অনবদ্য অভিনয় দিয়ে কুড়িয়েছেন অগুনতি মানুষের ভালোবাসা। সম্প্রতি রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্বীকৃতি একুশে পদক অর্জন করেছেন। এ ছাড়া চলচ্চিত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২১ সালের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হন তিনি। বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- জাহিদ ভূঁইয়া
আজীবন সম্মাননাসহ তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। এবার ঝুলিতে উঠল একুশে পদক। আর কোনো অপূর্ণতা আছে কি?
আমার জীবনে কোনো অপূর্ণতা নেই। জীবন নিয়ে আমি ভীষণ খুশি। ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় ৫০ পেলেও হাসি-খুশি থাকতাম। আর পুরস্কারের প্রতি কখনই লোভ ছিল না। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে এত এত মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, যা বলে শেষ করতে পারব না। দর্শকরাই আমার মাথার মুকুট। তবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অবশ্যই বড় কিছু। যখন একুশে পদকপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করা হয়, তখন আমি হাসপাতালে ছিলাম। সবচেয়ে ভালো লেগেছে এ কারণে যে, জীবদ্দশায় পুরস্কার পেলাম। কেননা অনেকেই তো মরণোত্তর পান। আমি মনে করি- যাদেরই সম্মান জানানো হোক, সেটা বেঁচে থাকতেই জানানো উচিত।
অভিনয়ের প্রতি কীভাবে ভালোবাসার জন্ম হলো?
শখের বশে ছোটবেলায় নাচ-গান করতাম। অনেকেই পছন্দ করত, উৎসাহ দিত। এভাবেই একসময় মঞ্চে উঠি। স্বাধীনতার পর দেশের অনেক জনপ্রিয় গান গাইতে হতো। কোরাস গান করতাম। রেডিওতেও গান করেছি। সেসব রেকর্ডিং করা আছে। ভালো লাগা থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান পড়ার সময়ও থিয়েটার করতাম। কিন্তু অভিনয় করব, কখনই ভাবিনি। আমার স্বামী চাকরি করতেন। তিনি আমার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিতেন। আমাকে চাকরি করতে দিতেন না। তখন আমি মঞ্চে, বেতারে অভিনয় করি। এক সময় টেলিভিশনে অভিনয় শুরু করি। এভাবেই একসময় মনে হয় অভিনয় আমার জায়গা।
শুরুর দিকে কি ভেবেছিলেন- এত সম্মান আর ভালোবাসা অর্জন করবেন?
না। অভিনয় করতে ভালো লাগত, অভিনয় ভালোবাসতাম, সেজন্যই অভিনয় শুরু করেছিলাম দীর্ঘকাল আগে। তবে দেশ স্বাধীনের পর অভিনয় শুরু করতে গিয়ে বারবার মনে হয়েছিল- একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি, আর কী চাই? স্বাধীন দেশে কাজ করতেই যত আনন্দ।
যখন অভিনয় শুরু করেছিলেন, সে সময়ে মেয়েদের জন্য মিডিয়ায় কাজ করাটা কঠিন ছিল। আপনি কীভাবে পেরেছিলেন?
মা চাইতেন না অভিনয় করি। অভিনয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতেন। কারণ তিনি লেখাপড়াকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন। বেশির ভাগ সময়ই মা বলতেন, ‘এত বড় মেয়ে পড়াশোনা নেই, অভিনয় করতে যায়। এগুলো ঠিক না। পড়াশোনায় মনোযোগী হও।’ কিন্তু অন্যরা বেশ সহযোগিতা করতেন। এখনো প্রায়ই মনে পড়ে- মা রাগ করতেন, অন্যদিকে বাবা ইশারা দিয়ে সাহস দিতেন। ইশারায় বাবা বোঝানোর চেষ্টা করতেন, কথা বলো না, চুপ থাকো।
টেলিভিশন নাটকে সোনালি সময় পার করেছেন। বর্তমান সময়ের সঙ্গে পার্থক্য কেমন বলে মনে হয়?
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুরই পরিবর্তন হয়েছে। তাই দুটোকে মেলানো ঠিক নয়। সেজন্য এটা করিও না। আমি যখন কাজ শুরু করি, তখন দেশের সবচেয়ে সেরা প্রযোজকরা নাটক প্রযোজনা করেছেন। সেরা নাট্যকাররা নাটক লিখেছেন। তা ছাড়া একটি মাত্র টেলিভিশন চ্যানেল ছিল। মানুষের বিনোদনের এতগুলো মাধ্যম ছিল না। সিনেমা ও টেলিভিশন ছিল বিনোদনের মাধ্যম। তার পরও সেই সময়ের নাটকগুলো মানুষ লুফে নিত। কালজয়ী নাটক হিসেবে স্বীকৃতি পেত।
অভিনয়ে এখন খুব একটা দেখা যায় না। কারণ কী?
চলচ্চিত্রে অভিনয় করব না, এটি অনেক আগেই বলেছি। পছন্দমতো চিত্রনাট্য হলে নাটকে কাজ করি। বর্তমানে অনেক তরুণ মেধাবী নির্মাতা কাজ করছেন। তারা সব সময় ভিন্ন কিছু নিয়ে ভাবেন। এই বিষয়টা আমার কাছে চমৎকার লাগে।
অবসর সময় কাটে কীভাবে?
আমার বাসায় পুরনো অনেক ম্যাগাজিন আছে। সেসব বের করে পড়ি। অনেক ম্যাগাজিন উইপোকায় খেয়ে ফেলেছে। এজন্য খুব কষ্ট লাগে। পুরনো ম্যাগাজিনের লেখাগুলো দারুণভাবে টানে আমাকে। এ ছাড়া বাসায় আপনজনদের সঙ্গে আড্ডা দিই। এভাবেই সময় কেটে যায়।