কাজী মাহাদী কবির: মুক্তিযোদ্ধারা হলো এ দেশের বীর সন্তান। যাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পিছনে মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা অপরিসীম। তারা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে না পড়লে এই দেশ কখনই স্বাধীন হতো না। মুক্তিযোদ্ধারা হলো বীর সৈনিক।
চট্টগ্রাম জেলা হাটহাজারী উপজেলাধীন ফতেয়াবাদের পূর্বে বটতলী এলাকার (১৩ নং দক্ষিন মাদার্শা ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা) পাঠান বাড়ির প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা নায়েব সুবেদার বজল আহমেদ এর পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। সরেজমিনে খোজ নিতে গেলে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা বজল আহমেদ এর স্ত্রী ফেরদৌস বেগম এবং তার ছোট ছেলে আব্দুল গোফরান শাহ বাংলাদেশ সময়ের প্রতিবেদককে জানান, গত ২৭-০৫-২০১৭ ইং তারিখ রাত ১২.৩০ ঘটিকার সময় হঠাৎ করে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয় আমাদের বাড়িতে।
ফেরদৌস বেগম বলেন, আগুনের তীব্রতা বেড়ে গেলে আমি আমার সন্তানদের নিয়ে কোন ভাবে ঘর থেকে প্রাণ নিয়ে বের হতে সক্ষম হই। আগুনের লেলীহান শিখা চারিদিক ধাও ধাও করে জলতে থাকায় এবং আগুন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ায় ঘরের যাবতীয় জিনিসপত্র, ব্যবাহারিক আসবাবপত্র, মালামাল বের করতে ব্যর্থ হই এবং কিছুক্ষনের মধ্যেই সব পুড়ে ভূষ্মিভূত হয়ে যায়। আমার ডাক চিৎকারে এলাকার মানুষ এবং প্রতিবেশিরা ছুটে আসে এবং অক্লান্ত চেষ্টার পর আগুন নেভাতে ব্যর্থ হয়ে হাটহাজারী ফায়ার সার্ভিস কে খবর দেয়। ফায়ার সার্ভিস এর একটি ইউনিট ২.৩০ ঘন্টার আপ্রান চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রনে আনতে সক্ষম হয়। হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার আক্তার উননেছা শিউলী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে ১০ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। অগ্নিকান্ডে প্রায় ১০ থেকে ১২ লক্ষ টাকার ক্ষয় ক্ষতি হয়। আমার বসত বাড়ি পুরে যাওয়ার পর ঐ ১০ হাজার টাকা ব্যতিত আর কোন সরকারি সাহায্য সহযোগিতা পাইনি। বর্তমান সরকারের সহায়তায় বর্তমানে যে মুক্তিযোদ্ধার ভাতা পাচ্ছি তা দিয়ে পরিবার পরিচালনা করা খুবই কষ্টকর। আমার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ১৭ জন। ছেলে মেয়েদের অনেক কষ্ট করে লেখা পড়া করাচ্ছি। আমার পরিবারের উপার্জন করার মতো স্বক্ষম কেউ নেই। এমতাবস্থায় বর্তমানে আমি সর্বস্ব হারিয়ে ছেলে সন্তানদের নিয়ে একটি ভাড়া ঘরে মানবেতর জিবন যাপন করছি।
তিনি আরো বলেন, আমার স্বামী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। যার গেজেট নং-৫৭০, সেক্টর নং-১। আমার স্বামী প্রয়াত নায়েব সুবেদার বজল আহমেদ ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) এ কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে আমার স্বামী সাহসীকতার সাথে চট্টগ্রাম ১ নং সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ গ্রহন করেছিলেন। একই সাথে তিনি ভারতে গিয়ে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষন নিয়ে বর্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধে অংশ গ্রহন করেছিলেন। তৎকালিন চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক কালুরঘাটের যুদ্ধেও তিনি স্বশস্ত্র যোদ্ধা হিসেবে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে সকল মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধ করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমার স্বামী তৎকালীন ইপিআর থেকে বিডিআর (বাংলাদেশ রাইফেলস) এ যোগদান করেন। পরবর্তীতে দক্ষিন পূর্ব আঞ্চলিক প্রশাসনিক পরিষদ, কাপ্তাই চট্টগ্রাম থেকে ১৯৭১ সালে নায়েব সুবেদার বজল আহম্মেদ কে মুক্তিযোদ্ধা সনদ প্রদান করেন। আমার স্বামী প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা বজল আহমেদ ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শেও সৈনিক।
তিনি সব সময় বলতেন, এই দেশ আমার এই মাটি আমার ” দেশ রক্ষার্থে দেশের জন্য যদি আমি আমার জীবন উৎসর্গ করতে পারি তাহলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারব। আমার স্বামী ছিলেন ভূমিহীন, ছোট বেলা বাবা মাকে হারিয়ে এক আত্মীয়ার কাছে বড় হন।
তিনি ১৯৪৯ সালে ইপিআর (ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস) এ যোগদান করেন। চাকুরীরত অবস্থায় ১৯৬৩ সালে আমার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। আমার স্বামীর স্থাবর অস্থাবর সহায় সম্পত্তি না থাকায় তিনি আমার বাবার বাড়িতে ( তার শশুরালয়ে) আজীবন থেকে যান। চাকুরীরত জীবনে আমার স্বামী কোন সম্পদ রেখে যেতে পারেন নাই। আমার ৫ ছেলে ৩ মেয়ে রেখে আমার স্বামী ২০০৫ সালে মৃত্যু বরণ করেন। আমার স্বামী আমার বাবার বাড়িতে (তার শশুরালয়ে) আমার বাবার নির্মিত একটি টিনশীট বেড়ার ঘরে বসবাস করেছেন। তাই আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও জাতির জনকের সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে সাহায্যের আবেদন করছি।
আমি জানি বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার। আমাকে স্থায়ী বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করে, আমাকে মানবেতর জীবনযাপন থেকে একটু স্বচ্ছলতা ও আমার ছেলে সন্তানদের বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক করে গড়ে তোলার ব্যবস্থা করে দেন। আমি জানি মুক্তিযোদ্ধারা এদেশের বীর সন্তান।
তাদের অনেক ত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। বিভিন্ন জেলায় ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবার স্থায়ী বন্দোবস্ত সহ সরকারি বাসস্থান পাচ্ছে। তাদের মতো আমিও ভূমিহীন। তাদের ন্যায় আমি মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার জোর আবেদন, আমাকে তাদের মতো স্থায়ী বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করে আমার অসহায় পরিবারকে বাঁচান।