কিকিউ মার্মা,বান্দরবান: সারাবিশ্বের প্রাণঘাতী নভেল করোনা ভাইরাসের সংক্রামণ প্রাদুর্ভাব কারণে পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী প্রাণের উৎসব ‘বৈসাবি’ উযাপিত হচ্ছে না। এবার এই আনন্দ উৎসবে জল ঢেলে দিচ্ছে নভেল করোনা ভাইরাস নামক (কোভিভ ১৯)।
নদীতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে পাহাড়ে চাকমাদের বিজু, ত্রিপুরাদের বৈসুক ও তঞ্চঙ্গ্যাদের বিষু উৎসব পালন করে থাকেন তিন সম্প্রদায়ে জনগোষ্ঠীরা। অন্যদিকে মারমা সম্প্রদায়ে জনগোষ্ঠীরা সকলেই সমবেত হয়ে প্রার্থনা ও দেশের শান্তির কামনা, বয়স্কদের পূজা , ছোয়াং দান ( আহার), বৌদ্ধ মূর্তি স্নান, হাজারো প্রদীপ প্রজ্বালন এবং ঐতিহ্যবাহী দুই দিনব্যাপী জলকেলি (পানি খেলা), পিঠা তৈরি, ঘিলা খেলা ও নিজস্ব ঐতিহ্যবাসী নৃত্য-গানসহ নানা আয়োজনে মধ্য দিয়ে পুরাতন বছরেকে বিদায় আর নতুন বছরকে বরণ করে থাকেন। সামাজিক ও ধর্মীয় নানা আনুষ্ঠানিকতায় একেক জনগোষ্ঠী একেকভাবে এই বৈসাবি উৎসব পালন করে থাকে পাহাড়ে ১১টি সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী।
‘বৈসাবি’ আসলেই চারদিকে বয়ে যায় পাহাড়ে উৎসবের আমেজ। পাহাড়ের বৈসাবি উৎসব মানে ক্ষুদ্র নুগোষ্ঠীর সম্প্রদায়ের আনন্দ আর উল্লাস এবং মিলন মেলা। ঔইদিন পাহাড়ে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক উৎসবের মেতে ওঠেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সম্প্রদায়রা। প্রতিবছর চৈত্রের মাঝামাঝি থেকে বৈসাবি নানা প্রস্ততি শুরু হলেও এবারের চিত্র ভিন্ন।
বান্দরবান সরকারী কলেজে পড়ুয়া উখ্যাইচিং মারমা জানান, মারমা সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় সামাজিক উৎসব, আনন্দের উৎসব হচ্ছে সংগ্রাই। যুবত-যুবতীরা দল বেধে মৈত্রী পানি বর্ষণ ( জলকেলী) উৎসবে মেতে ওঠতাম। সন্ধ্যায় নামলে এক পাড়া থেকে অন্য পাড়ার হরেক রকমে পিঠা তৈরির অনুষ্ঠানে যোগদান করতাম। সারাবিশ্বের প্রাণঘাতী কারোনা প্রাদুর্ভাব কারণে নিজেকে সুরক্ষিত থাকতে ঘর থেকে বের হচ্ছি না। করোনা সংক্রামণ এড়াতে বৌদ্ধ মন্দিরগুলো লকডাউন করে দিয়েছে সরকার। তাই দেশের শান্তির মঙ্গল কামনা জন্য পূর্ণিমা দিন ঘরে বসে ভগবানে উদ্দেশে পূজা ও প্রার্থনা করবো।
চট্টগ্রাম সরকারী কলেজে অর্নাস পড়ুয়া সিংমংউ মারমা জানান, ছোটকাল থেকে লেখাপড়া তাগিদে শহরের বড় হয়েছি। কলেজ থেকে বিশেষ ছুটি না পেলেও সাংগ্রাই আসলেই ছুটে আসতাম প্রাণের উৎসবে যোগ দিতে। তবে করোনা ভাইরাসের কারণে পাহাড়ের চিত্র একেবারে ভিন্ন। কিন্তু এবারে এই প্রাণের উৎসব হচ্ছে না শুনেই মনের কষ্ট পেলেও দু:খ পাচ্ছি না। কারণ আমরা এই মরণব্যাধী রোগ থেকে মুক্তি পেতে হবে।
সাংগ্রাই উৎসব উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক কোকোচিং মারমা জানান, প্রতিবছর বান্দরবানে মারমারা চার দিনের সাংগ্রাই উৎসব পালন করে থাকে। সাংগ্রাইয়ের মূল আকর্ষণ মৈত্রী পানি বর্ষণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা।
‘বর্তমানে মহামারী করোনা ভাইরাসের সংক্রামণে নাজেহাল সারা বিশ্ব। তাই করোনা ভাইরাস সংক্রামণ এড়াতে জনসমাগম হয় এসব অনুষ্ঠান পাশাপাশি সবধরণের ধর্মীয় অনুষ্ঠানমালা বাতিল করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
বৈসাবি এলে ম্রোদের চাংক্রান উৎসবের রঙ লেগে যায় চিম্বুক পাহাড়জুড়ে। চিম্বুকে রুইপো পাড়া (ফটোসিং পাড়া) এবং টংকাবতি ইউনিয়নে সাক্খই পাড়ায় জাঁকজমকভাবে আয়োজন করা হয়ে থাকে বর্ষবরণ এ অনুষ্ঠান। তুলে ধরা হয় হারানো গান ও পালা গান। ঐতিবাহী খেলাধুলা এবং গো হত্যার বাঁশি নৃত্যে নতুন বছরকে বরণ করে নেন তাঁরাও।
তাঁদের এসব অনুষ্ঠানও বাতিল হওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান বান্দরবান জেলা পরিষদের সদস্য সিংইয়ং ম্রো।
এই ব্যাপারে বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউট পরিচালক মংনুচিং মারমা জানান, বর্ষবরণ উৎসব বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সাথে যৌথভাবে উদযাপন করে আসছিলেন বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউট। নানান বৈচিত্র্য উৎসব পালনে সহযোগিতাও দিয়ে থাকেন তাঁরা। মহামারী করোনাভাইরাসের কারনে নির্ধারিত এসব অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে।
‘এমনিতে সরকারিভাবেও সকল ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে নিরুৎসাতি করা হচ্ছে। করোনা সংক্রমন এড়াতে সাংস্কৃতিক ইন্সটিউটের সব অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে। তবে পরিস্থিতি ঝুঁকিমুক্ত হলে পরর্বতীতে কোনো মাসে সীমিত আকারে পালন করা যায় কিনা পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।’
এদিকে, গত শুক্রবার(১০ এপ্রিল) বান্দরবান জেলা পরিষদের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মারমাদের সাংগ্রাই ও সব ধরণের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন না করার সিদ্ধান্তের ঘোষণা প্রদান করেছেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা।
উল্লেখ্য যে, ত্রিপুরাদের ‘বৈসু’, মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ আর চাকমাদের ‘বিজু’। এই তিনের আদ্যাক্ষর নিয়ে ‘বৈসাবি’। করোনা ভাইরাসের কারণে সারাবিশ্ব যেভাবে নাকাল তার থেকে পাহাড়ের বাসিন্দারাও নিস্তার পায়নি। তাই এই আনন্দের উৎসব থেকে বঞ্চিত হয়েছে প্রথমবারে মত এই সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীরা।