সম্প্রতি সংসদে এবং গত কয়েকদিন পত্রপত্রিকায় প্রক্ষেপিত পর্যালোচনায় অন্যতম বিষয়বস্তু হিসেবে খেলাপি ঋণ যেভাবে এসেছে তাতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাবকে এভাবে শনাক্ত করা ছাড়া বিকল্প দেখি না। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও শতকরা হার যেন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এসব তথ্য রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো, তবে এর প্রতিরোধ-প্রতিকার, প্রত্যয় ওই আঁতকে ওঠা পর্যন্তই। প্রত্যেক দেশেই খেলাপি ঋণ রয়েছে। তবে বাংলাদেশের মতো এত বেশি নয়। এত নয় এর বহুমাত্রিক ক্ষতিকারক প্রবণতা। খেলাপি ঋণের সমস্যা ও সমাধানের পাঠ পর্যালোচনায় দেখা দরকার খেলাপি ঋণ কী। মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের বয়স অনুসারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের বিধানমতে মেয়াদি ঋণকে বিভিন্ন ধরনের শ্রেণিকরণ করা হয়। যেমনÑ এসএমএ, সাব-স্ট্যান্ডার্ড, ডাউটফুল, ব্যাড অ্যান্ড লস ইত্যাদি। এসব গ্রুপভুক্ত মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণকেই একযোগে ‘শ্রেণিকৃত ঋণ’ বলে। ব্যাংকগুলো মেয়াদি ঋণ ও স্বল্পমেয়াদি ঋণ উভয়ই মঞ্জুর করে থাকে। মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে যখন যে তারিখে কিস্তির ডিউ হয় সে তারিখে ওই কিস্তি পরিশোধ না করলেই তা পরের দিন থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ বা খেলাপি ঋণ বলে গণ্য হয়। প্রসঙ্গত, ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের যে হিসাব দিয়ে থাকে তাকে মূলত ‘নিয়মিত খেলাপি ঋণ’ বলা হয়ে থাকে। এর বাইরেও প্রায় সমান পরিমাণ অবলোপনকৃত খেলাপি ঋণ রয়েছে। সাধারণত অবলোপন করা ঋণকে খেলাপি ঋণ হিসেবে ধরা হয় না। এতে সাধারণভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কিছুটা কম দেখানো হয়। অথচ অবলোপন করা ঋণও প্রকৃত খেলাপি ঋণ। মূলত যেসব ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ, সেসব ঋণকে আর্থিক সুবিধার্থে ব্যাংকের স্থিতিপত্র বা ব্যালেন্স শিট থেকে বাদ দেওয়া হয়। খেলাপি ঋণ হিসেবে প্রদর্শনের এই চাতুর্যতা, ব্যাংকের আর্থিক চেহারা ভালো দেখানোর সুবিধার্থে প্রভিশনিংয়ের পদ্ধতি জনস্বার্থকে উপেক্ষা করে গোষ্ঠীস্বার্থ উদ্ধারের উপায় ছাড়া কিছুই নয়। কেননা এসবই করা হয় যাদের সুবিধার জন্য তারা তার উপকার পায় না, এর সুযোগটা তারাই নেয় যারা কৈয়ের তেলে কৈ ভেজে পরের ধন চুরি করে সম্পদের পাহাড় গড়তে পারঙ্গম।
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণ, এ সমস্যা সমাধানের উপায়, ঋণখেলাপিদের শাস্তির আওতায় আনা নিয়ে সনাতনী সভা-সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠক (টেবিলগুলো অধিকাংশই গোল নয়) অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে সমাধানের পথ বাতলানো হয়, তা সত্ত্বেও ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। দুষ্টচক্র ব্যাংকিং খাতের ওপর এমনভাবে আসর করেছে যে, এ খাতকে সহজেই দুর্নীতিমুক্ত করা যাচ্ছে না। ক্রমেই খেলাপি ঋণের ভয়াবহতা বন্যার পানির মতো বাড়ছেই। সাধারণ গ্রাহকের জমানো টাকা ধড়িবাজরা নানাভাবে লোপাট করছে, তা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই যেন করা যাচ্ছে না। বিভিন্ন পর্যালোচনায় উঠে আসা খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ
১. দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে রাজনৈতিক চাপসহ গ্রাহকদের কাছ থেকে নানা ধরনের আর্থিক ও বৈষয়িক সুবিধা গ্রহণ করে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই না করেই ঋণ প্রদান করার সংস্কৃতি।
২. প্রভাবশালীদের সুবিধার্থে পুনঃতফসিলের সুযোগ অবারিত হওয়া এবং যার একটি বড় অংশ আদায় না হওয়া। বাংলাদেশের বর্তমান সংস্কৃতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, ঋণখেলাপিরা সহজ শর্তে ব্যাংক থেকে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধ করবেন না বরং ওই টাকা তারা অন্যত্র লগ্নি দেখিয়ে গোটা ব্যাংকিং খাতকে গ্রাসে অগ্রসর হতে পারছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাই বলছেন, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে বিভিন্ন সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অল্প অর্থ জমা দিয়েই ঋণ পুনঃতফসিল করা যাচ্ছে। ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর পরও দিন দিন ঋণখেলাপির পরিমাণ বাড়ছে। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাবে দেওয়া ঋণগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খেলাপি হয়ে যায়। এক সময় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেই খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি সীমাবদ্ধ ছিল। এখন বেসরকারি ও বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যেও তা ছড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে যেতে ভয় পাচ্ছে। এতে দেশের ব্যাংকিং খাতে লাখো কোটি টাকার অতিরিক্ত তারল্য সৃষ্টি হয়েছে।
