ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে বান্ধবীর বাসা শেওড়ায় যাচ্ছিলেন তিনি। সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে গত রোববার বিকেলে চড়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়েরই বাসে। তবে ভুলবশত শেওড়ার বদলে নেমে পড়েন বিমানবন্দর সড়কে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের কাছে। এর পরই এক মধ্যবয়সী ব্যক্তি অকস্মাৎ তার মুখ চেপে ধরে হাসপাতালের অদূরে গলফ ক্লাব সীমানার শেষ প্রান্তে ঝোপের মধ্যে নিয়ে যায়। সেখানে ধর্ষণের মতো ভয়ংকর ঘটনার শিকার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী সেই শিক্ষার্থী।
প্রায় দুই ঘণ্টা পর জ্ঞান ফিরলে সে রাতেই সাড়ে ৯টার দিকে নিজেই সাহস ও দৃঢ়তা নিয়ে সিএনজি অটোরিকশায় বান্ধবীর বাসায় যান ধর্ষণের শিকার সেই ছাত্রী। বিমানবন্দর সড়কের মতো ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সংঘটিত এমন ঘটনা জানাজানি হলে ক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা। এর প্রতিবাদে গতকাল সোমবার দিনভর উত্তাল ছিল ঢাবি ক্যাম্পাস। ধর্ষককে গ্রেপ্তারে দেওয়া হয়েছে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম। এ ঘটনায় গতকাল দেশের বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনেও নানা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। আজও একই ধরনের কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
প্রতিবাদ-ক্ষোভের মধ্য দিয়ে সেই শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়েছেন তার সহপাঠী ও শিক্ষকরা। মানসিক যন্ত্রণা সামলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে তাকে আন্তরিকভাবে সহায়তা করা হচ্ছে। এর আগেও বিমানবন্দর সড়কে একাধিক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। ধর্ষণ ও ছিনতাইয়ের ঘটনাও রয়েছে সেসবের মধ্যে। এতে বিমানবন্দর সড়ক ও আশপাশ এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ঘটনার তদন্ত করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, মেয়েটির পাশে দাঁড়ানো আমাদের প্রথম দায়িত্ব। তার অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ন্যায়বিচার পেতে যা প্রয়োজন, তাই করা হবে। সে আমাদের মেয়ে- তা মনে রাখতে হবে। আশা রাখি, তার মনোবল শক্ত থাকবে।
রোববারের ওই ঘটনার পর এরই মধ্যে ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছেন তার স্বজনরা। এ ছাড়া চিকিৎসক, শিক্ষক, পুলিশের কাছে ভীতিকর ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। সোয়া ৭টার দিকে বাস থেকে কুর্মিটোলায় নামার পর আলো-আঁধারি পরিবেশে কেউ একজন পাশ থেকে তার মুখ চেপে ধরে। ওই লোকটির পরনে ছিল নোংরা জিন্স প্যান্ট ও শার্ট। এরপর তাকে জোর করে পাশের জঙ্গলে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে তার গলা টিপে ধরে ওই লোকটি। এতে প্রায় অচেতন হয়ে পড়েন তিনি। রাত সাড়ে ৯টার দিকে জ্ঞান ফেরার পর তিনি দেখেন, জঙ্গলে পড়ে রয়েছেন। তার পাশে তখনও ওই ব্যক্তিকে দেখতে পান তিনি। ধর্ষক ওই ব্যক্তি তার কাছে নাম, পরিচয় ও কোথায় পড়াশোনা করছে- এসব জানতে চায়। একপর্যায়ে ধর্ষণের শিকার ওই ছাত্রীর ব্যাগ খুলে লোকটি টাকা-পয়সা ও জিনিসপত্র দেখতে থাকে। এই সুযোগে পালিয়ে সেখান থেকে চলে আসেন ওই ছাত্রী। তাকে পোশাক পরিবর্তন করতে বাধ্য করে ওই ধর্ষক। তার কাছে দুটি ব্যাগ ছিল। যে ব্যাগে দেড় হাজার টাকা ছিল সেই ব্যাগ খোয়া গেছে।
পড়ে ছিল বই, ঘড়ি আর ক্লাসের নোটবুক :ধর্ষণের শিকার তরুণী ঘটনাস্থলের বিষয়ে আভাস দিলেও নিশ্চিত করে স্থানটা চিহ্নিত করতে পারছিলেন না। গতকাল সোমবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরো এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে ধর্ষণের ঘটনাস্থলটি শনাক্ত করেছে। সেখানে পড়ে ছিল ধর্ষকের বর্বর হিংস্রতার নানা আলামত। চিকিৎসকরাও মেয়েটির শরীরজুড়ে পেয়েছেন পাশবিকতার ক্ষতচিহ্ন।
গতকাল সকালে পুলিশ ও র্যাবের পৃথক দল বিমানবন্দর সড়কে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের কাছে গলফ ক্লাব সীমানার শেষ প্রান্তে ঝোপের মধ্যে ঘটনাস্থল চিহ্নিত করে। সেখানে এলোমেলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল মেয়েটির বই, ক্লাসের নোটবুক, লেকচার শিট। এর পাশেই পাওয়া যায় মেয়েটির ব্যবহূত ইনহেলার, চাবির রিং আর হাতঘড়ি। এমন আলামত জোরালোভাবেই ওই ছাত্রীর ওপর নির্মমতার সাক্ষ্য দিচ্ছে। তিনি যে সাহসের সঙ্গে রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন, তাও ছিল স্পষ্ট।
পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী জানিয়েছেন, ওইসব আলামতের বাইরে ঘটনাস্থলেই মিলেছে একজোড়া জুতা ও কালো রঙের একটি জিন্স প্যান্ট। পুলিশ ধারণা করছে, এগুলো ধর্ষকের এবং ধর্ষণকাণ্ডে একজনই অংশ নিয়েছে। ওই শিক্ষার্থীও জানিয়েছে, একজনই তাকে ধর্ষণ করেছে।