রাউজান সুলতানপুর গ্রামের কৃতি সন্তান ডা. এম এ হাসেম স্মরণে

0

জিয়া হাবীব আহ্সান, এডভোকেট
শিক্ষা দিক্ষা জ্ঞান-গরিমায় দেদীপ্যমান হয়ে আছে উত্তর চট্টগ্রামের রাউজান সুলতানপুর গ্রাম । প্রাচীন কাল থেকে শিক্ষা-দীক্ষায় একটি অগ্রসর জনপদ । উত্তর চট্টগ্রামের রাউজান থানা এলাকায় অসংখ্য গুনী মানুষের জন্ম হয়েছিল । বীর প্রসবিনী রাউজান” এ যুগে যুগে জ্ঞানের অনির্বাণ শিখায় প্রদীপ্ত আলোকময় এক মানবগোষ্ঠীর বিকাশ ঘটেছে, যারা বিশ্ব দরবারে এই দেশকে করেছেন পরিচিত । সংস্কৃতি ও সভ্যতার আলোতে এই অঞ্চল, দেশ, তথা গোটা বিশ্বকে করেছিলেন সমৃদ্ধ । রাউজানে জন্মে ছিলেন বিশ্ব বরেণ্য কিংবদন্তী, গুণী, জ্ঞানী বিজ্ঞগণযার মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্র দৈনিক আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা মরহুম মগফুর ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল খালেক, আজাদীর সম্পাদক বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম প্রফেসর আলহাজ্ব মোহাম্মদ খালেদ, দৈনিক পূর্বকোণ প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব ই্উসুফ চৌধুরী, আবুল কাশেম সাবজজ, আবু আহমদ ডিষ্ট্রিক্ট জজ, নতুন চন্দ্র সিংহ, এশিয়ার প্রথম পি এইচ ডি ডিগ্রি অর্জনকারী ড, বেনী মাধব বড়ুয়া শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবক রাউজান সুলতানপুর গ্রামের কৃতি শিক্ষাবিদ আমার নানাভাই মরহুম এজাহার হোসেন বি.এল (কলকাতা হাওড়া কোর্টের তদানীন্তন সরকারি আইন কর্মকর্তা), লেখক ও ইতিহাস গবেষক আব্দুল হক চৌধুরী, একুশে পদক প্রাপ্ত ছড়া সম্রাট সুকুমার বড়ুয়া, একুশের ঐতিহাসিক প্রথম কবিতা ‚কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি” এর কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী (ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও ভাষা সৈনিক, একুশে পদক প্রাপ্ত কবি, সাংবাদিক) ছিলেন ডা. আবুল হাশেমের ভাগ্নে,কবি নবীন সেন চন্দ্র ছিলেন স্বস্ব মহিমায় উদ্ভাসিত । তাদের মধ্যে বাংলার প্রথম মুসলিম এম.বি(এম বি বি এস) চিকিৎসক রাউজান সুলতানপুর গ্রামের কৃতি সন্তান মরহুম এম এ হাসেম ওরফে মোহাম্মদ মিয়া জন্মেছেন ১৮৯৪ সালে জন্মস্থান চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার সুলতানপুর গ্রাম । পিতা মৌলভী মফজুল আলী আর মাতা বদিউন নেছা । জন্মের পর সামাজিক ও ইসলামী বিধান অনুযায়ী তার নাম রাখা হয় মোহাম্মদ আবুল হাসেম । তবে পরিবারের সদস্যরা আদর করে মোহাম্মদ মিয়া ডাকতেন । ডা. আবুল হাসেমের বংশ পরিচিতি সম্পর্কে বিশিষ্ট গবেষক ও চট্টলতত্ত্ববিদ আবদুল হক চৌধুরী ‘আদম লস্করঃ ডা. হাসেমের পূর্ব পুরুষ’ নিবন্ধে বিস্তারিত তুলে ধরেন । এছাড়া ডা. হাসেমের বড় ভাই আবুল কাসেম ১৯৬৫ সালে নিজ বংশের একটি তালিকা তৈরী করেন । এভাবে হাসেম পরিবারের পূর্বপুরুষ সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায় । আওরঙ্গজেবের আমলে চট্টগ্রাম মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয় । ডা. হাসেমের পূর্বপুরুষ মোগল পদাতিক বাহিনীর শেখ মোহাম্মদ আদম লস্কর সম্ভবতঃ ১৬৬৬ সালে স্ত্রী মজলিশ বিবিকে নিয়ে গৌড় থেকে চট্টগ্রামে