চট্টগ্রামে প্রায় তিন লাখ ভবন আছে। এর মধ্যে ৬-৭ হাজার বহুতল ভবন আছে। চট্টগ্রাম নগরীতে আবাসিক ও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত বহুতল ভবনগুলোর ৯৭ শতাংশ আগুনের ঝুঁকিতে আছে। এসব ভবনের মধ্যে ৯৩ শতাংশের অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত অনাপত্তিপত্র এবং ৯৭ শতাংশের ছাড়পত্র নেই। আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে বহুতল ভবনগুলোর মালিক ও বাসিন্দাদের অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনার আওতায় আনতে না পারলে চট্টগ্রামেও বিপর্যয় অপেক্ষা করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর সিডিএ বলছে নিরাপত্তা নিশ্চিতে এবার বিশেষ অভিযান চালানো হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।
চট্টগ্রাম নগরীতে বহুতল ভবনের পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ডের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে বিভিন্ন বস্তি-কলোনি, মার্কেট, শপিং মল ও বিপণী বিতানগুলো। আইন অনুযায়ী, যেকোনো বহুতল ভবন নির্মাণের আগে ফায়ার সার্ভিসের অনাপত্তিপত্র নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) হিসেবে, চট্টগ্রাম নগরীতে প্রায় ৭ হাজারের মতো বহুতল ভবন আছে। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ভবন আবাসিক এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে। আবাসিক ও বাণিজ্যিক উভয় ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ভবনগুলোই সবচেয়ে বেশি আগুনের ঝুঁকিতে আছে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।
চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগের সহকারী পরিচালক জমিস উদ্দিন বলেন, ভবনের কাজ শুরুর আগে ফায়ার সার্ভিসের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র নেওয়ার যে বিধান আছে, ৯৩ শতাংশ ভবনের সেই অনাপত্তিপত্র নেই চট্টগ্রামে। ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার পর অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ক ছাড়পত্র নেওয়ার বিধান থাকলেও ৯৭ শতাংশ ভবনের সেই ছাড়পত্র নেই। ৯৭ শতাংশ ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতের কোনও ব্যবস্থাই নেই। এ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণও নেই ভবনের বাসিন্দাদের।
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভবনগুলোতে স্থায়ী অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমণ সিঁড়ি, ফায়ার লিফট, ফায়ার কমান্ড স্টেশন, এক ভবন থেকে আরেক ভবনের যেতটুকু দূরত্ব থাকা দরকার সেগুলো নেই এসব ভবনগুলোতে। বর্তমানে সতর্ক করা হচ্ছে। এরপরও না শুধরালে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।
অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন-২০০৩ অনুযায়ী ছয় তলার বেশি উচ্চতার ভবন নির্মাণ করতে হলে তিন স্তরের অগ্নিনিরাপত্তা পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। এর নিচে হলে দুই স্তরের অগ্নিনিরাপত্তা পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি আশিক ইমরান বলেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উচিত ভবন নির্মাণে কাজের নিয়মিত নজরদারি রাখা। যারা ব্যবস্থা গ্রহণ করে নাই তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হলে মনুষ সচেতন হতো এবং নিয়ম মেনে ভবন তৈরি করতো। তিনি আরও বলেন, বহুতল ভবনের মালিকদের বাধ্য করতে হবে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা করার। এর ব্যত্যয় হলে ভবন ব্যবহারে বাধা দিতে হবে। এ সময় তিনি অগ্নিকাণ্ড রোধে ভবন মালিকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে চট্টগ্রামের যে ৪৩টি কলোনি-বাজার, মার্কেট-বিপণী বিতানকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে ফায়ার সার্ভিস বিভাগ, সেগুলো হচ্ছে— হক মার্কেট, স্বজন সুপার মার্কেট, বখতেয়ার মার্কেট, নজু মিয়া হাট মার্কেট, বলিরহাট মার্কেট, ভেড়া মার্কেট, চাক্তাই চাউল পট্টি, শুটকি পট্টি, খাতুনগঞ্জ, আছাদগঞ্জ, মিয়াখান নগর পুরাতন ঝুট মার্কেট, ওমর আলী মার্কেট, পোর্ট মার্কেট, বড়পুল বাজার, ইশা মিস্ত্রি মার্কেট, ফকির হাট মার্কেট, নয়াবাজার মার্কেট, ফইল্ল্যাতলি বাজার, চৌধুরী মার্কেট, রেলওয়ে বস্তি, কলসি দিঘীর পাড় এলাকাধীন কলোনি, আকমল আলী এলাকাধীন কলোনি, চকভিউ সুপার মার্কেট, কেয়ারি শপিংমল, গোলজার মার্কেট, রিয়াজউদ্দিন বাজার, জহুর হকার মার্কেট, টেরিবাজার, তামাকমুন্ডি লেইন, ঝাউতলা বস্তি, আমবাগান বস্তি, সেগুন বাগান বস্তি, কদমতলী রেলওয়ে বস্তি, সিঙ্গাপুর সমবায় সমিতি মার্কেট, কর্ণফুলী মার্কেট, দুই নম্বর গেইট রেলওয়ে বস্তি এলাকা, অক্সিজেন রেল রাস্তা সংলগ্ন বস্তি, বার্মা কলোনি, ড্রাইভার কলোনি, রৌফাবাদ কলোনি ও শেরশাহ কলোনি।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা চাই, ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে অন্যান্য সংস্থাও এগিয়ে আসুক। আমরা আইন মানতে তাদের বাধ্য করি। দুর্ঘটনা ঘটবে। কিন্তু বিপর্যয় থেকে যেন আমরা মানুষকে হেফাজত করতে পারি। মানুষকেও নিজেদের রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে।’
আর চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহিনুল ইসলাম বলেন, অনেক ভবনের অনুমোদন নেয়া হলেও নির্মাণের সময় ঠিকভাবে বিল্ডিং কোড মানা হয়নি। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবার বিশেষ অভিযান চালানো হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।