প্রাণঘাতী করোনার ছোবল থেকে মানুষের জীবন বাঁচাতে সারাদেশে ‘লকডাউন’ জারি করে সরকার। এখন জীবিকার কথা বিবেচনা করে লকডাউনের মধ্যেই আজ রবিবার থেকে খুলে দেয়া হচ্ছে দোকান ও শপিংমল। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দোকান ও শপিংমল খোলা রাখা যাবে। দেশে সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এনেই সরকারের এমন সিদ্ধান্তে অনেকটাই হতাশ জনস্বাস্থ্যবিদরা। তারা বলছেন, কোভিড এখন আগের থেকে অনেক বেশি সংক্রামক। ব্রিটেন, ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কোভিড ভ্যারিয়েন্টের মিলিত দাপটে ধরাশায়ী অনেক উন্নত দেশ। ব্রাজিল ছাড়া বাকি দুই দেশের ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে বাংলাদেশেও। যে কারণে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সামলাতে আমাদের হিমসিম খেতে হচ্ছে। এরই মধ্যে নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে ভারতের নতুন ভ্যারিয়েন্ট। এই ভ্যারিয়েন্ট কোনোভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করলে আরো ভয়াবহরূপে তৃতীয় ঢেউ আঘাত হানতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
তবে বিশেষজ্ঞরা এও বলছেন, আমাদের ভুলের কারণেই নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি এখন এতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। করোনার সংক্রমণ যখন থেকে নি¤œমুখী হয়েছিল; তখন থেকেই স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে চলছিল উৎসব, উদযাপন, ঘুরে বেড়ানো। অনুরোধ পরামর্শ কোনোটারই ধার ধারেনি সাধারণ মানুষ। আর সংক্রমণ কমার সুযোগে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যে যে ক্ষেত্রগুলোতে জোর দেয়ার সুযোগ ছিল, তাও করেনি সরকার। এরই ফলস্বরূপ করোনা কয়েকগুণ বেশি শক্তিশালী হয়ে সংক্রমণের ভয়াবহতা বাড়িয়েই চলেছে। কারণ, করোনা ম্যাজিক নয়। আজ নেই মানে এই নয় যে, কোনোদিন থাকবে না। লকডাউনের মধ্যে দোকান শপিংমল খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে কেউ কেউ ভিন্নমত পোষণ করলেও সামনে আমাদের কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হবেÑ এ নিয়ে এক মত বিশেষজ্ঞরা। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাকেই পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের রক্ষাকবচ হিসেবে দেখছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে এখনো ভারতের নতুন এই ভ্যারিয়েন্ট রিপোর্ট হয়নি। কিন্তু যেহেতু ভারত একেবারেই কাছের দেশ, বর্ডারগুলোও সীমিতভাবে চালু রয়েছে, স্থলবন্দর দিয়ে যাতায়াতও রয়েছে, তাই দেশে এই ভ্যারিয়েন্ট আসতে বেশি দেরি লাগবে না। এসে পড়লে পরিস্থিতি ভয়ানক হবে।
এদিকে কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি দেশে করোনার সংক্রমণ কমানোর জন্য পরিপূর্ণভাবে অন্তত দুই সপ্তাহের লকডাউনের সুপারিশ করেছিল। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন ও মিউনিসিপ্যালিটি এলাকায় পূর্ণ লকডাউন দেয়ার সুপারিশ করে কমিটি। দুই সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগে সংক্রমণের হার বিবেচনা করে আবার সিদ্ধান্ত নেয়ার কথাও বলা হয় কমিটির সুপারিশে। বাংলাদেশে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট প্রবেশরোধে ভারত থেকে আসা যাত্রীদের সর্বোচ্চ কোয়ারেন্টাইনের জন্য সুপারিশ করে পরামর্শক কমাটি। কিন্তু পরামর্শক কমিটির পরামর্শ যে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি তা দৃশ্যমান।
কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভোরের কাগজকে বলেন, কিছুদিন আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন মানুষ স্বাস্থ্যবিধি না মানলে তৃতীয় ঢেউও আসবে। কিন্তু লকডাউনে জীবন জীবিকার দোহাই দিয়ে দোকান শপিংমল খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত কী সঠিক হয়েছে? এমনিতেই আমরা যে লকডাউনের নমুনা আমাদের দেশে দেখেছি; তাতে লকডাউনের প্রকৃত অর্থই বদলে গেছে। লকডাইন মানে ঈদের ছুটির মতো বাড়ি যাওয়া, গাড়ি চলাচল করা। এখন লডাউনে শপিং মলও খুলে দিচ্ছে। আমাদের আর বলার কিছু নেই।
ভারতের নতুন ভ্যারিয়েন্ট আমাদের জন্য কতটা ভয়ঙ্কর সে প্রসঙ্গে রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ভারতের এই ভাইরাস আমাদের দেশে ছড়ানোর সমূহ আশঙ্কা আছে। একে তো আমাদের প্রতিবেশী দেশ, তার ওপর স্থলবন্দর দিয়ে প্রচুর মানুষ যাতায়াত করছে।
হেলথ এন্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে করোনা সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিন রেকর্ডসংখ্যক রোগী শনাক্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুর মিছিলও ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। আমাদের দেশে এই ভাইরাস প্রবেশ করলে মহাবিপর্যয়কারী অবস্থা তৈরি হবে। এ কারণে অনতিবিলম্বে ভারতের সঙ্গে আমাদের জল স্থল ও বিমান পথ বন্ধ করা জরুরি। যদি এক্ষেত্রে কালবিলম্ব হয় তাহলে এই ভাইরাস আমাদের দেশে প্রবেশ করে একটি মানবিক বিপর্যয়ের সূচনা করতে পারে। আমরা জানি ইতোমধ্যেই ভারতের কয়েকটি রাজ্যে পরিস্থিতি মানবিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। এ অবস্থা রোধ করার জন্য আমাদের সাবধান হওয়া জরুরি।