আসেন । সীতাকুন্ডু ও হাটহাজারী হয়ে অবশেষে রাউজান থানার সুলতানপুর গ্রামে স্থায়ী হন । আদম লস্করের এক পুত্র রেজা খাঁ বা রাজা খাঁ এবং তৎপুত্র মুকিম খাঁ । মুকিম খাঁর তৃতীয় পুরুষ মোহাম্মদ ইবরাহিম । মোহাম্মদ ইবরাহিমের মোহাম্মদ আলী, গোলাম আলী (দারোগা) ও দেওয়ান আলী নামে তিন ছেলে । গোলাম আলী দারোগা সম্ভবতঃ পুলিশের দারোগা নন, ঢাকায় তার ওকালতি ব্যবসা । গোলাম আলী দারোগার বড় ছেলে আবদুল আলীর প্রথমা স্ত্রীর ঘরে ডা. হাসেমের পিতা মৌলভী মফজুল আলীর জন্ম । অপরদিকে আবদুল আলীর দ্বিতীয় স্ত্রীর বংশধর হেদায়েত আলীর কন্যা উম্মে কুলসুমকে ডা. হাসেম বিয়ে করেন । ছাত্র জীবনে তিনি অত্যন্ত মেধাবী ও মানুষের প্রতি মমত্ববোধী ছিলেন । ১৯১৩ সালে ১৫ তাকার বৃত্তি নিয়ে ম্যাট্রিক পাশ করেন । অতঃপর চট্টগ্রাম কলেজে আইএসসি তে ভর্তি হয়ে ১৯১৫ সালে ১৫টাকার বৃত্তি নিয়ে আইএসসি পাশ করেন । প্রাইমারীতে বৃত্তি পাওয়ার পর মেধার পরিচয় দিলে রাউজান এলাকায় রীতিমত সাড়া পড়ে যায় । চট্টগ্রাম কলেজ, পরবর্তীতে কলকাতা বেঙ্গল মেডিকেল কলেজে ১৯২৩ সালে মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে প্রথম হয়ে এম.বি.এ পাশ করেন এবং তৎকালীন পূর্ববাংলার প্রথম মুসলমান এম.বি.এ ডাক্তার হিসেবে স্বীকৃত হন । কৃতিত্বের জন্য পরীক্ষায় তিনি গোল্ড মেডেল পান । জানা যায় ডা. আবুল হাসেম যখন মেডিকেলের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তখন তিনি বিয়ের প্রস্তাব পান । তখনো বিয়ের সময় না হলেও এ প্রস্তাবকে তিনি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন নি । পাত্রী দূরের কেউ নন । কৈশোরের খেলার সাথী চাচা হেদায়েত আলীর কন্যা উম্মে কুলসুম । ১৯১৮ সালের ১১ মার্চ বুধবার আবুল হাসেম বর হয়ে এলেন এবং জীবন সঙ্গিনী হিসেবে ঘরে তুললেন উম্মে কুলসুমকে । বিয়ে হয়েছে ঠিকই কিন্তু আবুল হাসেম ডাক্তার না হয়ে সংসার ধর্মে জড়াবেন না এই ছিল পণ । তাঁর এ সিদ্ধান্ত অভিভাবকরা মেনে নেন । কেউই চায় নি আবুল হাসেমের পড়ালেখায় বিঘ্ন ঘটুক । এমনকি নবপরিনীতা বধুও না । বরং তিনি অনুপ্রেরণার জীবন্ত আলো হয়ে স্বামীকে উৎসাহ যুগিয়েছেন ডাক্তার হয়ে ফিরে আসার জন্য । সংসার জীবনে তিনি ছিলেন সফল পুরুষ । সংসার ধর্মের প্রতি বিরাগী হয়ে তিনি সমাজ সেবা করেননি । স্ত্রী পুত্র কন্যা ও পরিবারের স্বজনদের বঞ্চিত করে তিনি মানব কল্যানে নিয়োজিত ছিলেন না । ইসলামী বিধান অনুযায়ী সংসার ধর্ম ও পারিবারিক দায়িত্ব পালন করার পর তিনি সমাজ কর্ম করেছেন । তবে বিলাস বহুল জীবন যাপন না করে অতি সাধারণ ধারায় জীবন যাপন করতেন। পুত্র কন্যাদেরকেও অতি মাত্রায় বিলাসী হতে দেন নি । প্রয়োজনের বাইরে ব্যয় করে অমিতব্যয়ী হন নি । মেডিকেলের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র থাকাকালীন সময়ে তিনি বিয়ে করলেও তাঁর সংসার জীবন শুরু হয় ডাক্তারি পাশের পর । তাও আবার কর্ম জীবন শুরু রেঙ্গুনে । ব্যক্তিগত জীবনে ডা. আবুল হাসেম চার পুত্র ও পাঁচ কন্যা সন্তানের জনক । তাঁর পুত্র কন্যারা হলেন যথাক্রমে হাসিনা বেগম (গৃহিনী), নূরুন্নেসা বেগম (গৃহিনী), মোহসেনা বেগম (গৃহিনী), গোলাম আকবর (চিকিৎসক) , জেবুন্নেসা হাসেম (শিক্ষিকা), গোলাম মোস্তফা কাঞ্চন (সমাজকর্মী, ব্যবসায়ী), গোলাম কাদের মিন্টু (ব্যবসায়ী, প্রাক্তন ওয়ার্ড কমিশনার ), গোলাম রাব্বানী বাবুল (ব্যবসায়ী) ও লুৎফুন্নেসা বেগম (গৃহিনী) । কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ২ বছর কলকাতায় চাকুরী করেন । এই সময় রেংগুনে অবস্থানরত তাঁর আত্নীয়বর্গের চাপে সেখানে গিয়ে চিকিৎসা সেবা আরম্ভ করেন এবং একাধিক্রমে ৬ বছরকাল তথায় অবস্থান করেন । চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি সমাজ সেবাও শুরু করেন । কথিত আছে যে, মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছুটি কাটাতে বাড়িতে এসে কলেরা মহামারীতে মানুষের অকাতরে জীবননাশ দেখে তিনি পরবর্তী জীবনে কোন কলেরা রোগীর নিকট থেকে ফিস নেননি । রেঙ্গুনে ডা. আবুল হাসেমের মানব সেবার কথা জানতে পারে শুভার্থীরা তাঁকে রেঙ্গুন ফিরে যেতে বারণ করলে তিনি ১৯২৯ সালে নগরবাসির ইচ্ছা ও আশাকে সম্মান দেখিয়ে অল্প কিছুদিনের মধ্যে আন্দরকিল্লা মোড়ে বর্তমান জামে মসজিদের সিড়ির স্থানে মাসিক ত্রিশ টাকায় দোতালায় একটি চেম্বার ভাড়া নেন । ডা. আবুল হাশেম বিশেষ কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন না কিন্তু তিনি প্রগতিবাদী রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের সুহৃদ ছিলেন । সে সুবাদে তাঁর চেম্বার সুলতান মেডিকেল হলকে বলা হত সুলতান মেডিকেল হোটেল । আমার নানাভাই মরহুম এডভকেট এজহার হোসেন বি.এল, ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল খালেক ও ডা. হাশেম প্রমুখ সমসাময়িক ছিলেন এবং তাঁরা তিনজন উপমহাদেশের মহান অধ্যাত্নিক সাধক পীরে কামেল হযরতুল আল্লামা শাহ সুফী সৈয়দ আহমদ ছিরিকোটি (র.) এর নিকট বাইয়াত গ্রহণ করেন । মোমিন রোডে আমার নানাভাইয়ের প্রতিষ্ঠিত লাইব্রেরি ‘স্টান্ডার্ড লিটারেচার এন্ড কোম্পানি’ নামক পাঠাগারে ডা. হাশেম নিয়মিত পত্রিকা ও জার্নাল পড়তে আসতেন । আমার আম্মার ফুফাত ভাই মরহুম শামসুল আজাদ চৌধুরী (সাবেক ডিজিএম জনতা ব্যাংক) ডা. হাশেমের পুত্র সন্তানদের গৃহ শিক্ষক ছিলেন । চট্টগ্রামের একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর পরশে থেকে ডাক্তার আবুল হাশেমের সমাজ সেবার উৎসাহ আরও বেড়ে যায় । ১৯৩০ সালে মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর সঙ্গে একাত্ন হয়ে গড়ে তোলেন কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা । জানা যায় তৎকালীন বঙ্গীয় দ্বিতীয় এতিমখানা কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা । পবিত্র রমজানে তিনি প্রায় এতিমখানায় এতিমদের সাথে ইফতার করতেন । কদম মোবারক এতিমখানার জন্য তিনি নিজের পেশা থেকেও বেশি সময় দিতেন । মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ও ডা. আবুল হাশেমের আপ্রাণ চেষ্টায় কদম মোবারক এতিমখানাটি প্রতিষ্ঠিত হয় । অনেক সময় ঘরের ইফতার সামগ্রী নিয়ে ফকির মিসকিনদের সঙ্গে একই থালে রেখে সবারগুলো মিশিয়ে ইফতার সারতেন । ফকির মিসকিনরা তাঁর এ আচরনে লজ্জা পেতো । তিনি তাদের সংকোচ ভাঙ্গিয়ে বলতেন, —আমাদের সবার মাটির শরীর । এ শরীর একদিন মাটিতে মিশে যাবে । সুন্দর পোষাক আর মলিন পোষাকের পার্থক্য দু’দিনের দুনিয়ায় । এগুলো নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগলে পরওয়ারদেগার নারাজ হবেন । আল্লাহ আমাদের সমান করে পাঠিয়েছেন । পৃথিবীর সমাজ আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে দিয়েছে । তাই আমাদের কর্তব্য মানুষে মানুষে বিভেদের প্রচ্ছন্ন দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা । এভাবে অতি সহজ সরল জীবন যাপনের অভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন ডা. আবুল হাসেম । মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ও হাশেম সম্পর্ক জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত অব্যাহত ছিল । মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর রাজনীতির জন্য তিনি ছিলেন উদার হস্ত । ১৯৩৬ সালে বঙ্গীয় আইন পরিষদ মনিরুজ্জামান এসলামাবাদী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে ডাক্তার আবুল হাসেম অর্থ ও শ্রম দুই নিয়ে নির্বাচন কর্মকাণ্ডে শরিক হন । উভয়ই বিশ্বাস করতেন ইউনাইটেড এস্টেটস অফ ইন্ডিয়া উইথ প্রভিনশিয়াল অটোনমি; তাই তিনি ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তিকে মনে প্রাণে মেনে নিতে পারেন নি । প্রায়ই বলতেন ভারতের অন্য অংশের মুসলমানদের বাদ দিয়ে শুধু দু’অংশের মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র বেমানান । ১৯৩৯ সালে ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় খাদ্য শস্যের সংকট শুরু হলে মহামারী চলাকালীন চট্টগ্রামবাসীর এই সমস্যা মোকাবিলায় তাঁর ডাকে সাড়া দেয়া সম্পদশালী নগরবাসী সর্ব জনাব খান বাহাদুর ফরিদ আহমদ চৌধুরী, ডা. কৃষ্ণ প্রসাদ ঘোষ, রফিক উদ্দীন সিদ্দিকী, পুর্নেন্দু দস্তিদার, কমরেড আবদুস সাত্তার, কল্পতরু সেন গুপ্ত প্রমুখের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় লঙ্গরখানা খোলা হয় । যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই লঙ্গরখানা চালু থাকে । তার পাশাপাশি ১৯৪০ সালে প্রফেসর যোগেশ সিংহের বাসায় এবং মিউনিসিপ্যাল স্কুলের উল্টো দিকে ২টি সেবামূলক অক্সিলারি হাসপাতাল গড়ে তুলেন । যুদ্ধের সময় নগরীর বিভিন্ন অঞ্চলে পরিত্যক্ত অবস্থায় কুড়িয়ে পাওয়া শিশুদের তাঁর বেবিজ হাস্পাতালে নিয়ে আসা হতো যার কারণে শতাধিক অসহায় এতিম শিশু প্রাণে বেঁচে যায় । রেঙ্গুন থেকে আপননিবাস চট্টগ্রামে এসেও তিনি অন্যায় দেখে চুপ করে থাকতে পারেন নি । যেখানে অন্যায় অবিচার দেখেছেন সেখানে প্রতিবাদী ভূমিকা রেখেছেন । মাষ্টারদা সূর্যসেনের ফাঁসিতে বিক্ষুদ্ধ হয়েছেন । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এক শ্রেনীর সমাজ বিরোধী মজুতদার ও মুনাফাখোরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন । ঠিক তেমনি ভাবে ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশ সৈন্যদের বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে রাস্তায় নেমেছেন । ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর পাকিস্তান বাহিনী সামরিক শাসন জারী করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে ঢাকা থেকে যে নয়জন নেতা বিবৃতি দেন তার সমর্থনে চট্টগ্রাম থেকে প্রদত্ত চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের বিবৃতিতে ডাক্তার এম.