Monday, July 27

করোনা পরবর্তী বিশ্ব, কেমন হতে পারে?

0

আজিজ কাজল : সবাই অধীর আগ্রহে বসে আছে, কখন করোনার শনি কেটে মঙ্গল বেরিয়ে আসবে। এই মৃত্যুর মিছিল কবে শেষ হবে। করোনার গ্রাস শেষ হওয়ার পর সবশ্রেণীর মানুষ আবার নতুন করে বুঝবে, প্রকৃতির এই খোলা মাঠে বিচরণ করে, তারা কী অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করেন! ঘরে থাকতে থাকতে দম বন্ধ হয়ে আসা মানুষ—কেউ হয়তো ঘর থেকে বেরিয়েই আকাশের দিকে তাকিয়ে বুক ভরে বাতাস নেবেন। কেউ হয়তো নির্বাক চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবেন। যারা প্রকৃতিপ্রেমী। প্রকৃতির ভাষা আলাদা করে বুঝতে পারেন। সংবেদনশীল। তারাও বুঝতে পারবেন, বাঁচতে হলে প্রকৃতির এই অকৃপণ দান—বাতাস, গাছপালা-লতা-পাতা-ফুল-পাখি আর বৃষ্টির এই নির্মোহ সৌন্দর্য গ্রহণের কোন বিকল্প নেই। আসলে প্রকৃতির ঐশ্বর্যকে অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। তার অকৃপণ হাতে দেওয়া দানকে আমরাই ভেঙে-চুরে ছিঁড়ে আবর্জনা বানাই। আবার এই সব আবর্জনা তার বুকে কী অমানবিক ভাবে ছুঁড়ে দিই! আমাদের মনে কোন দ্বিধা থাকে না। আমাদের মনে কোন ধরণের সংকোচ থাকে না।

বস্তুবিশ্বের আর্টিফিশিয়াল জিনিস গ্রহণ করতে করতেই আসল জিনিস থেকে আমাদের মনোযোগ দূরে সরে গেছে। আসলে প্রকৃতি কে উপভোগ না করে ভোগ করেছি বলেই আজ এমন অভিশাপ আমাদের বরণ করতে হচ্ছে। পৃথিবীতে এমন মহামারী আরো আসবে। ইতিহাস তাই বলে। অথচ এই জায়গায় আমাদের প্রস্তুতি খুব ছোট। শিল্পায়নের ঘোড়া আরো দ্রুত বেগে ছুটছে। এর লাগাম টানা দরকার। ছোট বড়ো অনেক যুদ্ধ ছাড়াও পৃথিবীর বুকে ভয়াবহ যুদ্ধের দুটো কাল দাগ, প্রথম মহাযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। দুই মহাযুদ্ধেই আমরা তার ভয়াল রুপ দেখেছি। ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা কী রক্তাক্ত আর ভয়াবহ সেই যুদ্ধ! পৃষ্ঠা উল্টালেই যেনো ছোপ ছোপ রক্তের দাগ—পারমাণবিক বোমার বিষ্ফোরণ। অস্ত্রের ঝনঝনানীসহ কী দু:সহ, ভয়ঙ্কর সব আবিষ্কার। পরস্পর পরস্পরের শক্তি পরীক্ষার কী ভয়াবহ বিভীষিকা!

প্রকৃতি এইসব অনাচার কখনো সহ্য করে না। সেজন্য পালা বদল করে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে একেকটা প্রলয় (ধ্বংস)পাঠিয়ে আমাদের কাছে বড়ো একটা শিক্ষা দিয়ে যায়। অথচ তার এই অভিশাপ থেকে আমরা কখনো শিক্ষা গ্রহণ করি না। হয়তো সে এখন আরো প্রস্তুত। এই মানব সভ্যতাকে, মানুষের পৃথিবীকে ধ্বংস করে নতুন আরেকটি পৃথিবী গড়ার। যেখানে থাকবে প্রকৃতিবান্ধব যতো কীট, জীব, অনুজীব আর প্রাণিকুলের বাস। মাটি ফোঁড়ে জেগে ওঠবে নতুন চারা। নতুন ঘাস। নতুন উদ্ভিদ। গাছে গাছে ফোটবে কোমল পাতা। কোমল ফুল। স্বাস্থ্য কর ফল। নতুন ফুল-পাখি-চন্দ্র-সূর্য-তারকার মহা আয়োজনে সবুজে সবুজে ভরে যাবে সুন্দর আরেকটি পৃথিবী।

