Wednesday, August 26

আয়ের উৎস না থাকলেও কোটি টাকার মালিক রাজীব

0

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব। প্রায় ছয় বছর আগে মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির একটি বাড়ির নিচতলার গ্যারেজের পাশেই ছোট্ট এক বাড়িতে সস্ত্রীক ভাড়া থাকতেন তারিকুজ্জামান রাজীব। ভাড়া দিতেন ৬ হাজার টাকা। তবে ছয় বছর শেষে একই হাউজিং এলাকায় নিজের ডুপ্লেক্স বাড়িতে থাকেন। মাত্র কয়েক বছরেই তিনি মালিক হয়েছেন কয়েক শ’ কোটি টাকার। কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার আগে দৃশ্যমান কোনো ব্যবসাই ছিল না মোহাম্মদপুরের সুলতান তারেকুজ্জামান রাজীবের। বর্তমানেও কাউন্সিলর হিসেবে সরকারি সম্মানির বাইরে কোনো আয়ের উৎস নেই। তবুও সম্পদের পাহাড় গড়েছেন স্বঘোষিত ‘জনতার কাউন্সিলর’ রাজীব।

শনিবার রাতে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে রাজীবকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। গ্রেফতারের পর তাকে দ্বিতীয়বারের মতো বহিষ্কার করে যুবলীগ।

সূত্র জানায়, যুবলীগের উচ্চপদের এই নেতাকে এক সময় যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। পরে কোটি টাকা চাঁদা দিয়ে যুবলীগে যোগ দেন।যুবলীগের দায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। উত্তরের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হওয়ার সময় রাজীব মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। নির্বাচনে জয়লাভের কিছুদিন পর রাজীবের লোকজন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা পাইন আহমেদকে মারধর করে। ঘটনাটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কানে যায়। পরে তাকে মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

সূত্র আরও জানায়, বহিষ্কারের কিছুদিন পর বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। এমনকি তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন। কেন্দ্রীয় যুবলীগের (সদ্য বহিষ্কৃত) দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমানের মাধ্যমে এক কোটি টাকা দিয়ে পদটি নেন তিনি।

রাজীবকে আটকের পর তাকে সঙ্গে নিয়ে মোহাম্মদপুরের বাসা ও কার্যালয়ে তল্লাশি চালায় র‍্যাব। রাতভর এ তল্লাশি অভিযানে শুধুমাত্র ৫ কোটি টাকার চেক ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি। র‍্যাবের ধারণা, আগে থেকেই সতর্ক থাকায় কাউন্সিলর রাজীব আর্থিক লেনদেনের আলামত সরিয়ে ফেলেছেন।

বেশ কিছুদিন ধরে আলোচনার মধ্যেই শনিবার (১৯ অক্টোবর) দিনগত রাতে বন্ধুর বাসায় আত্মগোপনে থাকা রাজীবকে আটক করে র‍্যাব। এ সময় ওই বাসা থেকে সাতটি বিদেশি মদের বোতল, একটি পিস্তল, একটি ম্যাগজিন, তিন রাউন্ড গুলি, নগদ ৩৩ হাজার টাকা ও একটি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয়রা জানায়, রাজীব বর্তমানে প্রায় শতকোটি টাকার মালিক। অথচ ২০১৩ সালে মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির একটি বাড়ির নিচতলার গ্যারেজের পাশেই ছোট্ট এক বেডরুমের ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন তারেকুজ্জামান রাজীব। ছোট ফ্ল্যাটটির দাম ছিল ৬০০০ টাকা। বর্তমানে মোহাম্মদপুর, বেড়িবাঁধ, বসিলা এলাকার পরিবহনে চাঁদাবাজি তার নিয়ন্ত্রণে। অটোরিকশা, লেগুনা, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও বাস থেকে প্রতিদিন প্রায় ২-৩ লাখ টাকা চাঁদা যায় তার পকেটে। পাঁচ বছর ধরে এলাকার কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিচ্ছেন তিনি।

সূত্র জানায়, রাজীবের সব অপকর্মের সঙ্গী যুবলীগ নেতা শাহ আলম জীবন, সিএনজি কামাল, আশিকুজ্জামান রনি, ফারুক ও রাজীবের স্ত্রীর বড় ভাই ইমতিহান হোসেন ইমতি। সে যেখানেই যায়, তার গাড়িবহরের সামনে-পেছনে থাকে শতাধিক সহযোগীর একটি দল। মোহাম্মদপুর এলাকায় রাজীব যুবরাজ হিসেবেই পরিচিত।

গত চার বছরে রাজীব ৮-১০টি নামিদামি ব্র্যান্ডের গাড়ি কিনেছেন। মার্সিডিস, বিএমডাব্লিউ, ক্রাউন প্রাডো, ল্যান্ডক্রুজার ভি-৮, বিএমডাব্লিউ স্পোর্টস কারসহ নামিদামি সব ব্র‌্যান্ডের গাড়িই এসেছে রাজীবের হাতে।

মোহাম্মদপুরে রাজীবের একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি রয়েছে। তবে সূত্র জানায়, সেই জমির মালিক ছিলেন বারী চৌধুরী। এই জমির কিছু অংশে পানির পাম্প বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু জমিটি কৌশলে নিজেই নিয়ে নেন এই কাউন্সিলর।

অভিযোগ আছে, রহিম ব্যাপারী ঘাট মসজিদের সামনে আব্দুল হক নামের এক ব্যক্তির ৩৫ কাঠার একটি প্লট যুবলীগের কার্যালয়ের নামে দখলে করেন রাজীব। এর আগে ওই জমির পাশেই জাকির হোসেনের সাত-আট কাঠার একটি প্লট দখল করেছিলেন তিনি। পরে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে জমি উদ্ধার করেন জাকির।

মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের পাশের ময়ূর ভিলার মালিক রফিক মিয়ার কয়েক কোটি টাকা দামের জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে রাজীব ও তার লোকজনের বিরুদ্ধে। পাবলিক টয়লেট নির্মাণের মাধ্যমে জমিটি দখল করা হয়। সেখানে পাঁচটি দোকান তুলে ভাড়া দিয়ে টাকা নিচ্ছে তারা।

মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের সামনে আল্লাহ করিম মসজিদ ও মার্কেটের নিয়ন্ত্রণও রাজীবের হাতে। কাউন্সিলর হওয়ার পর মসজিদ ও মার্কেট পরিচালনা কমিটির সভাপতি করেন তার স্ত্রীর বড় ভাই ইকরাম হোসেনকে। অভিযোগ রয়েছে, সভাপতি হয়েই ইকরাম মসজিদ মার্কেটের আয় নানাভাবে হাতিয়ে নেন। মার্কেটের ৩৯টি দোকান বিক্রি করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টাও করেন তিনি।

রাজীবের বিষয়ে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. ক. সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ, চাঁদাবাজি এবং দখলদারিত্বের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। অভিযানে তার বসুন্ধরার বাসা থেকে একটি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, তিন রাউন্ড গুলি জব্দ করা হয়। অস্ত্রের কোনো কাগজপত্র আমাদের দেখাতে পারেনি বিধায় এটি অবৈধ অস্ত্র।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.