Sunday, August 9

প্রতিকুলতায় গতি পাচ্ছেনা দেশের সম্ভাবনাময় জাহাজ বিভাজন শিল্প ও গ্রিন শিপ ইয়ার্ড

0

কাজী হুমায়ুন কবির, চট্টগ্রামঃ শিল্প হিসেবে শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। প্রায় ৭ লাখেরও বেশী শ্রমিক এখানে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের পরিবার চালাচ্ছে। দেশের স্টিল ও রি-রোলিং কারখানাগুলোর অধিকাংশ কাঁচামাল এ শিল্পখাত থেকে আসছে। কয়েক দশক ধরেই জাহাজভাঙা শিল্পে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যেই অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এ খাতের সবচেয়ে ভালো দিক হলো বাংলাদেশ এখন গ্রিন শিপ ইয়ার্ডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এতে শীপের বর্জ্য, জং, তৈল পানিতে মিশে হুমকি হবেনা। পুরানো শীপ বেশীদিন থাকলে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়, সমুদ্রের জায়গা দখল হয় এবং জাহাজ চলাচলে বিঘœ ঘটে তা আর হবেনা।
বিএসবিআরএ ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রায় ১৫৪টি শিপ ইয়ার্ড নিবন্ধিত আছে। তবে তথ্যসুত্রমতে ৩০টির মতো শিপইয়ার্ড তাদের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দ্য শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং রুলস ২০১১, আন্তর্জাতিক আইন এবং ২০০৯ সালের চীনে অনুষ্ঠিত হংকং কনভেশন রুলস অনুযায়ী আমূল ঢেলে সাজানো হচ্ছে এ শিপইয়ার্ডগুলো। আগামী ২০২৩সালের মধ্যে বাংলাদেশের সব শিপব্রেকিং ইয়ার্ড হংকং কনভেনশন সার্টিফিকেশন রুলস অনুযায়ী গ্রিন শিপইয়ার্ডে রূপান্তরিত করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ২০২১ সালের ১৪ নভেম্বর শিল্প মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী এ খাতের ৮৫টি প্রতিষ্ঠান গ্রিন ইয়ার্ড বাস্তবায়নে শিপ রিসাইক্লিং ফ্যাসিলিটি প্ল্যান (এসআরএফপি) শিল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো শিল্প মন্ত্রণালয়ের গ্রিন ইয়ার্ড প্রকল্পের কাজ শুরুর অনুমোদন পেয়েছে। ইতিমধ্যে পি এইচ পি গ্রিন শিপ ইয়ার্ড সার্টিফিকেট পেয়ে তাদের পরিবেশ বান্ধব জাহাজ বিভাজনের কার্যক্রম শুরু করেছে। বাকী ৮৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এসএন করপোরেশন, কবির স্টিল, কে আর শিপ রিসাইক্লিং, জান্নাত স্টিল লিমিটেড, ম্যাক করপোরেশন, জিরি সুবেদার শিপ ইয়ার্ড, আরেফিন এন্টারপ্রাইজ, প্রিমিয়াম ট্রেড করপোরেশনসহ প্রায় ১০টি প্রতিষ্ঠান হংকং কনভেনশন অনুযায়ী শিপইয়ার্ড আধুনিকায়নে কাজ শুরু করেছে। তন্মধ্যে এস এন করপোরেশন, কবির স্টিল ও কে আর শিপ রিসাইক্লিং তাদের গ্রিন ইয়ার্ডের উন্নয়ন কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
তবে দেশের শিপইয়ার্ড আধুনিকায়নে আর্থিক ব্যয় নিয়ে বড় সংকটে আছেন দেশের ইয়ার্ড মালিকরা। সরকারি প্রণোদনা, ব্যাংকের সহযোগীতা ছাড়া সবার পক্ষে গ্রিন ইয়ার্ড বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে মনে করছেন তারা। গ্রিন শিপইয়ার্ড বাস্তবায়নে শিপ রিসাইক্লিং ফ্যাসিলিটি প্ল্যান (এসআরএফপি) শিল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হয়। বিভিন্ন দপ্তরে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলে কাজ শুরু করতে পারে ইয়ার্ডগুলো। সেক্ষেত্রে বিদেশী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যারা গ্রিন শিপইয়ার্ড নির্মাণের দেখভাল করে যেমন ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আইআরএফ, জাপানি প্রতিষ্ঠান এনকেএ, ইতালীয় প্রতিষ্ঠান রিনার, জার্মানির জিএসআর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ করতে হয়। পরিবেশের ক্ষতি কমাতে, দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু ক্রমশ হ্রাস, শোভন কর্মপরিবেশ সৃষ্টিতে হংকং কনভেনশন অনুযায়ী দেশের শিপইয়ার্ডগুলোকে বাধ্যতামূলক গ্রিন ইয়ার্ড নির্মাণের নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু ইয়ার্ডভেদে ৩০ থেকে ৫০ কোটি টাকা খরচ করতে হবে পুরনো ইয়ার্ডগুলোকে গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তরিত করতে। তবে অর্থ খরচের বিষয়টি ইয়ার্ডমালিকদের জন্য বড় একটি বাধা হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকেলার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, এই শিল্পে বাংলাদেশ গ্রিন শিপ ইয়ার্ডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে প্রতিকুলতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে তা সম্ভব নয়। বর্তমানে এলসি খোলা যাচ্ছেনা, প্রায় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কাজ বন্ধ হয়ে আছে। ডলারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক টাকা লস গুনতে হচ্ছে। বর্তমানে সরকার ও ব্যাংককে সার্বিক সহযোগীতায় থাকতে হবে। এই খাতের শিল্পোদ্যাক্তাদের বর্তমানে প্রচলিত বিধান অনুযায়ী সরকারি / বেসরকারি বহু সংস্থা / প্রতিষ্ঠানের কাছে দ্বারস্থ হতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র, নেভী, বিস্ফোরক, ড্রাইডক, শিল্প মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিযুক্ত ৩টি সেইফটি এজেন্সী, সমুদ্র অধিদপ্তর, ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, এসবের কাছে আলাদা আলাদাভাবে দ্বারস্থ হতে হয়। ফলে এই খাতে শিল্পোদ্যোক্তাদের হয়রানীর শিকার অযথা সময় ক্ষেপণ ও ব্যাংক সুদ সহ বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে এ খাতের জন্য ‘দ্য শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং রুলস্ ২০১১’ শিরোনামে বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশ করে সরকার। ওই বিধিমালায় ব্যবসায়ীদের ওয়ান স্টপ সার্ভিস দেওয়ার লক্ষ্যে ‘শিপ বিল্ডিং অ্যান্ড শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড’ গঠনের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এছাড়া গত বছর সরকার প্রণীত বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন-২০১৮-তেও ‘শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। শিপ ব্রেকিং খাত থেকে সরকার বছরে হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পাচ্ছে। রিসাইক্লিং বোর্ড গঠন হলে নানা ভোগান্তি থেকে অনেকটা রেহাই পাওয়া যেত। এক জায়গা থেকেই অফিসিয়াল সব কাজ সমাধান করা যায়। শিপ যেন দির্ঘদিন সাগরে অনুমোদনের অপেক্ষায় পড়ে না থাকে। আর্থিক সংকট ও নানা জটিলতায় এ বছর ১৫৪টি শিপ বিভাজন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯৭টা তাদের নিবন্ধন রেনু করেছে, আর কার্যক্রমে আছে ৩০টি প্রতিষ্ঠান। তাই এই শিল্পকে বাচাতে হলে অবশ্যই সরকারকে আন্তরিকতার সাথে সহযোগীতায় আসতে হবে।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকেলার্স অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারী এম ছিদ্দিক বলেন, সরকার শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লিং এর জন্য উত্তর সলিমপুর, ভাটিয়ারী, দক্ষিণ সোনাইছড়ি, জাহানাবাদ, মধ্য সোনাইছড়ি, উত্তর সোনাইছড়ি, শীতলপুর মৌজার ৭টি অঞ্চলকে গ্রিন জোন হিসাবে ঘোষনা দিয়েছে। তবে গ্রিন ইয়ার্ড করতে গেলে প্রতিটি শিপ ইয়ার্ড মালিকদেরকে ইয়ার্ডের জায়গাগুলো দির্ঘমেয়াদী লীজ দিতে হবে। নতুবা গ্রিন ইয়ার্ডের জন্য ৩০ থেকে ৫০ কোটি টাকা খরচ জাহাজ বিভাজন মালিকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। এতে গ্রিন শিপ ইয়ার্ডের ক্ষেত্রে সবার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
কে আর শিপ এন্ড সাইক্লিং এর মালিক মোহাম্মদ তছলিম উদ্দিন বলেন, গ্রিনইয়ার্ডে রুপান্তরে উন্নয়নের শতভাগ কাজ আমরা ইতিমধ্যে শেষ করেছি। আশাকরি আগামী বছরের শুরুতেই গ্রিন ইয়ার্ড সার্টিফিকেট পেয়ে যাব। এতে পরিবেশের ক্ষতি না করে জাহাজ বিভাজনের মাধ্যমে দেশের অর্থনেতিক উন্নতিতে অবদান রাখতে পারবো বলে আমি আশা করছি।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.