এ হাসেম সবার প্রথমেই সই করেন । ১৯৬২ সালে কুখ্যাত হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে সমর্থন করে তিনি বলেন, এ ধারাকে অব্যাহত রেখে ইতিবাচক আন্দোলন করতে পারলে অদুর ভবিষ্যতে পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধিকার আসবে । ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান ভারত যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান অরক্ষিত থাকায় ডা. হাসেম পাক সরকারের দায়িত্বহীনতায় দুঃখ পেয়েছিলেন । তিনি ১৯৬৬ সালে ৬ দফা সমর্থন করেছিলেন । তিনি প্রায়ই বলতেন, পাকিস্তানী সরকার যে ভাবে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামরিক দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তান এবং বাঙালীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করছে তাতে মনে হচ্ছে পাকিস্তানের দু’অংশ বেশি দিন আর এক থাকতে পারবে না ।” পারিবারিক জীবনে ডা. হাসেম ছিলেন সুশৃংখল ও গোছানো মানুষ। প্রচুর অর্থ আয় করলেও অপব্যয় করতেন না । ছিলেন মিতব্যয়ী । নিজের সহজ সরল জীবনাদর্শে সন্তানদের লালন করেছেন । প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অর্থ সংসারেও ব্যয় করেননি । বাড়তি অর্থ দিয়ে সমাজের কল্যান করতেন । প্রচুর অর্থ আয় করলেও তিনি শহরে ১৯৫২ সালের আগ পর্যন্ত বাড়ি করতে পারেননি । শেষ বয়সে ছেলেদের প্রচেষ্টায় রাজাপুর লেইনে ডা. হাসেম বাড়িটি করতে পেরেছিলেন । শহর চট্টগ্রাম থেকে নিরক্ষতা দূরীকরণের জন্য তিনি অন্যান্যদের সঙ্গে যথাসাধ্য চেষ্টা করেন । তাঁর চেম্বারে দরিদ্র রোগীরা এলে বলতেন নিজের নাম লিখতে। দরিদ্র রোগীদের কৌতুক করে বলতেন, —Òনাম দস্তখত করতে পারলে ফিস নেবো না এবং ঔষধ কিনে দেবো ।” যারা নাম লিখতে পারতোনা তাদের নাম কাগজে লিখে দিয়ে বলতেন নাম লেখা শিখলে কখনো ফিস নেবো না । অবশ্য তিনি কখনোই দরিদ্র রোগীদের নিকট থেকে ফিস নিতেন না । তাঁর এ কৌতূকপূর্ণ ভূমিকায় অনেক রোগী নাম দস্তখত শেখে । এছাড়াও তাঁর আন্দরকিল্লাস্থ সুলতান মেডিকেল হলের সামনে অনেক টোকাই ধরনের শিশু প্রতিদিন আসতো । তিনি ঐ সব শিশু কিশোরদের বিস্কুট, চকলেট দিয়ে নাম দস্তখত শেখাতেন । এ ধরনের অনেককে দৈনিক আজাদী পত্রিকা প্রকাশিত হওয়ার পর ইঞ্জিনিয়ার খালেক সাহেবের নিকট পাঠিয়ে জীবিকার ব্যবস্থা করে দেন । তিনি নিয়মিত নামাজ পড়তেন এবং ধর্মীয় অনুশাসন পালনে অন্যান্যদের উপদেশ দিতেন। ধর্মের প্রতি অবিচল আস্থার কারণে তিনি দীর্ঘ দিন চট্টগ্রাম জামে মসজিদের সেক্রেটারী ছিলেন । মানব প্রেমী হওয়ার কারণে জীবদ্দশায় ডা. আবুল হাসেম বহু সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন । যে সব সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন সেগুলো হচ্ছে- কদম মোবারক এতিমখানা, মুসলিম এডুকেশন সোসাইটি, চট্টগ্রাম নাইট কলেজ (বর্তমান সিটি কলেজ), এমইএস কলেজ [বর্তমানে ওমরগনি এমইএস কলেজ] (প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারী), চট্টগ্রাম জামে মসজিদ(সেক্রেটারী), ষ্টেষ্ট মেডিকেল ফ্যাকালটি (সদস্য), রেডক্রস সোসাইটি (সদস্য), বার্ম ইভাকুই কমিটি (সেক্রেটারী), চট্টগ্রাম