বেনাপোল সংবাদদাতা : ভৌগলিক সীমারেখা ভুলে একই ভাষা ও সংস্কৃতিরটানে দুই বাংলার মানুষ সমবেত হলেন বেনাপোলে। তারা একই মঞ্চে গাইলেন বাংলার জয় গান। হাতে হাত রেখে ঊর্ধ্বে তুলে ধরলেন বাংলাকে। মহানশহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন উপলক্ষে বেনাপোল চেকপোস্টের নো-ম্যানসল্যান্ডে বুধবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সম্মিলিত হলেন দুই বাংলার মানুষ।
বেনাপোল চেকপোস্ট নো-ম্যানসল্যান্ডে স্থাপিত অস্থায়ী শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়ে প্রতি বছরের মতো এবারও ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি ভারত ও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যৌথভাবে সম্মান জানানো হয়। এর পর মিষ্টি বিতরণ, আলোচনা সভা আরগানে গানে মাতোয়ারা হন সীমান্তের দুই পারের বাসিন্দারা। উভয় দেশের জন প্রতিনিধিরা বলেন সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির কথা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে জড়ো হয়ে ছিলেন হাজার হাজার ভাষা প্রেমী। উভয় দেশের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন গুলো স্বতস্ফূর্ত ভাবে অংশ নেন এ অনুষ্ঠানে। নানা রং এর ফেস্টুন, ব্যানার, প্লাাকার্ড, আর ফুল দিয়ে বর্ণিল সাজে সাজানো হয় নো-ম্যানসল্যান্ড এলাকা। এ মিলন মেলায় উভয় দেশের সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি হয়। আর এই আয়োজনের নেতাদের কণ্ঠে ছিল ভবিষ্যতে আরও বড় করে একই মঞ্চে একুশ উদযাপনের প্রত্যাশা।
২০০২ সাল থেকে প্রতি বছরই দুই বাংলার সীমান্তবর্তী এ অংশের বাসিন্দারা এক সঙ্গে মিলিত হয়ে দিবসটি পালন করেন। তখন দুই দেশের সীমান্তবর্তী ওই স্থানে আবেগাপুস্নত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। একে অপরকে আলিঙ্গন করে সব ভেদা ভেদ যেন ভুলে যান কিছু সময়ের জন্য। ফুলের মালা ও জাতীয় পতাকা বিনিময় করেন অনেকে। ক্ষণিকের জন্য হলেও স্তব্ধ হয়ে যায় আন্তর্জাতিক সীমা রেখা।
বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ মন্ত্রি জ্যোতি প্রিয় মল্লিক, বনগাঁ লোক সভার সাংসদ মমতা ঠাকুর, উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার সভাধিপতি রেহেনা খাতুন, বনগাঁ উত্তর বিধান সভার বিধায়ক বিশ্বজিৎ দাস, বনগাঁ দক্ষিণের বিধান সভার বিধায়ক সুরজিৎ দাসের নেতৃত্বে ভারত থেকে শতাধিক বাংলা ভাষী মানুষ নো-ম্যানসল্যান্ডের অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
সেখানে বাংলাদেশের পক্ষে ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য পিযুষ কান্তি ভট্টাচার্য, যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন, সাধারণ সম্পাদক শাহিন চাকলাদার, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মজিদ, যশোর ৪৯ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্নেল আরিফুল হক, শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পুলক কুমার মন্ডল, বেনাপোল কাস্টমস হাউসের ডেপুটি কমিশনার মোহাম্মদ মারুফুর রহমান, বেনাপোল পোর্ট থানার ওসি অপূর্ব হাসান। এ সময় দুই দেশের মানুষ ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে ও মিস্টি দিয়ে বরণ করে নেন একে অপরকে। নোমান্সল্যান্ডে অস্থায়ী শহীদ বেদীতে প্রথমে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ মন্ত্রী জ্যোতি প্রিয় মল্লিক সহ ভারত থেকে আসা প্রতিনিধিরা।
পরে বাংলাদেশের পক্ষে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান বাংলাদেশ পিযুষ কান্তি ভট্টাচার্য সহ অন্যরা। ২১ শে’রমঞ্চে যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন বেনাপোল পৌর মেয়র আশরাফুল আলমলিটন ও বনগাঁ পৌরসভার মেয়র শংকর আয্য।ভাষা দিবসের মিলন মেলায় বিজিবি বিএসএফ কে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। এর পর দুই দেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে হাজার হাজার ভাষা প্রেমী মানুষ দিবসটি উদযাপন করেন।
একুশ উদযাপন কমিটির সভাপতি বেনাপোল পৌর মেয়র আশরাফুল আলমলিটন বলেন, ‘৫২ এর ভাষা সংগ্রামের পথ ধরেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে। আর এই স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের জনগণ ও সরকার আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে জন্য আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। বৃটিশরাও আমাদের বাংলা ভাষাকে বিভক্ত করতে পারেনি। ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু হয়েছে আমাদের এই ভাষা আন্দোলন। দেশের সন্তানরা জীবন দিয়ে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাদের জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। ভাষার প্রতি ভালোবাসা ও ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ আমাদের দুই দেশের সৌহার্দ্যপূর্ণ সর্ম্পকের ভীতকে আরও শক্ত করবে।’
বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বিনিময় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ মন্ত্রী জ্যোতি প্রিয় মল্লিক বলেন, ‘আপনারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন। স্বাধীনতার জন্য অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। ভাষাআর স্বাধীনতার জন্য এত ত্যাগের নজির পৃথিবীতে অন্য কোনও দেশে নেই। এ জন্য আপনারা গর্বিত জাতি। ভাষার টানে আমরা বাংলাদেশে ছুটে এসেছি একুশ উদযাপন করতে। দুই বাংলার মানুষ এক সঙ্গে মাতৃ ভাষা দিবস পালন করছে দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। ভবিষ্যতে দুই বাংলার ভাষা প্রেমীদের সঙ্গে নিয়ে আরও বড় করে একুশ উদযাপন করবো এটাই আমার প্রত্যাশা।’
মঞ্চে একুশের কবিতা আবৃতি, ছড়া, গীতিনাট্য, আলোচনা আর সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ভাষা শহীদদের স্মরণে দুই বাংলার মানুষের সম্প্রীতি আর ভালো বাসার বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার প্রত্যয় নিয়ে বিকালে শেষ হবে ভাষা প্রেমীদের মিলন মেলা। দুই বাংলার এই অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে নেওয়া হয় নজির বিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কড়া কড়ি আরো পকরা হয় সীমান্তে। বেনাপোল পেট্রাপোল চেকপোস্টে যাতে কেউ প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য বিজিবি-বিএসএফ দুই সীমান্তে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করে। সীমান্ত টপকে যাতে কেউ অবৈধভাবে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য বিজিবি ও বিএসএফ বাঁশের বেড়া দিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলে।