Wednesday, August 26

প্রতিদিন শিলপাটা দিয়ে আমাকে মারতো- নারী আইনজীবী

0

‘ও প্রতিদিন আমাকে মারতো। পাটার পুতা (শিলপাটা) দিয়ে আঘাত করতো, যাতে কেউ মারধরের আওয়াজ না পায়। আমার সারা শরীর থেঁতলে গেছে ওই আঘাতে। আঘাতের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আত্মহত্যার। কিন্তু সেই সুযোগও পায়নি। আমি সেখান থেকে জীবিত ফিরে আসতে পারবো সে আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম।’

বিয়ের এক মাসের মধ্যে প্রতারক স্বামীর ১৫ দিনের বন্দিদশা থেকে ফিরে এসে এভাবেই তার ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দিলেন মানিকগঞ্জ জেলা জজ কোর্টের আইনজীবী কামরুন্নাহার সেতু।

তিনি আরো বলেন, ‘প্রতারণার ফাঁদে ফেলে টাকা হাতিয়ে নেয়াই ওর কাজ। ও যে কত নারীর জীবন নষ্ট করেছে, কতো মানুষকে পথে বসিয়েছে- তা ও নিজেই বলতে পারবে না। ও প্রথমে নারীদের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে। নানা প্রলোভনে ফেলে তাদের অন্তরঙ্গ মেলামেশার ভিডিও ধারণ করে। নিয়ে নেয় মোবাইল ফোন, আইডি কার্ড কিংবা অন্য কোন পরিচয়পত্র। তারপর তাকে জিম্মি করে অর্থ হাতিয়ে নেয়। না দিলেই শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন। আর এইসব অপরাধ ঢাকতে সে পুলিশসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে।’

বন্দিদশা থেকে ফিরে সোমবার রাতে মানিকগঞ্জ সদর থানায় প্রতারক স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করেন সেতু। মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, ‘মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার আজিমনগর গ্রামে মো. শাওন মিয়ার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এর পর ৯ সেপ্টেম্বর শাওন তাকে ১০ লাখ টাকা কাবিনে বিয়ে করে। আর বিয়ের কথা কাউকে বলতে নিষেধ করে। মান সম্মানের ভয়ে, বিয়ের বিষয়টি কাউকে কিছু বলিনি।’

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সেতু জানান, গত ১৭ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জজকোর্ট থেকে কথা আছে বলে শাওন তাকে তার প্রাইভেটকারে উঠিয়ে নবীনগর কহিনুর গেটের তুনু হাজীর ৬ তলা বাড়ির ৪ তলার একটি কক্ষে নিয়ে যায়। সেখানে প্রথম দুদিন তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে। তিনি বলেন, ৩য় দিন তার মানিকগঞ্জ ডাকঘরে থাকা কয়েকটি হিসাব থেকে তাকে টাকা উঠিয়ে দিতে বলে।

তার কাছে অস্ত্র আছে, ভয়ে তিনি তাকে ৫ লাখ, ১০ লাখ এবং ১ লাখ করে ৩ বার টাকা উঠিয়ে দিতে বাধ্য হন। এর দুদিন পর শাওন তার কাছে আরও টাকা চায়। তার কাছে আর সঞ্চিত টাকা নেই জানালে সে তাকে তার নামে থাকা জমি লিখে দিতে বলে। তিনি তাকে জমি লিখে না দেয়ায় তার ওপর শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন। তার কাছ থেকে নিয়ে নেয় মোবাইল ফোন, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স।

তার পর তাকে বিবস্ত্র করে নগ্ন ভিডিও ধারণ করে এবং তার শেখানো কথা বলিয়ে তারও ভিডিও রেকর্ড করে। সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয়। জবাই করতে রান্নাঘর থেকে বঁটি আনতে গেলে সে চিৎকার শুরু করে। তার চিৎকারে প্রতিবেশীরা চলে আসে। বাড়ির মালিক এসে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে।

পরে পরিবারের লোক ছাড়া তাকে দেয়া হবে না জানালে, সে বাড়ির মালিকসহ প্রতিবেশীকে অনুরোধ করে বলে সে নিজেই সেতুকে তার বাবার বাড়িতে দিয়ে আসবে। তার কথায় বিশ্বাস করে তার কাছে সেতুকে তুলে দেয় তারা। কিন্তু সে সেতুকে নিয়ে তার বাবার বাড়িতে না গিয়ে ঢাকায় নিয়ে আসে। ঢাকায় আসার সময় প্রাইভেট কারে বসে বিভিন্ন যায়গায় ফোন করে তাদের ঢাকার ধানমন্ডি ল্যাবএইড হাসপাতালে এসে থাকতে বলে। সেতুকে ওই হাসপাতালে নিয়ে একজন চিকিৎসককে একটি কেবিন দিতে বলে। কেবিনে নিয়ে ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করে। এটা বুঝতে পেরে সেতু সেখানে থেকে চলে আসতে চাইলে তাকে সেখানে মারধর শুরু করে।

এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে খবর দিলে দলবলসহ শাওন সেখান থেকে পালিয়ে যায়। পরে ভীতসন্ত্রস্ত ওই নারী আইনজীবী তার এক পরিচিত আইনজীবীকে ফোন দিয়ে এই ঘটনা বলে। পরে তিনি এসে সেতুকে নিয়ে যান।

সেতুর পিতা মো. সফিউদ্দিন বলেন, তার মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর ওই যুবক তার কাছে ফোন করে তার মেয়েকে দিয়ে ৫ লাখ টাকা চায়। না দিলে তাকে হত্যা করার হুমকি দেয়। তিনি ৩ নভেম্বর মানিকগঞ্জ থানায় ওই যুবকের বিরুদ্ধে একটি অপহরণ মামলা করেন।

মানিকগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি তদন্ত) মো. হানিফ সরকার বলেন, ওই নারী আইনজীবীকে তার বাবার করা অপহরণ মামলায় উদ্ধার দেখিয়ে তার মৌখিক বক্তব্য রেকর্ডের জন্য তাকে মানিকগঞ্জ চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। তিনি ইচ্ছে করলে আলাদা মামলাও করতে পারবেন বলে জানান তিনি।

এ ঘটনায় অভিযুক্ত শাওন মিয়ার দুটি মোবাইল ফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তার ফোন বন্ধ বিধায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.