Thursday, August 13

আজ মহান মে দিবস

0

আজ মহান মে দিবস। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে দেশে সীমিত পরিসরে দোকানপাট খোলা রেখে লকডাউন চলছে। মহামারি কোভিড ও লকডাউনে সীমাহীন দুর্দশায় সময় পার করছেন শ্রমজীবী মানুষ। বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকরা পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়। গত বছর করোনা প্রতিরোধে ‘সাধারণ ছুটি’তে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ খাদ্য বাবদ খরচ কমাতে বাধ্য হয়েছে এবং ৬৯ শতাংশ পরিবার ঋণ নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করেছে। ওই সময় কাজ হারিয়ে বেকার হয়েছেন দেশের সাড়ে পাঁচ কোটি শ্রমজীবী মানুষ। এবার দ্বিতীয় ঢেউয়ে কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন বহু অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক। গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) যৌথ জরিপ অনুযায়ী, করোনার কারণে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ।
বৈশ্বিক করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে মৃত্যুর মিছিল, বেকারত্বের দীর্ঘ মিছিলের মধ্যেই আজ পালিত হচ্ছে পহেলা মে, মহান মে দিবস। বিশ্বব্যাপী শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন আজ, যার সূচনা হয়েছিল ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর হে মার্কেটে শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে সেদিন শ্রমিকরা জীবন দিয়েছিলেন। আজ যখন মে দিবস পালিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশসহ বিশ^ব্যাপী দারিদ্র্য-বেকারত্ব-দুর্দশা বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিভিন্ন সংস্থাসহ বিশেষজ্ঞরা।
পিপিআরসি ও বিআইজিডির গবেষণা অনুযায়ী, ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সা¤প্রতিক

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, করোনায় দেশে ১ কোটি ৬৮ লাখ মানুষ গরিব হয়ে পড়েছে। ২০১৭ সালে মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ দরিদ্র ছিল, বর্তমানে তা বেড়ে ৩৩ শতাংশ হয়েছে। দেশের শ্রমজীবী মানুষের বেতন কমেছে ৩৭ শতাংশ। ঢাকায় বেতন কমেছে ৪২ ও চট্টগ্রামে ৩৩ শতাংশ। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ৬৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠান। দেশের ২০ শতাংশ পরিবারের আয় কমে গেছে। করোনাকালে চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরিমাণ ৮৭ শতাংশ কমে ১৩ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে বেকারত্বের হার ২০ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশ হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থনৈতিক সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে নি¤œ আয়ের মানুষ। শহরের রিকশাচালক, দিনমজুর, গৃহপরিচারিকা, রেস্টুরেন্টকর্মী, ভাসমান ব্যবসায়ী, অটোচালক, গ্রামের কৃষক, জেলে, দোকানি, বিদেশফেরত মানুষরা সবচেয়ে বড় বিপদে পড়বেন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, করোনায় সবচেয়ে সমস্যায় পড়েছেন শ্রমজীবী মানুষ। তাদের আয় কমে গেছে। এর ওপর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনার প্রথম ধাক্কার পর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে রয়েছে দেশ। ঠিক সেই মুহূর্তে করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় চাপে পড়েছে অর্থনীতি। যদিও প্রথমবারের মতো করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা থেকে দেশের অর্থনীতি সামলে উঠতে সক্ষম হবে বলে আশাবাদী অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, করোনায় সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়বেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। এছাড়া দিনমজুর বিশেষ করে রিকশা, ভ্যান ও ঠেলাচালক শ্রেণীর শ্রমজীবী মানুষদের দুর্দশার শেষ নেই। বিশ^ব্যাংক আভাস দিয়েছে, নতুন এ ধাক্কা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসেবে, দেশে এখন প্রায় ৪২ হাজার কলকারখানা আছে। এসব খাতেই দেশের ৩৫ শতাংশ কর্মসংস্থান হয়। করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা এ খাতে।
এ ব্যাপারে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু  বলেন, এই বৈশি^ক মহামারিতে সবচেয়ে বেশি সংকট, দুঃখ, কষ্ট, দুর্দশা, বিপর্যয় অবস্থার মধ্যে পতিত হয়েছে শ্রমিক-কর্মচারী-শ্রমজীবী-কর্মজীবী-মেহনতি মানুষ। করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিসহ আয় সংকট, খাদ্য সংকট ও চাকরিহীনতার ঝুঁকির মধ্যে অমানবিক জীবনযাপন করছে। এই সংকটে সরকারি-বেসরকারি-ব্যক্তি মালিকানা নির্বিশেষে প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক সব কলকারখানা-প্রতিষ্ঠানের সব শ্রমিক ও কর্মচারীর নাম তালিকাভুক্ত করে ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে। তাদের একজনও যেন অনাহারে না থেকে, চাকরিচ্যুত না হয়, পাওনা বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত না হয় এবং লকডাউনকালে তাদের খাদ্যত্রাণ সহায়তা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান ইনু। সেইসঙ্গে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সব শ্রমিক-কর্মচারীকে ভ্যাকসিনেশনের আওতায় আনার দাবি জানান সাবেক এই তথ্যমন্ত্রী।
সিপিবি নেত্রী ও গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার ভোরের কাগজকে বলেন, করোনাসংকটে গতবারের মতো ব্যাপক আকারে না হলেও এবারও পোশাকশিল্পে শ্রমিক ছাঁটাই অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে কলকারখানা চালু রেখেই লকডাউন থাকায় শ্রমিকরা ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাদের স্বাস্থ্যনিরাপত্তাও নেই। এছাড়া কৃষিশ্রমিক ও চা শ্রমিক ছাড়া বাকি শ্রমজীবী মানুষের অবস্থা করুণ। বাড়ছে বেকারত্ব, বাড়ছে দারিদ্র্য।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.