কথা হচ্ছে আমরা প্রকৃতির প্রতিপক্ষ হয়ে বসে আছি। আমরা প্রকৃতির সহযোগী নই। এই প্রকৃতির সাথে যতোই আমরা নিজেকে মানিয়ে চলতে পারবো। ততোই আমাদের মুক্তি। যোগ্যরাই শেষ পর্যন্ত টিকবে থাকবে এই ধারণা থেকেই প্রবর্তিত হয়েছে, ডারউইনের ‘সারভাইভাল অফ দ্যা ফিটেস্ট’ যুক্তি। যদিও এর আগে এবং পরে অনেকেই অনেকভাবে বিষয়টাকে বিশ্লেষণ করেছেন…সুতরাং পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে তার সাথে প্রতিযোগিতা বা লড়াই করে নয়। তার সাথে মানিয়ে চলতে হবে। তাকেও আমাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। অন্যথায় আসন্ন আরো ভয়াবহ সংকটের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

করোনা পরবর্তী বিশ্বে মানুষ মানসিকভাবে আরেকটি বাস্তবতার মুখামুখি এসে দাঁড়াবে। শুধু সংবেদনশীল কিছু মানবিক মানুষ ছাড়া, কারও দু:খ বেদনা ও কষ্টের ভার অন্যের কাছে খুব একটা অনুভূতিপ্রবণ মনে হবে না। তারা এটাকে খুব সহজ করে দেখবে। হয়তো কিছুই মনে হবে না। শুচিবায় গ্রস্ত মানুষের সংখ্যাও তুলনামূলক আরো বেড়ে যাবে। বেড়ে যাবে পারস্পরিক কিছু বস্তুগত সন্দেহ। মানুষ সবসময় বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য। ফ্রেশ হওয়ার জন্য। পরিষ্কার হওয়ার জন্য ক্যামিক্যাল বেইজড জিনিসের প্রতি নির্ভরতা আরো বাড়িয়ে দেবে। এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে আসবে। আর্টিফিশিয়াল জিনিসের ব্যবহার অতি মাত্রায় বাড়িয়ে দেওয়ার কারণে অল্প সময়ের মধ্যে ফার্টিলিটিও কমে আসবে। হয়তো মানুষের ডিএনএ’র ভেতরে থাকা জিনের মধ্যে (জিন) বংশগতির যে আয়ুর ইতিহাস লেখা আছে, সেটাও পাল্টে যাবে। কারণ আমরা নিজেরাই সেই মহা আয়োজন তৈরি করে রেখেছি। করোনা, পৃথিবীর মানুষকে আরেকটি বড়ো শিক্ষা দিয়ে যাবে। তার কাছে রাজা মহারাজা, ধনী গরীব সবাই সমান। সে সাম্যবাদী। পৃথিবীর যেকোন প্রান্ত থেকেই সে মৃত্যুর দূত হয়ে মৃত্যুর মিছিলে যোগ দিতে পারে। করোনা পরবর্তী বিশ্বে এখন পুরো পৃথিবীর সব দেশকেই এখন এর দায়িত্ব নিতে হবে। অর্থাৎ করোনা পরবর্তী বিশ্বে আমরা কীভাবে এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে পারি। করোনা যেমন একটি কমিটমেন্ট নিয়ে পুরো পৃথিবীকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আমাদেরও দৃষ্টান্তমূলক কমিটমেন্ট নিয়ে সুন্দর বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার কাজ আবার নতুন করে শুরু করতে হবে।

# ভাবনা সংক্ষেপ
# ১১/০৪/২০ খ্রি……

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.