শীতের রিক্ততা মুছে প্রকৃতিজুড়ে সাজ সাজ রব এখন। শিশিরের দিন মিলিয়ে গেল রঙমাখা এক নবপ্রকৃতিতে। বায়ুগন্ধে বিভোল আজ মাধবীবিতান। নীল আকাশের সোনাঝরা আলোর মতোই আন্দোলিত হৃদয়। দখিন বাতাসে মর্মর বেণুবন। নেচে নেচে সুখ জাগাচ্ছে প্রজাপতি। পাখায় ভিখারির বীণা বাজিয়ে মধুপিয়াসী মৌমাছিরা খুঁজে ফিরছে ফুলের দখিনা। ঝরাপাতা জাগিয়ে গেল নতুন সবুজ কিশলয়। কনকলতা, কাঞ্চন ও পারিজাতেরা জুড়িয়ে যায় দৃষ্টি আর ভুলায় এই বিবাগী মন। আপ্লুত। আহা! কী আনন্দ আকাশে বাতাসে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘আহা, আজি এ বসন্তে/কত ফুল ফোটে, কত বাঁশি বাজে/কত পাখি গায়।’ বছর ঘুরে আবার এলো সেই ফুল ফোটার দিন। আজ মঙ্গলবার। পহেলা ফাল্গুন।
বসন্তের প্রথম দিনে আজ নানা আয়োজনে আলোড়িত হবে রাজধানী ঢাকা। তরুণ-তরুণীরা বইমেলা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, চারুকলার বকুলতলা মাতিয়ে রাখবে সারা দিন। নগরীর বিভিন্ন উদ্যান, খাবারের দোকানগুলো মুখর থাকবে। মোবাইল ফোনে এসএমএস আদান-প্রদান, ফেসবুক, টুইটার প্রভৃতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও শুভেচ্ছা জানানোর মধ্য দিয়ে বরণ করা হবে ঋতুরাজ বসন্তকে। রাবীন্দ্রিক সুর বাজুক সবখানে:
রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোক পলাশে
রাঙা নেশা মেঘে মেশা প্রভাত-আকাশে
নবীন পাতায় লাগে রাঙা হিল্লোল।
দ্বার খোল, দ্বার খোল।
কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বসন্তে ফুল না ফুটবার চিরায়ত দ্বিধার ভেদ ভেঙে বসন্ত ঠিকই পা রেখেছে বাংলাভূমে। ফাগুনের বনও সেজেছে ফুলের সম্ভারে। কোথাও কোনো এক আকুল সখীর হৃদয় কুসুমে অনাদরে বিচ্ছেদের বিয়োগান্তক সুর বেজে যাবে। সেই দুঃখিনীদের নয়নের নীড় সুখীজনেরা না দেখুক না বুঝুক তবু আজ প্রাণজাগানিয়া বসন্ত। এত পাখির গান এত বাঁশির আয়োজন সবই সমর্পিত থাক আগুনঝরা এই ফাগুনে।
বসন্তের প্রকৃত রূপ দেখা যায় গ্রামে; শহরে তেমন নয়। ষড়ঋতুর দেশে আবহমান গ্রামবাংলার প্রকৃতিতেই মূলত বসন্ত জানান দেয় তার আগমনী বারতা। গ্রামের মেঠো পথ, নদীর পাড়, বৃক্ষরাজি, মাঠভরা ফসলের ক্ষেত বসন্তে রঙিন হয়ে ওঠে। নিসর্গের বর্ণচ্ছটায় প্রকৃতি হয়ে ওঠে বাঙ্ময়। কচি পাতায় আলোর নাচনের মতোই তখন বাঙালির মনে দোলা লাগে, হৃদয় উচাটন হয়।
বসন্তের সাজে আজ মানুষ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়বে, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হবে। প্রীতির বন্ধনে আপন মহিমায় খুঁজে নেবে বসন্তকে। সেই মিলনের তাগিদে আজ সারা দিন দেশের নানা প্রান্তে বসন্তবরণে মেতে উঠবে জাতি।
বাংলা নববর্ষের সূত্রপাতকারী আদিপুরুষ মোগল সম্রাট আকবর ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে বর্ষবরণকে সামনে রেখে ১৪টি উৎসবের প্রবর্তন করেন। তার মধ্যে একটি ছিল বসন্ত উৎসব। ১৪০১ সাল থেকে ঢাকায় জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদের আয়োজনে আনুষ্ঠানিকভাবে বসন্ত উৎসব আয়োজন করা হচ্ছে। এর আগে অনানুষ্ঠানিকভাবে হলেও সাড়ে চারশ বছর ধরে আমরা সম্রাট আকবরের ঐতিহ্য বহন করে চলেছি। আজকের দিনে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। রেডিও, টেলিভিশন চ্যানেল বা পত্রিকাগুলোতেও থাকছে বিভিন্ন বাসন্তী স্পেশাল।
ঋতু গবেষকদের মতে, পুরাকালে বসন্ত ও গ্রীষ্ম মিলে চার মাসে একটি ঋতু ছিল। তারপর চার মাস বর্ষা, এরপর চার মাস শীত ঋতু। প্রকৃতির স্বভাব অনুযায়ী বসন্ত ও গ্রীষ্মে উদ্ভিদ-বৃক্ষরাজি নবপত্রে বিকশিত হয়ে পুষ্পসম্ভারে নিজেদের সাজিয়ে নেয়। পাশাপাশি মানুষ ও প্রাণবৈচিত্র্যের চিত্তচাঞ্চল্যও শুরু হয়। বসন্তবন্দনায় তাই আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন :
এল এ বনান্তে পাগল বসন্ত
বনে বনে মনে মনে রঙ সে ছড়ায়রে
চঞ্চল তরুণ দুরন্ত।
কর্মসূচি : নাচ, গান ও কবিতাসহ নানা বর্ণাঢ্য আয়োজনে বসন্ত বরণ করবে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদ্যাপন পরিষদ। দীপন সরকারের গিটারে বসন্তবাহার যন্ত্রসংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সকাল ৭টায় চারুকলার বকুলতলায় শুরু হবে এই উৎসব। উৎসবের উদ্বোধনী পর্বে থাকবে বসন্ত কথন পর্ব, আবির বিনিময়, রাখিবন্ধন, ধ্রুপদি, দলীয় নৃত্য ও দলীয় সংগীত। বরেণ্য শিল্পীদের অংশগ্রহণে একক আবৃত্তি ও একক সংগীত পরিবেশন। এ পর্ব শেষ হবে সকাল ১০টায়। এরপর বিকেল সাড়ে ৩টায় একযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলা, লক্ষ্মীবাজারের বাহাদুরশাহ পার্ক, ধানমণ্ডি ৮ নম্বর রোডসংলগ্ন রবীন্দ্রসরোবর উন্মুক্ত মঞ্চ এবং উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টর রবীন্দ্র সরণির উন্মুক্ত মঞ্চে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে এই আয়োজন। শিল্পকলা একাডেমি আয়োজন করেছে তিন দিনের বসন্ত উৎসব। আজ সকাল ১০টায় এ উৎসব শুরু হবে নন্দন মঞ্চে।