Tuesday, October 27

রোহিঙ্গাবোঝা লাঘবে পাশে থাকবে তুরস্ক

0

মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা লাঘবে বাংলাদেশকে সহযোগিতাদানের অঙ্গীকার করেছেন সফররত তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে তিনি বলেন, ‘আমাদের বাংলাদেশি ভাই ও বোনদের সহযোগিতা ও সহমর্মিতার কথা আমরা সব সময় স্মরণ করব।

আশ্রিত প্রায় ১০ লাখ শরণার্থীর বোঝা লাঘবে তুরস্ক বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে। ’ তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকট সমাধান না হওয়া পর্যন্ত জাতিসংঘসহ বিশ্বসম্প্রদায়ের প্রতি বাংলাদেশের পাশে থাকার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও পারস্পরিক স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে বাংলাদেশ ও তুরস্ক একমত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আশা করি, আমাদের উন্নয়ন যাত্রায় বাংলাদেশের পাশে থাকবে তুরস্ক। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ-তুরস্ক নিবিড়ভাবে কাজ করে যাবে। ’

ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গতকাল বিকেলে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে এই শীর্ষ বৈঠকের পর পণ্যের মান বজায় রাখা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে সহযোগিতা জোরদারে দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান জোরালো অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো জোরদারের আগ্রহ প্রকাশ করেন। কয়েক বছর ধরে প্রায় ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা বাংলাদেশকে অগ্রসরমান দেশ হিসেবে উল্লেখ করেন তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক কিভাবে আরো এগিয়ে নেওয়া যায় সে বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি।

’
রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কূটনীতি ও বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশের সহযোগিতার জোরালো প্রশংসা করেন তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ সংকটকে বাংলাদেশের ইস্যু হিসেবে না দেখে মানবিক সংকট হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানান। তিনি আশা করেন, রোহিঙ্গারা শিগগিরই তাদের নিজ বসতভূমিতে ফিরে যেতে সক্ষম হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো বলেন, দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, পর্যটন ও কানেক্টিভিটির মতো খাতগুলোতে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের জন্য এবং বিশেষ করে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে যাওয়ার পরিকল্পনা করার জন্য তাঁকে শেখ হাসিনা ধন্যবাদ জানান। তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী গতকাল সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। পরে তিনি সোনারগাঁও হোটেলে ফিরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আয়োজিত নৈশ ভোজসভায় অংশ নেন।

স্মৃতিসৌধ ও বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে : মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগকারী বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি তুরস্কের স্বাধীনতাযুদ্ধে বাঙালিদের সমর্থনের কথা স্মরণ করেছেন সফররত তুর্কি প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম। গতকাল সকালে ঢাকার সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি। তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলুর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ইলদিরিম জাতীয় স্মৃতিসৌধে উপস্থিত হওয়াকে বিশাল সুযোগ ও সম্মানের বলে অভিহিত করেছেন। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর পরিদর্শক বইয়ে তিনি লিখেন, ‘তুরস্কের জনগণ ও আমার নিজের পক্ষে আমি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে আত্মত্যাগকারী বীর বাঙালিদের কথা স্মরণ করার সুযোগ পেয়েছি। ’ তিনি আরো লিখেছেন, ‘তুরস্কের জনগণ আমাদের (তুরস্কের) স্বাধীনতাযুদ্ধে আমাদের বাঙালি ভাইয়ের সমর্থনের কথা কখনো ভুলবে না। ’

এ ছাড়া ইলদিরিম গতকাল ঢাকায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তুর্কি সহযোগিতা ও সমন্বয় সংস্থা টিকার সহযোগিতায় নির্মিত ক্যান্সার ইউনিট উদ্বোধন করেন। এরপর তিনি ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে যান এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান।

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাত্ : তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাসহ প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার ব্যাপারে বাংলাদেশকে আশ্বাস দিয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে এ আশ্বাস দেন তিনি।

বাসস জানায়, তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ সংকট অবসানে তাঁর সরকার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু করেছে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তরিক সমর্থন ও সহায়তা প্রদানের জন্য তুরস্ককে কৃতজ্ঞতা জানান।

আজ রোহিঙ্গা শিবিরে : আজ সকালে কক্সবাজার যাবেন তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী। রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন ও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে সেখান থেকেই তুরস্কে ফিরবেন তিনি। গত সোমবার রাতে তিনি বাংলাদেশে আসেন।

গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ শুরুর সময় থেকেই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছে তুরস্ক। দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চিকে ফোন করে পরিস্থিতি সামলাতে বলেছেন এবং জাতিসংঘে বিষয়টি তুলেছেন। গত সেপ্টেম্বর মাসে তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখেছেন। গত কয়েক মাসে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কক্সবাজার সফরকারী বিদেশি অতিথিদের মধ্যে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীই সর্বোচ্চ নেতা।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, বিগত বছরগুলোতে যুদ্ধাপরাধের বিচার ইস্যুতে তুরস্কের হস্তক্ষেপের কারণে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা দিয়েছিল। তবে গত বছর তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার সময় বাংলাদেশ ওই দেশটির গণতান্ত্রিক সরকারকে সমর্থন এবং অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার নিন্দা জানায়। এরপর আবার দুই দেশের সম্পর্কে স্বাভাবিকতা ফেরে।

জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল গত মাসে তুরস্ক সফর করে। ওই সফরে দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী রিসেপ আকদাগের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের জন্য সম্ভাব্য তুর্কি ত্রাণ সহায়তার বিষয়ে আলোচনা হয়। তুরস্ক এর আগে এক লাখ রোহিঙ্গার জন্য ২০ হাজার ‘প্রিফেব্রিকেটেড ঘর’ নির্মাণের অঙ্গীকার করেছিল। তবে ত্রাণমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলের সফরের সময় তুরস্ক আরো ২৫ হাজার ‘প্রিফেব্রিকেটেড ঘর’ নির্মাণে রাজি হয়। এতে প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার রোহিঙ্গা থাকতে পারবে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, রোহিঙ্গা সংকটকে পুঁজি করে তুরস্ক অতীতের ভুল শুধরে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা চালাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের জন্য তুরস্ক আরো সহযোগিতা করতে চায়। তবে বাংলাদেশ প্রয়োজনের নিরিখেই সহযোগিতা নেওয়ার বিষয়টি ঠিক করতে চায়।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.