সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল থাকবে।সরকারি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাসহ অন্য কোটা বাতিল করে জারি করা পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বুধবার এ রায় দেন। দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের তুমুল আন্দোলনের মুখে ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর সরকারি চাকরিতে নারী কোটা ১০ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ এবং জেলা কোটা ১০ শতাংশ বাতিল করে পরিপত্র জারি করে সরকার। সেখানে বলা হয়েছিল, নবম থেকে ১৩তম গ্রেডের পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে হবে। ওই সব গ্রেডের পদে সরাসরি নিয়োগে বিদ্যমান কোটা বাতিল করা হলো। এ পরিপত্র চ্যালেঞ্জ করে রিট করেন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও প্রজন্ম কমান্ড কাউন্সিলের সভাপতি অহিদুল ইসলামসহ সাত শিক্ষার্থী।এদিকে, হাইকোর্টের রায় প্রত্যাখ্যান করে গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মানববন্ধন করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কর্মসূচি থেকে আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজু ভাস্কর্যের সামনে বিক্ষোভের ডাক এবং সারাদেশে শিক্ষার্থীদের রাজপথে নামার আহ্বানও জানিয়েছেন।আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, পুরো কোটা প্রথা বাতিল না করে শুধু নবম থেকে ১৩তম গ্রেডের কোটা বাতিল করা হয়েছিল। এটা আজ অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। এখন থেকে এসব গ্রেডে কোটার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের নিয়োগে আর বাধা নেই। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটা রহিত করা অপমানজনক। কোটা পদ্ধতি বাতিল করার কারণে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা কোটাব্যবস্থার মাধ্যমে শুধু নিম্ন পদে চাকরির সুযোগ পেতেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ সাইফুজ্জামান জামান। তিনি জানান, এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে। সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ সব কোটা পুনর্বহালের দাবিতে ২০১৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলসহ বিভিন্ন সংগঠনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলও রাজপথে সোচ্চার হয়ে ওঠে। তখন থেকেই তারা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে।
২০১৮ সালে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে কোটা বাতিল করা হলেও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে তা বহাল রাখে সরকার। কোটা বাতিলে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের এক দিন পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ পরিপত্র জারি করে। এ অবস্থায় ২০২১ সালের ৬ ডিসেম্বর রুল জারি করেন হাইকোর্ট।
সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা দীর্ঘদিনের। ১৯৭২ সালের ৫ নভেম্বর এক নির্বাহী আদেশে সরকারি, আধা সরকারি, প্রতিরক্ষা এবং জাতীয়করণ করা প্রতিষ্ঠানে জেলা ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা এবং ক্ষতিগ্রস্ত নারীর জন্য ১০ শতাংশ কোটা পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়। পরে বিভিন্ন সময় এ কোটা পদ্ধতির সংস্কার, পরিমার্জন ও পরিবর্তন করে সরকার। সর্বশেষ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতনি ৩০ শতাংশ, প্রতিবন্ধী ১ শতাংশ, নারী১০ শতাংশ, পশ্চাৎপদ জেলাগুলোর জন্য ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৫ শতাংশ মিলিয়ে ৫৬ শতাংশ কোটা চালু ছিল।
কোটা পুনর্বহাল নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক জানিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহালের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড। গতকাল বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনন্দ মিছিল করে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। মিছিলের আগে সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কানিজ ফাতেমার সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আল মামুনের সঞ্চালনায় আয়োজিত সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দপ্তর সম্পাদক শরীয়তুল্লাহ, ঢাবি শিক্ষার্থী খোকন মিয়া, ঢাকা কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক আল ইমাম, কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ফিরোজ আহমেদ সুজন, ঢাকা জেলা শাখার সভাপতি ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া প্রমুখ।
সমাবেশে বক্তারা হাইকোর্টের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করে নতুন পরিপত্র জারি করতে হবে।
অন্যদিকে, হাইকোর্টের দেওয়া রায় প্রত্যাখ্যান করে গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মানববন্ধন করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কর্মসূচি থেকে আজ বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় রাজু ভাস্কর্যের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেন তারা। এ ছাড়া সারাদেশে শিক্ষার্থীদের রাজপথে নামার আহ্বানও জানিয়েছেন। মানববন্ধনে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন ঢাবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম ও হাসিব আল ইসলাম, ভূতত্ত্ব বিভাগের আবু বকর জাকারিয়া, ফার্সি বিভাগের রানা প্রমুখ।