দুর্যোগ-আক্রান্তদের সাহায্য করাও ইবাদত

0

সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় রিমালের তাণ্ডবে সারা দেশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বহু অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। দেশের বহু অঞ্চলে বিদ্যুতের খুঁটি ইত্যাদি ভেঙে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। প্রাণহানির ঘটনাসহ মানুষের বাড়িঘর ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কারো আবার জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম দোকানপাট কিংবা গবাদি পশু ভেসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে চরম অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক, ক্ষুধা ও ধন-সম্পদ হারানোর গ্লানি।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে মুমিনের প্রথম করণীয় হলো ধৈর্য ধরা। কারণ মহান আল্লাহ আগেই তাঁর বান্দাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি মাঝে মাঝে বান্দাকে এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করবেন, যারা তাতে ধৈর্য ধরতে পারবে, তিনি তাদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা রেখেছেন।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি (আল্লাহ) তোমাদের ভয়, ক্ষুধা এবং ধনসম্পদ ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে পরীক্ষা করব। (হে রাসুল,) আপনি ধৈর্যশীলদের শুভ সংবাদ প্রদান করুন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫৫)
পাশাপাশি সামর্থ্যবান মুমিনদের উচিত এ সময় নিরীহ মানুষের পাশে দাঁড়ানো। তাদের প্রয়োজনীয় খাবার ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা।

কঠিন এই পরিস্থিতি থেকে তাদের উদ্ধার করার চেষ্টা করা। এটা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ। অনেক ক্ষেত্রে আবার পরীক্ষাও। কারণ যারা আল্লাহর মাখলুকের ওপর দয়াশীল হবে, মহান আল্লাহ তাদের ওপর দয়া করবেন।

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) সূত্রে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, দয়াশীলদের ওপর করুণাময় আল্লাহ দয়া করেন।

তোমরা দুনিয়াবাসীকে দয়া করো, তাহলে যিনি আসমানে আছেন, তিনি তোমাদের দয়া করবেন।
(আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৪১)

আর আল্লাহ যখন কাউকে ভালোবাসবেন, তখন মাখলুকও আল্লাহর ইশারায় তাকে ভালোবাসতে বাধ্য হবে। এর একটি উদাহরণ হলেন আবু বকর (রা.)। তিনি অত্যন্ত পরোপকারী মানুষ ছিলেন। দুর্যোগে তিনি মানুষদের সহযোগিতা করতেন। হিজরতের আগে তিনি একবার আবিসিনিয়ায় হিজরত করার চেষ্টা করলে মক্কার কা’রা গোত্রের নেতা ইবনু দাগিনার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। ইবনে দাগিনা তাঁকে বলেন, আপনার মতো লোক বেরিয়ে যেতে পারে না এবং আপনার মতো লোককে বহিষ্কার করাও চলে না। কেননা আপনি নিঃস্বকে সাহায্য করেন, আত্মীয়তার বন্ধনকে রক্ষা করেন, অক্ষমের বোঝা নিজে বহন করেন, মেহমানদারি করেন এবং দুর্যোগের সময় মানুষকে সাহায্য করেন। আমি আপনার আশ্রয়দাতা। কাজেই আপনি মক্কায় ফিরে চলুন এবং নিজ শহরে গিয়ে আপন প্রতিপালকের ইবাদত করুন।…

(বুখারি, হাদিস : ২২৯৭)

এখানে ইবনু দাগিনা আবু বকর (রা.)-কে নিরাপত্তা দিতে আগ্রহী হয়েছেন এ জন্যই যে তিনি অন্যদের প্রতি দয়ালু ছিলেন। মানুষের উপকার করার চেষ্টা করতেন।

তা ছাড়া মহান আল্লাহ সমগ্র মুমিন জাতিকে এক দেহের মতো বানিয়েছেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনদের উদাহরণ তাদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়ার্দ্রতা ও সহানুভূতির দিক থেকে একটি মানবদেহের মতো, যখন তার একটি অঙ্গ আক্রান্ত হয় তখন তার পুরো দেহ ডেকে আনে তাপ ও অনিদ্রা।(মুসলিম, হাদিস : ৬৪৮০)

উপকূলীয় অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষরাও আমাদের লোক। তাদের এই বিপদের দিনে তাদের জন্য সাধ্যমতো কিছু করার চেষ্টা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। আমরা যদি মুমিন হই, তাহলে আমাদের বন্যাকবলিত ভাই-বোনদের বিপদের মধ্যে রেখে আমরা স্বস্তিতে থাকতে পারি না। আমাদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব দুর্যোগে আক্রান্তদের সাহায্যে এগিয়ে আসা। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করা। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী, খাদ্য, বস্ত্র, ওষুধ, খাবার স্যালাইন ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা। এখনই তো সময় আখিরাতের জন্য বিনিয়োগ করার। মানুষের বিপদে এগিয়ে এসে তার জন্য খরচ করাকে মহান আল্লাহ বিনিয়োগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যা তিনি বহুগুণ ফেরত দেওয়ার ওয়াদা করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর সালাত কায়েম করো, জাকাত দাও এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও। আর তোমরা নিজেদের জন্য মঙ্গলজনক যা কিছু আগে (পরকালের জন্য) পাঠাবে, তোমরা তা আল্লাহর কাছে পাবে প্রতিদান হিসেবে উত্কৃষ্টতর ও মহোত্তমরূপে। আর তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৪৫)

আসুন, আমরা প্রত্যেকেই যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী বন্যাদুর্গতের পাশে দাঁড়াই। জাতিকে এই মহাবিপদ থেকে রক্ষা করতে নিজেদের গুনাহর জন্য বেশি বেশি তাওবা করি।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.