রাজধানীর বিমান বন্দর সড়কের কুর্মিটোলা এলাকায় জাবালে নূর বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় নৌমন্ত্রীর পদত্যাগ, নিরাপদ সড়ক ও ঘাতক চালকদের দ্রুত বিচার ও ফাঁসির দাবিতে গাড়ি ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করেছে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
অপরদিকে, উত্তরার জসীম উদ্দীন রোডে এনা ও বুশরা পরিবহনের দুটি বাসে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে গেলেও বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা তাদের বাধা দেয়।
শিক্ষার্থীদের নয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- ১. বেপোরোয়া ড্রাইভারকে ফাঁসি দিতে হবে এবং এই শাস্তি সংবিধানে সংযোজন করতে হবে। ২. নৌপরিবহনমন্ত্রীর গতকালের বক্তব্য প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। ৩. শিক্ষার্থীদের চলাচলে এমইএস ফুটওভার ব্রিজ বা বিকল্প নিরাপদ ব্যবস্থা নিতে হবে। ৪. প্রত্যেক সড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাতে স্পিড ব্রেকার দিতে হবে। ৫. সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্র-ছাত্রীদের দায়ভার সরকারকে নিতে হবে। ৬. শিক্ষার্থীরা বাস থামানোর সিগন্যাল দিলে, থামিয়ে তাদের বাসে তুলতে হবে। ৭. শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ৮. ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলাচল বন্ধ ও লাইসেন্স ছাড়া চালকরা গাড়ি চালাতে পারবে না। ৯. বাসে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া যাবে না।
মঙ্গলবার (৩১ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৩টায় উত্তরা হাউস বিল্ডিংয়ে বিজিএমইএ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পাঁচটি বাস এবং একটি পিকআপ ভাঙচুর করে। পরে পুলিশ লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এর আগে দুপুর ১২টা থেকে নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থীরা শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয়। প্রায় কয়েকশ শিক্ষার্থীর সড়ক অবরোধের কারণে শাপলা চত্বরে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষোভ স্লোগানের এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা একটি বাস ভাঙচুর করে।
দুপুর পৌনে ১২টার দিকে সায়েন্সল্যাব মোড়ে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করে সিটি কলেজ এবং ধানমন্ডি আইডিয়ালসহ বেশ কয়েকটি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। এতে মিরপুর রোড, নীলক্ষেত এবং শাহবাগ থেকে সায়েন্সল্যাব এলাকার যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
শিক্ষার্থীদের অবরোধ ভেদ করে একটি বাস সায়েন্সল্যাব মোড়ের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে বাসটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ডিউটি অফিসার এরশাদ হোসেন বলেন, সায়েন্সল্যাবে হিমাচল পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয়া হয়। ধানমন্ডি থানা থেকে ফোন পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে বাসের আগুন নিয়ন্ত্রণ করে।
এছাড়া উত্তরায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে। এসময় বুশরা পরিবহন ও এনা পরিবহনের একটি বাসে আগুন লাগিয়ে দেয় শিক্ষার্থীরা।
এদিকে মতিঝিল শাপলা চত্বরে অবরোধ করে বিক্ষোভ করে নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থীরা, ফামর্গেটে সড়ক অবরোধ করে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ও মিরপুর ১০ এ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে আশপাশের শিক্ষার্থীরা।
মিরপুরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভের সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয় পুলিশের সঙ্গে। এসময় লাঠিচার্জে কয়েকজন আহত হয়। পুলিশের লাঠিচার্জে মাথায় আঘাত পেয়ে রক্তাক্ত হয় মিরপুর শহিদ পুলিশ স্মৃতি কলেজের এক শিক্ষার্থী। এছাড়া আরও দুইজন গুরুতর আহত হয়েছে। আহতদের মিরপুর গ্যালাক্সি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করে রমিজ উদ্দিন কলেজ ও আশপাশের শিক্ষার্থীরা। পুলিশ সেখানে অবস্থান নিয়ে তাদের শান্ত করার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে তাদের বুঝিয়ে রাস্তার পাশে সরিয়ে নেয়া হয়। পরে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।
সকাল থেকে রাজধানীর ফার্মগেটের সড়কে অবরোধ করেন সরকারি বিজ্ঞান কলেজের শিক্ষার্থীরা। ফার্মগেট ওভারব্রিজের নিচে শিক্ষার্থীদের অবস্থানের কারণে প্রায় দুই ঘণ্টা কারওয়ান বাজার থেকে বিজয় সরণির দুই পাশে যান চলাচল বন্ধ ছিল।
বেলা সাড়ে ১১টায় মিরপুর-১ নম্বর সড়কে অবস্থান নেন ঢাকা কমার্স কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা দুটি বাসে ইটপাটকেল ছুড়ে ভাঙচুর চালান। এ ছাড়াও মিরপুর-১০ নম্বর চত্বরে বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন।
দুপুর ১টা থেকে উত্তরার কয়েকটি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা উত্তরার জসীম উদ্দীন মোড়ে অবরোধ করে। এ সময় পুলিশ ও র্যাবের সঙ্গে তাদের কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। অবরোধের ফলে উত্তরা-বিমানবন্দর সড়কে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিকেল সাড়ে ৩টায় জসীম উদ্দীন রোডে উত্তরা ইউনির্ভাসিটি, মাইলস্টোন কলেজ, স্কলাসটির্কসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাস্তা অবরোধ করে এনা ও বুশরা পরিবহনের দুটি বাসে আগুন দেয়।
ফায়ার সার্ভিসের ডিউটি অফিসার রাসেল সিকদার জানান, জসীম উদ্দীন রোডে এনা ও বুশরা পরিবহনের দুটি বাসে শিক্ষার্থীরা আগুন দেয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়াসর সার্ভিসের দুটি টিম গেলেও বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা তাদের বাধা দেয়।
উল্লেখ্য, বিমানবন্দর সড়কে কুর্মিটোলায় রেডিসন ব্লু হোটেলের সামনের সড়কে রমিজ উদ্দিন স্কুল ও কলেজের দুই শিক্ষর্থী জাবালে নূর পরিবহনের (ঢাকা মেট্রো ব-১১-৯২৯৭) বাসচাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় রবিবার দুপুর থেকেই উত্তাল ঢাকা শহর। সোমবার ঢাকার বিভিন্ন সড়ক অবরোধের পর মঙ্গলবারও রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক নিজেদের দখলে নিয়েছেন বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।
ওই ঘটনায় জাবালে নূরের তিন গাড়ির দুই চালক ও দুই হেলপারকে গ্রপ্তার করেছে র্যাব-১।