সরওয়ার কামাল জামান, কক্সবাজার জেলা সংবাদদাতা: হোম কোয়ারেন্টাইনের নিয়ম না মেনে কক্সবাজার জেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন প্রায় দুই হাজার প্রবাসী। এর মধ্যে ১৭’শ স্থানীয় প্রবাসী এবং বেশকিছু গণ্যমান্য ব্যক্তি, যারা বিভিন্ন কারনে বিদেশ সফর করেছে। গত ১৯ দিনে এসব প্রবাসীরা দেশে এসেছেন বলে জানা গেছে।
কক্সবাজার জেলার বিমানবন্দর, সিভিল সার্জন এবং পুলিশের দেওয়া তথ্য সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এসব বিদেশ ফেরতরা কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে অংশ নিচ্ছে বিয়ে এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে। অবাধে তারা যাচ্ছে বাজারে এবং লোকজনের সমাগম স্থলে। তাই এদের মাধ্যমে গণহারে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
ইতোমধ্যে প্রশাসন জেলায় ৮ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইন এর নিয়ম না মানায় আর্থিক জরিমানা করলেও তাদের চলাফেরায় কোন ধরনের পরিবর্তন আসছে না বলে জানিয়েছেন সেখানকার স্থানীয় অধিবাসীরা।
চীনের উহান শহরে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস ধরা পড়ে গত বছরের ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে। সেখান থেকে বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১৮৭ দেশে ছড়িয়ে পড়ে এই ভাইরাস। এরপর থেকে বিশ্বের সব কটি দেশ করোনা ভাইরাস বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে থাকলেও রোধ করা যায়নি করোনা ভাইরাস এবং টেকানো যায়নি এর বিস্তার।
এপর্যন্ত করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হয়ে বিশ্বে প্রায় ১০ হাজার মানুষ মারা গেছে এবং ২ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা যায় তবে সেখান থেকে প্রায় ৫০ হাজারের বেশি মানুষ সুস্থ হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস রোগী শনাক্ত হয় 8 ই মার্চ। এর আগে থেকেই দেশের সবকটি বিমানবন্দরসহ কক্সবাজার জেলার বিমানবন্দরেও নেওয়া হয়েছিল সতর্কতামূলক ব্যবস্থা।
এদিকে কক্সবাজার জেলার সিভিল সার্জন এবং বিমানবন্দর অফিসসূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ দিনে প্রায় ২ হাজার মানুষ বিদেশ থেকে দেশে এসেছে। এরমধ্যে ৩০০ জন বিদেশী নাগরিক এবং ১৭’শ জন স্থানীয় প্রবাসী। তাদের মধ্যে বেশকিছু গণ্যমান্য ব্যক্তি আছেন যারা বিভিন্ন কারণে বিদেশ সফর করেছেন। যার মধ্যে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান, মালয়েশিয়া, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছেন বলে জানা যায়।
বিদেশ থেকে দেশে ফেরা এসব প্রবাসীদের বিমানবন্দর থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল তারা যেন ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইন এ থাকেন। কিন্তু এসব প্রবাসীরা নিয়ম-নীতির কোন ধরনের তোয়াক্কা না করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন জনবহুল স্থানে। গত ২০ মার্চ সকালে কক্সবাজার বড় বাজারে গরুর মাংস কিনতে এসেছেন পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন খুরুশকুলের এক প্রবাসী। এ সময় উক্ত প্রবাসীকে স্থানীয় জনগণ গালিগালাজ করায় সে ক্ষিপ্ত হয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়েছেন বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এছাড়াও গতকাল শহরের সাইফুল কমিউনিটি সেন্টারে খুরুশকুল এলাকায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে অন্তত ১৫ জন প্রবাসী উপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন খুরুশকুলের অধিবাসী মিজান। প্রথমে পুলিশ এসে বাধা দিলেও তারা রীতিমতো তাদের কাজ চালিয়ে যায়। কিন্তু পরে ম্যাজিস্ট্রেট এসে বাধা দেয়ার পর বিবাহ অনুষ্ঠানের কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খুরুশকুল ইউপি চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন বলেন, বিষয়টি আগে সেভাবে নজরে না আনলেও গত এক সপ্তাহ ধরে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রবাসীদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। বিদেশ থেকে প্রবাসীরা দেশে আসলেও বিমানবন্দর থেকে তাদের হোম কোয়ারেন্টাইনে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল।
পেকুয়া উপজেলার শিলখালী এলাকার সমাজসেবক ইমরান আহমেদ বলেন, এখানে অনেক লোক বিদেশ থেকে এসেছেন তারা যে যার মত বিয়ে কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছেন বাজারে যাচ্ছেন এবং মার্কেটের ঘোরাফেরা করছেন। তাদের সাথে তাদের পরিবার-পরিজন রয়েছে। প্রথমে তারা করোনা ভাইরাস বিষয়ে ব্যাপকভাবে সতর্কতা অবলম্বন করেনি। তবে বর্তমানে অনেকেই সতর্কভাবে আছেন।
রামু উপজেলার খুনিয়া পালং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল মাবুদ বলেন, আমার এলাকায় ৪-৫ জন প্রবাসী বিদেশ থেকে এসেছেন এবং ঘরে-বাইরে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বর্তমানে ইউনিয়ন মেম্বার এর মাধ্যমে তাদের কাছে হোম কোয়ারেন্টাইন নীতি মেনে চলার জন্য সংবাদ পাঠানো হয়েছে। তবে বিমানবন্দর থেকে তাদের সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইন এ নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল।
এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিমানবন্দর কর্মকর্তা বলেন, এখানে অনেক আগের থেকেই বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের শরীরের তাপমাত্রা স্ক্যানার দিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু এখানে সঠিক করোনা পরীক্ষার কিছুই নেই। যাত্রীরা বিমানবন্দরের গেট পার হলেই নিয়ম ভঙ্গ করছে। এতে আমাদের কিছুই করার নেই। আমার মতে সরকার বিষয়টি আরও সিরিয়াসলি নিলে ভালো হতো প্রথম থেকেই তাদেরকে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কোয়ারেন্টাইন এ দিয়ে দেওয়া দরকার ছিল।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন ন্যাশনাল নিউজকে বলেছেন, বিদেশ থেকে আসা লোকদের বিষয়ে আমরা খবরা খবর নিচ্ছি। নিয়ম-নীতি না মানলে তাদের বিষয়ে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দেশের কল্যাণে সরকারের নির্দেশ মতে যা যা করা দরকার আমরা সব করব।