আজ মহান মে দিবস। মাঠে-ঘাটে, কলকারখানায় খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ে রক্তঝরা সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাস সৃষ্টির দিন। দীর্ঘ বঞ্চনা আর শোষণ থেকে মুক্তি পেতে ১৮৮৬ সালের এদিন বুকের রক্ত ঝরান শ্রমিকরা।
পরিবারে প্রতিনিয়ত অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন নারী। কৃষিকাজের ২১টি ধাপের মধ্যে ১৭টি ধাপে তারা কাজ করছেন। তৈরি পোশাক কারখানার প্রায় ৯০ শতাংশ নারী। কারুশিল্পে নারীর সংখ্যা ৩০ লাখ। অথচ তাদের কাজের কোনো স্বীকৃতি নেই। দেশের অর্থনীতিতে তাদের শ্রমের কোনো মূল্যায়ন নেই।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক জরিপ অনুযায়ী, নারীর মোট গৃহস্থালি শ্রম যোগ করলে তা অনেক দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনের অর্ধেকের মতো হয়। তাদের অনেক কাজই অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে। তবে মে দিবস এলেই নারীর অধিকার নিয়ে সবাই সোচ্চার হন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারী ও পুরুষ শ্রমিক সবাই আইনের দৃষ্টিতে সমান। অথচ পরিবার-কর্মস্থল-সমাজ-রাষ্ট্র সর্বত্রই তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এ বৈষম্য নারীর নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে।
নারীর শ্রমের মর্যাদা নিয়ে এমন প্রশ্নের মুখে প্রতিবছরের মতো এবারও সারা দেশে মহান মে দিবস পালিত হতে যাচ্ছে।
এ বছর বাংলাদেশে দিবসটির প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে- ‘শ্রমিক মালিক ভাই ভাই, সোনার বাংলা গড়তে চাই।’ দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। সরকারিভাবে দিনব্যাপী কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- মে দিবসের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও সেমিনার।
বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে গৃহশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় এক কোটি। তাদের অনেকে কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হয়। পাঁচ থেকে ১৭ বছরের বেশি গৃহশ্রমিক নামমাত্র বেতন এবং দুই বেলা খাবারের বিনিময়ে প্রায় ২০-২১ ঘণ্টা শ্রম দিয়ে যাচ্ছে।
তাদের কোনো নিয়োগপত্র নেই, নেই কোনো বিনোদনের ব্যবস্থা। তারা সাপ্তাহিক ছুটিও পায় না। শিক্ষার অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত।
বিলস সূত্র জানায়, ২০১৫-২০১৬ সালে ১৯০ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার হয়েছে গৃহকর্মীদের ৭০ শতাংশের বেশি শিশু। বিদেশে যেসব বাঙালি নারী শ্রমিক গৃহশ্রমে কাজ করে, সেখানেও তাদের প্রতারণা ও বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। অনেকে শারীরিক অত্যাচার, নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে দেশে ফিরে আসছেন।
তৈরি পোশাক শিল্প খাতে চীনের পর বাংলাদেশের অবস্থান। এ খাতে আনুমানিক চার কোটি শ্রমিক কাজ করেন। তাদের বেশির ভাগই নারী শ্রমিক। বাংলাদেশে রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি অবদান রাখে তৈরি পোশাক শিল্প। এখানে মজুরিবৈষম্য ব্যাপক।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নামমাত্র মজুরি দিয়ে তাদের সহযোগী হিসেবে নেয়া হয়। অনেক নারীকে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা দেয়া হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুরুষ শ্রমিক জানান, বিষয়টি তাদের কাছেও খারাপ লাগে। কিন্তু প্রতিবাদ করতে পারেন না। কারণ তারা সবাই সরদার ধরে কাজে আসেন। সরদারের বাইরে কোনো কথা বলা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষদের চেয়ে নারী শ্রমিকরা বেশি কাজ করেন বলেও তিনি স্বীকার করেন।
