Monday, September 7

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ নির্মাণ বাস্তবায়ন পরিষদ-চট্টগ্রাম এর সংবাদ সম্মেলন
চট্টগ্রামের লাখো-কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ” নির্মাণ

0

লাখো লাখো শহীদদের স্মরণ করতে স্বাধীনতা আন্দোলনের সুতিকাগার বীর প্রসবিনী চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ নিয়ে গঠিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ নির্মাণ বাস্তবায়ন পরিষদ-চট্টগ্রাম এর নেতৃবৃন্দ। আজ শনিবার সকাল সাড়ে ১০ টায় মোমিন রোডের চেরাগী পাহাড়স্থ সুপ্রভাত স্টুডিও হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।
সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সভাপতি গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহমেদ। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সাধারণ সম্পাদক লেখক সাংবাদিক কিরন শর্মা।
সম্মেলনে হাজার বছরে শ্রেষ্ঠ বাঙালি মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে ভাষা আন্দোলন, ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-র ছয় দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর আয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে গণ অভ্যুত্থান, সর্বোপরি বাঙালি জাতির মহান মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লক্ষ শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সম্মেলনে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহমেদ বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম গনহত্যা করেছে পাকিস্থানের বর্বর সামরিক বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর বিহারী রাজাকার, আল বদর, আল সামস, মুজাহিদ বাহিনী। ১৯৭১ সালে এ গণহত্যার নেতৃত্ব দিয়েছিল পাকিস্তানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ।স্থানীয়ভাবে মূল পরিকল্পনাকারী ছিল শান্তি কমিটির নেতৃবৃন্দ। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ অপারেশন চার্চ লাইট নাম দিয়ে শুরু হওয়া গণহত্যা মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত পরিচালিত হয়। সেই পৈশাচিক নারকীয় হত্যাকান্ড থেকে বাদ যায়নি বন্দর নগরী চট্টগ্রাম তথা সমগ্র চট্টগ্রাম জেলা।

মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোর সেই লোমহর্ষক কাহিনীর বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, চট্টগ্রামের পাকিস্তানী সামরিক অফিসার ব্রিগেডিয়ার আসগরীর নেতৃত্বে ২৫ মার্চ ১৯৭১ চট্টগ্রামে গণহত্যা শুরু হয়। তা পর্যায়ক্রমে পুরো শহর, শহরতলী জেলার গ্রামেগঞ্জে পর্যন্ত, চট্টগ্রামের দক্ষিণ পতেঙ্গা, হালিশহর গোডাউন, পাহাড়তলী, শেরশাহ কোলোনী, মেডিকেল কলেজ, দক্ষিণ কাট্টলী নাথ পাড়া, চট্টগ্রাম বন্দর জেডি এলাকাসহ ১১৫টি স্থানে চট্টগ্রাম শহরে প্রায় ২ লক্ষ ৫০ হাজার লোককে হত্যা করে, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন পত্রিকা মারফতে জানা গেছে, শুধু চট্টগ্রাম জেলায় ৪-৫ লক্ষ লোককে হত্যা করা হয়।

সম্মেলনে বলা হয়, চট্টগ্রাম সেনানিবাস বর্বরতার স্বাক্ষী। সেনা নিবাসের বাহিরে প্রথম হত্যাকান্ড সংগঠিত হয় চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায়। বন্দরের ১৭ নং জেটিতে ২৭ মার্চ প্রায় ১১২ জন নিরস্ত্র বাঙালী সৈনিক পাকিস্থানী সেনাবাহিনীর হাতে প্রাণ হারান। যাদেরকে সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসের নামে জেটিতে নেয়া হয়েছিল।

