হারালো অনেকে। স্বজনদের ভিড় তখন বন্দিশালার আশপাশে। বেরিয়ে আবেগে আপ্লুত বন্দিরা।

বিজয়ী মক্তিযোদ্ধাদের ফুলের পাপড়ি আর গোলাপ পানি ছিটিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। বরণ করা হয় মিত্রবাহিনীকেও। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষেরা খাদ্য সরবরাহ করে। অবাঙালি মহল্লা থেকে উদ্ধার করা হয় অস্ত্র। বিভিন্ন টর্চার ক্যাম্প, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ধার হতে থাকে নির্যাতিত নারী পুরুষরা। স্বজন ঘনিষ্ঠরা বধ্যভূমিগুলিতে স্বজনদের লাশ খুঁজতে থাকে।

১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর সকালে রাজশাহীর মাদ্রাসা হাইস্কুল মাঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পর ৭নম্বর সেক্টারের সাব সেক্টর ৪ এর তৎকালিন কমান্ডার মেজর গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকা তুলে রাজশাহীকে মুক্ত ঘোষণা করেন। তাকেই এই অঞ্চল পরিচালনা জন্য প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তৎকালীন পৌরসভা ভবনকে কন্ট্রোল রুম করে পরিচালিত হয় প্রশাসন।

এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সরকার ব্যাপকভাবে চিন্তা করায় আমাদের সম্পর্কে অন্যরা এখন জানতে চায়। তাই রাজশাহীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আমাদের ব্যাপক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হবে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে। সেই সাথে আমাদের মধো বিভেদ দূরত্ব কমাতে হবে। ’

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.