রাজধানীতে নারী নির্মাণ শ্রমিকের অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু বৈষম্য কমছে না। কর্মক্ষেত্রে প্রায় সব স্তরেই নারী তীব্র মজুরিবৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। কৃষি খাতে নারীর সবচেয়ে বেশি অবদান থাকলেও স্বীকৃতি দেয়া হয় না। কৃষিকাজের ২১টি ধাপের মধ্যে নারীরা ১৭টি ধাপের কাজ করেন। এরপরও নারী কৃষক বা কৃষান হতে পারেননি।
কৃষি খাতের ৪৫ দশমিক ছয় শতাংশ কাজই নারীরা বিনামূল্যে করেন। কৃষিকাজে নিয়োজিত শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ। বর্তমানে কৃষি খাতে পুরুষের অংশগ্রহণ কমেছে সাড়ে তিন শতাংশ। এ
এরপরও কৃষিতে নারীর কাজের স্বীকৃতি নেই। ২০১১ সালের জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিতে নারীর মজুরিবৈষম্য দূর করতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ২০১৩ সালের জাতীয় কৃষি নীতিতেও ‘কৃষিতে নারী’ নামে একটি ধারা যুক্ত করা হয়।
এতে কৃষি উপকরণ, কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড, সার, বীজ, ঋণ সুবিধাসহ নারী-পুরুষের সমান সুযোগ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কৃষিতে নারীর স্বীকৃতি আলোর মুখ দেখেনি।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলাদা বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তারা শ্রমজীবী মানুষসহ দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
আজ সরকারি ছুটি। সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালতের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সব তফসিলি ব্যাংক ও কলকারখানা বন্ধ থাকবে। বাংলাদেশ সরকারি-বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন ও বেতারগুলো বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার এবং সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র ও নিবন্ধ প্রকাশ করেছে।
১৮৮৬ সালের এদিন বুকের রক্ত ঝরান শ্রমিকরা। এদিন শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের সব শিল্পাঞ্চলে ধর্মঘটের ডাক দেন। এই ডাকে শিকাগো শহরের তিন লাখেরও বেশি শ্রমিক কাজ বন্ধ রাখেন। শ্রমিক সমাবেশকে ঘিরে শিকাগো শহরের হে মার্কেট রূপ নেয় কয়েক লাখ শ্রমিকের বিক্ষোভ সমুদ্রে।
এখানে ১ লাখ ৮৫ হাজার নির্মাণ শ্রমিকের সঙ্গে লাল ঝাণ্ডা হাতে সমবেত হন আরও অসংখ্য বিক্ষুব্ধ শ্রমিক। বিক্ষোভের একপর্যায়ে পুলিশ শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালালে প্রাণ হারান ১০ শ্রমিক। অন্যদিকে, হে মার্কেটের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সারাবিশ্বে। গড়ে ওঠে শ্রমিক-জনতার বৃহত্তর ঐক্য।
তীব্র আন্দোলনের মুখে শ্রমিকদের দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি মেনে নেয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার। পরে ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে এই অর্জনকে স্বীকৃতি দিয়ে ১ মে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস’ ঘোষিত হয়। ১৮৯০ সাল থেকে ‘মে দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।
মে দিবসের কর্মসূচি : সকাল ৭টায় শ্রম ভবনের সামনে থেকে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মজিবুল হকের নেতৃত্বে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হবে। শোভাযাত্রাটি দৈনিক বাংলা মোড় হয়ে বায়তুল মোকাররম উত্তর দিক দিয়ে পল্টন মোড় অতিক্রম করে জাতীয় প্রেস ক্লাবে গিয়ে শেষ হবে। এছাড়া বিকাল ৪টায় বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে শ্রমিক দিবসের মূল আলোচনা অনুষ্ঠান হবে। এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সভাপতিত্ব করবেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মজিবুল হক।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বাংলাদেশ অফিসের প্রধান গগন রাজভান্ডারি, শ্রমিক লীগের সভাপতি শুক্কুর মাহমুদ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া বিভিন্ন শ্রমিক ও সাংস্কৃতিক এবং পেশাজীবী সংগঠন আলোচনা, শোভাযাত্রা, সমাবেশ ও নাট্যাংশ প্রদর্শনীর মাধ্যমে দিবসটি পালন করবে।