সম্মেলনে ইতিহাসের উক্তি তুলে ধরে সাধারণ সম্পাদক লেখক সাংবাদিক কিরন শর্মা বলেন, ৩১ মার্চ হালিশহর নাথপাড়ায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীও তাদের এ দেশিয় দোসর বিহারীদের সহযোগিতায় ৩৯ জন নিরীহ এলাকাবাসীকে হত্যা করে, একই সময় নির্মমভাবে হত্যা করা হয় নাথ পাড়ায় আশ্রয় নেয়া প্রায় ৪০ জন ইপিআর সদস্যকে।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে অসংখ্য নৃশংসতার স্বাক্ষী পাহাড়তলী, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এখানে প্রায় ১০ হাজার লোক হত্যা করা হয়, একদিনে বৈধ্যভূমিতে ১০ নভেম্বর ১৯৭১ হত্যা করা হয় প্রায় ৪০০ জনকে, চট্টগ্রাম-দোহাজারী লাইনের রেল ঝাউতলা স্ট্রেশনে দাঁড় করিয়ে সকল লোককে ট্রেন থেকে নামিয়ে হত্যা করা হয়। এমনি ভাবে চট্টগ্রামের লক্ষ লক্ষ মানুষকে এই প্রিয় মাতৃভূমির লড়াইয়ে অকাতরে জীবন দিয়ে অবশেষে ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালির বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় মিত্র বাহিনীর হাতে রের্সকোর্স ময়দানে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

সম্মেলনে বলা হয়, আজ দেশ স্বাধীন হয়েছে প্রায় ৪৯ বছর। মুক্তিযুদ্ধের জীবন দানের ফলশ্রæতিতে পেয়েছি, বিজয়ের আনন্দ, মহান স্বাধীনতা, কিন্তু আজ পর্যন্ত এই বিপ্লবের তীর্থস্থান চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্বরণে স্মৃতিসৌধ, চট্টগ্রামবাসী ২১ ফেব্রুয়ারি আসলে ভাষা শহীদদের স্মরণে নির্মিত কেন্দ্রিয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করে, অনুরূপভাবে স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসে চট্টগ্রামবাসী বাধ্য হয়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যায় ভাষা শহীদদের শহীদ মিনারে, চট্টগ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সচেতন মানুষ, বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ বিগত বছরগুলোতে অবিরাম দাবি জানিয়ে আসছে একটি কেন্দ্রীয় ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ’ র জন্য। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মুক্তিয্দ্ধুা বিরোধী অপশক্তি বার বার ক্ষমতায় আসার কারণে মূলত: চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি বলে আমরা মনে করতাম। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দীর্ঘ সময় ধরে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার পরও চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ নির্মাণে দৃশমান কোন উদ্যোগ নেয়নি। সম্মেলনে অনতিবিলম্বে উক্ত বিষয়ের গুরুত্ব অনুধাবণ করে চট্টগ্রামের লাখো-কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ” নির্মাণ করে লাখো লাখো শহীদদের স্মরণ করার সুযোগ করে দেবেন, তাহলে বীর চট্টলার জনগন কিছুটা হলেও শহীদদের প্রতি সম্মান জানানোর সুযোগ পাবে। এতে বীর শহীদদের আত্মা শান্ত পাবে।

সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, বীরমুক্তিযোদ্ধা মৃদুল বড়ূয়া, বীরমুক্তিযোদ্ধা অমল কান্তি নাথ, বীরমুক্তিযোদ্ধা শাহ নুরুল আলম, বীরমুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ শামছুদ্দিন, বীরমুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোহাম্মদ ইদ্রিছ, বীরমুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ সাদেক, বীরমুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, বীরমুক্তিযোদ্ধা দয়াল হরি দে, বীরমুক্তিযোদ্ধা বাদশা মিয়া, বীরমুক্তিযোদ্ধা নিধু ধর, বীরমুক্তিযোদ্ধা দুলাল ঘোষ, বীরমুক্তিযোদ্ধা মিনু রানী দাস, বীরমুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান ইদ্রিছ, বীরমুক্তিযোদ্ধা অমর কান্তি দত্ত, বীরমুক্তিযোদ্ধা রাখাল চন্দ্র ঘোষ, বীরমুক্তিযোদ্ধা ভানু রঞ্জন চক্রবর্তী, বীরমুক্তিযোদ্ধা তপন দত্ত গুপ্ত, সুজিত কুমার দাশ, প্রশান্ত বড়–য়া, মো. নুরুল কবির, সাংবাদিক সমীরন পাল,সজল দাশ, নুরুল হুদা, মো. জাবের উদ্দিন রোজী চৌধুরী, জসিম উদ্দিন চৌধুরী, লায়ন বরুণ আশ্চার্য্য বলাই প্রমূখ।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.