৩. সরকারি ব্যাংকগুলো থেকে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ দেওয়া অধিকাংশ অর্থই খেলাপি ঋণে পরিণত হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর পরিমাণ এতই বেশি হয়, ব্যাংক বাঁচাতে করের টাকায় বিশেষ তহবিল গঠন কিংবা পুনঃতহবিল সরবরাহ করতে হয়, যে সম্পর্কে সম্প্রতি আইএমএফ থেকে বিরূপ মন্তব্য করা হয়েছে। করের টাকায় খেলাপি ঋণের এ অর্থের জোগান দেওয়া নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়, তারা বলছেন, এভাবে সরকারি ব্যাংকগুলোকে টাকা দেওয়া হলে করদাতারা নিরুৎসাহিত হবেন। তা ছাড়া সরকারি ব্যাংকগুলোও খেলাপি ঋণ বন্ধে কঠোর হবে না। আর এখানে টাকা দিতে না হলে এই টাকা সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য তথা সামাজিক খাতে ব্যয় করতে পারত।
৪. যে উদ্দেশ্যে ঋণ প্রদান করা হয় তার যথাযথ ব্যবহার না হওয়া। বর্তমান সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের মতো এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা বিরাজ করছে। ফলে গ্রাহকরা ব্যাংকের কাছে নয়, বরং ব্যাংকগুলোই ঋণ দেওয়ার জন্য বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানির কাছে ধরনা দিচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব কোম্পানিকে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ, তিনগুণ অর্থঋণ দেওয়া হচ্ছে। এতে ঋণগ্রহীতা বাড়তি টাকাগুলো অন্য খাতে খরচ করার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। পরে এই অতিরিক্ত প্রদত্ত অর্থই খেলাপি ঋণে পরিণত হচ্ছে।
৫. অহরহ অভিযোগ উঠছে, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালকরা নিজেদের মধ্যে ঋণ আদান-প্রদান করছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিচালকদের চাপে তাদের পছন্দমতো লোকদের ঋণ দিতে ব্যাংক নির্বাহীরা বাধ্য হচ্ছেন। ফলে এসব ঋণের অধিকাংশই যথাযথ নিয়ম মেনে দেওয়া হচ্ছে না।
৬. বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ মামলায় আটকে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলো অর্থঋণ আদালতে গেলেও মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে না।
৭. অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ সৃষ্টি। ২০০১ সালে সরকারের ইকুইটি অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপ ফান্ড (ইইএফ) থেকে সুদবিহীন ঋণ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্তত ৭৭টি প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্বই নেই বলে সংবাদমাধ্যমে সম্প্রতি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
৮. বাস্তবসম্মত ও প্রযুক্তিগত দিক কাজে লাগিয়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৃঢ়চিত্ত কোনো যুগান্তকারী পদক্ষেপ তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জোরদার তদারকির দৃশ্যগত অপারগতা বা অনুপস্থিতি। বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী অনুমোদন, বোর্ড তথা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিএসইসি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং সর্বোপরি ঋণ বিতরণ, মঞ্জুর ও আদায়ের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে অধিকতর সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা।
৯. সুদের হার বেশি হওয়া।
১০. তথ্য গোপন করে খেলাপি গ্রাহককে ঋণ দেওয়া। ঋণ প্রদানের আগে সিআইবি রিপোর্ট সংগ্রহ বাধ্যতামূলক হলেও অনেক ব্যাংক গ্রাহকের হালনাগাদ সিআইবি রিপোর্ট না নিয়েই ঋণ দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
১১. ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা। বিভিন্ন সময় বড় বড় ঋণখেলাপিকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিয়ে ঋণ মওকুফ করায় অন্য খেলাপিরাও সাহস পেয়ে যায়।
১২. বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিকে সুবিধা দেওয়াটাই ব্যাংকিং খাতে আস্থা সংকট তৈরি হচ্ছে। ব্যাংক খাতে বিশেষ সুবিধা নেওয়াটা এখন কালচার বা সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুযোগ দিতে দিতে এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যারা ভালো গ্রাহক ছিলেন তারাও এখন টাকা ফেরত দিতে চান না।
১৩. বাংলাদেশের অর্থনীতির তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে ছোট অর্থনীতিতে ব্যাংকগুলো অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। ১৪. ঋণের অর্থপাচার হওয়া। ঋণের অর্থপাচারে জড়িয়ে পড়ছে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের কিছু ঋণগ্রহীতা এবং কিছু নির্বাহীও। ১৫. নিয়মিত ঋণ পরিশোধ না করে কিছু ব্যবসায়ীই সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন পদে কারা আসবে সেখানে ভূমিকা রাখে।
