Wednesday, November 4

বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার

0

মো: মুজিব উল্ল্যাহ চৌধুরী, চট্টগ্রাম:
বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার : চট্টগ্রাম শহরের ২ নং ওয়ার্ডে জালালাবাদ এলাকার নাসিরাবাদের একটি পাহাড়ের উপরে অবস্থিত। ইরানের বিখ্যাত পার্সিয়ান সুফি বায়েজিদ বোস্তামীর নামে গড়ে উঠা এই মাজার চট্টগ্রামের ধর্মপ্রাণ মানুষের পাশাপাশি চট্টগ্রামে আসা দেশী বিদেশী পর্যটকদের জন্যও একটি অত্যন্ত আকর্ষনীয় স্থান।

এই সমাধির অবয়ব সর্বপ্রথম ১৮৩১ সালে পাহাড়ের উপরিভাগে একটি দেয়ালঘেরা আঙ্গিনার মাঝে আবিস্কার করা হয়। আঙ্গিনার ঠিক মাঝামাঝি ৩.৬৬ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ২.৭৫ মিটার প্রস্থের একটি শবাধার অবস্থিত এবং এর শীর্ষে আছে কিছু ঝিনুক এবং প্রবালের আস্তরন। দেয়ালের প্রতিটি পাশের দৈর্ঘ্য ৯ মিটার এবং ব্যাটেলমেন্ট সহ উচ্চতা ৪.৫ মিটার, এর উপরে প্রতি কোনায় ০.৬১ মিটার উঁচু একটি স্তম্ভ আছে। এর পরবর্তীতে সমাধিস্থলটি আধুনিক কাঠামো দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। সমাধি পাহাড়ের পাদদেশে একটি তিন গম্বুজ বিশিষ্ঠ মোঘলরীতির আয়তাকার মসজিদ এবং একটি বিশালাকার দীঘি আছে। মাঝের গম্বুজটি পাশের দুইটি গম্বুজের থেকে বড়। মসজিদের চার কোনায় চারটি সংযুক্ত অষ্টভুজ আকৃতির বুরুজ আছে। এগুলোর শীর্ষভাগ ছত্রী দ্বারা ঢাকা এবং উত্থিত বন্ধনী নকশা দ্বারা অলংকৃত। বুরুজগুলির ভিত ফুলদানি আকৃতির। পূর্ব দিকের তিনটি দরজার মধ্যে মাঝেরটি তুলনামুলকভাবে বড় এবং দুইটি পল কাটা ছোট বুরুজ সহ এটি সম্মুখভাগে প্রসারিত। অনুরূপভাবে কিবলা দেওয়ালের মিহরাবটির পিছনের দিকে অভিক্ষেপ আছে। ক্রমশ সরু কোণবিশিষ্ট স্তম্ভের উপর স্থাপিত উঁচু খাঁজ খিলানের নিচ দিয়ে প্রবেশ পথগুলি উন্মুক্ত। ইমারতটির প্রবেশপথ দুসারি শরছিদ্র দ্বারা সজ্জিত। এর ফাসাদ কুলুঙ্গি, খোপ ও ফ্রেম দ্বারা সজ্জিত। স্থাপত্যশৈলী থেকে ধারণা করা হয় মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব এর আমলে মসজিদটি নির্মিত।

ইতিহাস ও জনশ্রুতি:
যদিও বায়েজিদ বোস্তামীর নাম অনুসারে এই মাজার, ইরানের বিখ্যাত সুফী বায়েজিদ বোস্তামীর এই অঞ্চলে আগমনের কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়না। ধারণা করা হয় সুফী সাধক ও আউলিয়াগণ চট্টগ্রামে ইসলাম ধর্ম প্রচারের সময় সচরাচর পাহাড় এর উপরে কিংবা জঙ্গল ঘেরা অঞ্চলে আবাস স্থাপন করেন এবং এসব জায়গাতে মাজার কিংবা এই ধরণের বিভিন্ন স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করেন। বায়েজিদ বোস্তামীর মাজারটাও মূলত উনাকে উৎসর্গ করে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিরূপ মাত্র।

যদিও এলাকার জনশ্রূতি অনুযায়ী বায়েজিদ বোস্তামীর চট্টগ্রামে আগমনের ইতিহাস শুনতে পাওয়া যায়। চট্টগ্রামে অবস্থানের পরে প্রস্থানকালে ভক্তকূল তাকে থেকে যাবার অনুরোধ করলে উনি তাদের ভালোবাসা ও ভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে কনিষ্ঠ আঙ্গুল কেঁটে কয়েক ফোঁটা রক্ত মাটিতে পড়ে যেতে দেন এবং ঐ স্থানে উনার নামে মাজার গড়ে তুলবার কথা বলে যান। এই জনশ্রুতির স্বপক্ষে অষ্টাদশ শতাব্দীর চট্টগ্রামের কিছু কবির কবিতার উল্লেখ করা হয় যেখানে শাহ সুলতান নামক একজন মনীষীর নাম বর্ণিত আছে। বায়েজীদ বোস্তামীকে যেহেতু সুলতান উল আরেফীন হিসাবে আখ্যায়িত করা হয় যেই সূত্রে এই শাহ সুলতান আর সুলতান উল আরেফীন কে একই ব্যক্তি হিসেবে ধরে নেওয়া হয়।

বোস্তামীর দীঘি ও কাছিম:
বায়েজিদ বোস্তামীর মাজারের পাদদেশে একটি সুবিশাল দীঘি অবস্থিত। এর বাসিন্দা হিসাবে বোস্তামীর কাছিম ও গজার মাছ সুবিখ্যাত। আঞ্চলিকভাবে এদের মাজারী ও গজারী বলে আখ্যায়িত করা হয়। বোস্তামীর কাছিম আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি অত্যন্ত বিরল এবং চরমভাবে বিপন্নপ্রায় প্রজাতি। বর্তমানে বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার প্রাঙ্গন ব্যতীত বিশ্বের আর কোথাও এদের দেখা মিলে না। মাজারের দেখাশোনার দ্বায়িত্বে থাকা মাজার তত্বাবধায়ক কমিটির লোকদের দ্বারাই এদের প্রতিপালন করা হয়। বর্তমানে মাজার প্রাঙ্গন সংলগ্ন এই দীঘিতে দেড়শো থেকে সাড়ে তিনশো কচ্ছপের আবাস রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। প্রজনন মৌসুমে মাজারের মূল পাহাড়ের পেছনে এদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে এদের ডিম পাড়ার ব্যবস্থা করা হয়।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.