বেবিজ হাসপাতাল (সহ-সভাপতি ও অবৈতনিক প্রধান চিকিৎসক), জেলা রিলিফ কমিটি (সভাপতি), ভি আই (ভিক্টোরিয়া ইসলামিক) হোষ্টেল (প্রতিষ্ঠাতা), চট্টগ্রাম মেডিকেল স্কুল (প্রধান উপদেষ্টা), পূর্ব পাকিস্তান স্বাস্থ্য কমিটি (সদস্য) প্রভৃতি । এ ছাড়াও আরো অনেক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তিনি ছিলো । সংগঠনগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই তিনি দায়িত্ব শেষ করেছেন তা নয়, সংগঠনগুলোকে সব ধরণের আদর্শিক পথে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেন । অসম্প্রদায়িক চেতনার মানব প্রেমিক ডা. আবুল হাসেম বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৭০ সালের ১১ আগষ্ট, ১৬ শ্রাবন ১৩৭৭ বাংলা, হিজরী ১০ জমাদিউসসানি ১৩৯০ মঙ্গলবার সকাল ৭.২২ মিনিটে ৭৬ বৎসর বয়সে রাজপুর লেইনস্থ নিজ বাসভবনে মারা যান । সংবাদ প্রচারিত হওয়ার পর শোকের ছায়া নামে সর্বত্র । যারা তাঁর সেবা পেয়েছিলেন তাদের মাঝে ছিলো আহাজারী । ধনী গরীব সর্বস্তরের মানুষের প্রিয় মানুষ ডা. আবুল হাসেমের মৃত্যু সংবাদে মানুষের মিছিল নেমে আসে রাজাপুর লেনের বাড়িতে । এক নজর শেষ দেখার জন্য মানুষের ভীড় লেগেছিলো । সাধারণ মানুষের অতি প্রিয় পাত্র ডা. হাসেমের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে মানুষ কৃপনতা দেখায় নি সেদিন । সেবক পুরুষ আবুল হাসেমের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় লালদীঘি ময়দানে । সেদিন আছরের নামাজের পর লালদীঘি ময়দানে অসংখ্য মানুষ সমবেত হয়েছিলেন তাঁর নামাজে জানাজায় । জানাজা শেষে কফিন নিয়ে জনতার ঢল আসে কদম মোবারক এতিমখানায় । স্বজনদের আহাজারী, অসহায় এতিমদের আর্তনাদ আর সুহৃদদের মর্মবেদনার মাঝে মানব সেবক ডা. আবুল হাসেমকে তাঁর প্রিয় অঙ্গন এতিমদের আবাস কদমমোবারক এতিমখানা সংলগ্ন মসজিদের কবরস্থানে দাফন করা হয় । সেই সঙ্গে ইতি ঘটে সেবার জগতের অন্যতম আদর্শ মানুষ ডা. আবুল হাসেমের সৃজনশীল জীবনের । চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ তাঁকে হাসেম ডাক্তার নামেই জানতেন । মৃত্যুর বেশ কিছুদিন আগে ডা. আবুল হাসেম অসুস্থ হয়ে পড়েন । অসুস্থ অবস্থায় সার্বক্ষনিক যেসব চিকিৎসকবৃন্দ তাঁর চিকিৎসা করেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন সর্বজনাব ডা. এ.কে খোন্দকার, ডা. গোলাম মোস্তফা, ডা. মতিন, ডা. রহিম, ডা. এ এফ এম ইউসুফ, ডা. (ক্যাপ্টেন) এম এ ছাফা । এক সময় চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের জন্য যে সকল কীর্তিমান অবদান রেখেছিলেন তাঁদের অনেককে আমাদের বর্তমান নতুন প্রজন্ম তাঁদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে চেনেন না আর চিনলেও ভুলতে বসেছে । চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এই গুণী মানুষের স্মৃতি ধরে রাখতে জামাল খান মোড়-কে ডা. আবুল হাশেম চত্ত্বর নামকরণ করেন । রাউজান সুলতানপুর গ্রামটি যেন গুণী মানুষের তীর্থ ভূমি । আল্লাহ্ তাআলা এইসব গুণী মানুষদের নানা অবদানের বিনিময়ে তাঁদের উত্তম প্রতিদান দান করেন, আমীন ।

লেখকঃ আইনবিদ, কলামিস্ট, সুশাসন ও মানবাধিকার কর্মী।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.