১৬. সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্যোগটি ও ব্যাংকিং খাতে আরও অস্থিরতা বিরাজ করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। কয়েকজন পরিচালক মিলে বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় যে সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে তা আরও জোরদার হবে। ঋণ কারা পাবে, কারা ব্যাংক শীর্ষ নির্বাহী হবেন সবই ঠিক করার সিন্ডিকেট শক্তিশালী হলে তাদের চাপে প্রদত্ত ঋণগুলোই খেলাপি হওয়ার আশঙ্কা পরিব্যাপ্ত হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১১ সাল শেষেও দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা, যা ওই সময় পর্যন্ত বিতরণকৃত ঋণের ৬ দশমিক ১২ শতাংশ। এর পর থেকেই বেশি হারে বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকায় সরকারি ব্যাংকগুলো মূলধন ঘাটতিতে পড়ছে। তাই পুনঃমূলধনের নামে এ ব্যাংকগুলোকে টাকার জোগান দিতে হচ্ছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা বলছে, ২০০৮-০৯ থেকে ২০১৫-১৬ পর্যন্ত এই আট বছরের মধ্যে সাত বছরই পুনঃমূলধনের নামে ব্যাংকগুলোকে দেওয়া হয়েছে ১১ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দিয়েছে দুই হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ৯ অর্থবছরে সরকার প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা জোগান দিয়েছে সরকারি ব্যাংকগুলোকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০১৭ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় সাত লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৩ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ঋণের প্রায় ১১ শতাংশই খেলাপি। এর সঙ্গে অবলোপনকৃত খেলাপি ঋণের প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা যোগ করলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় এক লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। মোট ঋণের তুলনায় খেলাপি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম সারিতে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অল্প কিছু ঋণ খেলাপি গোটা ব্যাংকিং খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। বর্তমানে মোট খেলাপি ঋণের ৩৫ শতাংশই নিয়েছে ১২০ জন। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) স্থির মূল্যে ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ জিডিপির ১২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় এ হার অনেক কম। ভারতের জিডিপির পরিমাণ দুই দশমিক ০৭৪ ট্রিলিয়ন ডলার (প্রায় ২ লাখ ৭ হাজার ৪০০ কোটি ডলার)। আর তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৫৪ বিলিয়ন ডলার (১৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলার)। অর্থাৎ ভারতের জিডিপির ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ খেলাপি ঋণ, যা বাংলাদেশ থেকে অনেক কম। এর পরও ভারত সরকার খেলাপি ঋণ নিয়ে বেশ চিন্তিত। তারা খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে। এমনকি ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণখেলাপিকে বিদেশ থেকে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় তুলে আনার নজিরও স্থাপন করেছে।
মূলত এবং মুখ্যত খেলাপি ঋণের ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত। সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা সরকারি ব্যাংকগুলোর। দেশের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেকই সরকারি আট ব্যাংকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় এক লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির (মোট দেশজ আয়) ১২ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খেলাপি ঋণের পরিমাণ জিডিপির ১২ শতাংশ হয়ে যাওয়া রীতিমতো ভয়ানক বিষয়। এ ধরনের প্রবণতা ব্যাংকিং খাতসহ গোটা অর্থনীতিকেই চরম সমস্যার মধ্যে ফেলে দিতে পারে। এতে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। মূলধন ঘাটতি হতে পারে। তা ছাড়া খেলাপি ঋণ বেশি হলে অনেক টাকা প্রভিশন রাখতে হয়। ফলে ব্যাংকগুলো এ খরচ সামাল দিতে ঋণের সুদ কমাতে পারে না। এতে নতুন উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ পড়ে। কারণ নতুন উদ্যোক্তারা উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে গেলে সমস্যায় পড়ে। এ ছাড়া খেলাপি ঋণের বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ব্যাংকিং খাতে। তাই খেলাপি ঋণের রাশ টেনে ধরতে শিগগির কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। এ ব্যাপারে সমন্বিত এবং কঠোর উদ্যোগ নিতে হবে। দায়সারা পদক্ষেপ নিলে হবে না। প্রয়োজনে ঋণখেলাপিদের জামানত নিয়ে নিতে হবে। এ ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থায় যাওয়া যেতে পারে। আইনের দ্বারস্থ হলে ব্যাংককেও সেখানে মনোযোগী হতে হবে। যেনতেনভাবে আইনজীবী নিয়োগ করলে টাকা আদায় হবে না।
মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান
সংগৃহীত আমাদের সময়