জেলা প্রতিনিধি, নাটোরঃ মৎস্য ভান্ডার খ্যাত চলনবিলের প্লাবন ভূমিতে চলতি শুঁটকি উৎপাদণের ভরা মওসুমে তাজা মাছের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রযোগ, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীতে যত্রতত্র বাঁধ দেয়া, মা মাছ নিধন, প্রজনন ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়া এবং শুস্ক মওসুমে বিল-নদী-খাড়ি শুকিয়ে যাওয়ায় চলনবিলাঞ্চলে মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টিদ হয়েছে। ফলে এ বছর শুঁটকি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে লোকসানের আশঙ্কায় মহাজনের দাদনের টাকা পরিশোধ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন শুটকি চাতাল মালিকরা।
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এ বছর চলনবিলের ২৭০টি চাতালে ৩৫ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ৪৫০ টন শুঁটকি উৎপাদনের টার্গেট রয়েছে, যার জন্য প্রায় ১,৩৫০ টন কাঁচা মাছ দরকার। কিন্তু বিলে পর্যাপ্ত মাছ ধরা না পড়ায় শুটকি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পুরণ না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শুটকি চাতাল মালিকরা জানান, মওসুমের শুরুতে বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে চাতাল তৈরিসহ জেলে ও ব্যবসায়ীদের আগাম টাকা দিতে হয়েছে। তাদের সরবরাহ করা মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করা হয়। মান ভেদে শুঁটকি এ, বি ও সি গ্রেডে বাছাই করা হয়। ‘এ’ গ্রেডের (ভাল মানের) শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত করে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সৌদি ও কুয়েতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হয়। সাধারণত এসব দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাঙালিদের মাঝে এ শুঁটকির কদর রয়েছে। তাছাড়া ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেডের শুঁটকি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ভাল দামে বিক্রি হয়। সৈয়দপুরের শুঁটকি ব্যবসায়ী এখলাছ মিয়া জানান, ভালো মানের কারণে চলনবিলের শুঁটকির ব্যাপক চাহিদা থাকলেও এ বছর মাছের উৎপাদন কম হওয়ায় চাহিদার অর্ধেক শুঁটকিও পাচ্ছি না।
চলতি মওসুমে চলনবিলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এসে শুঁটকি তৈরির চাতাল মালিকরা আস্তানা গেঁড়েছেন। এ ব্যবসায় সাধারণত তিন থেকে ছয় লাখ টাকা পুঁজি লাগে। কিন্তু এবার শুঁটকি কম উৎপাদণ হওয়ায় চাতাল মালিকরা দাদনের টাকা কিভাবে শোধ করবেন সে চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
জানা যায়, চলনবিলের প্রায় দুই সহ¯্রাধিক পরিবার শুঁটকি তৈরির কাজে জড়িত। এসব পরিবারের নারী-পুরুষেরা শুঁটকি চাতালে দিন হাজিরায় ৩৫০-৪৫০ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন। মহিষলুটি এলাকার শুঁটকি শ্রমিক আঃ রহমান ও আলেয়া বেগম জানান, তিন কেজি তাজা মাছে এক কেজি শুঁটকি তৈরি হয়। প্রকার ভেদে শুঁটকির বাজার মূল্য ৬০০-১৩০০ টাকা।
চলনবিলের মহিষলুটি এলাকায় শুঁটকির চাতাল গড়েছেন গুরুদাসপুরের লোকমান হোসেন। তিনি জানান, গতবার দুটি চাতালে ১২০০-১২৫০ মণ শুঁটকি উৎপাদন হয়েছিল। তবে এ বছর চলনবিলে মাছ ধরা পড়ছে কম। ফলে অধিকাংশ শুঁটকি চাতালে তাজা মাছের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে লাভ-তো দুরের কথা, চালান উঠবে কিনা তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন চাতাল মালিকরা।
চলনবিলের শুঁটকি ব্যবসায়ীরা জানান, স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ না পেয়ে শুঁটকি উৎপাদনকারীরা মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা নিয়ে ব্যবসা করছেন। অনেক সময় লোকসানে শুঁটকি মাছ বিক্রি করে মহাজনের ঋণ পরিশোধ করতে হয়। এছাড়া সঠিক পরিচর্চা না হলে অনেক ক্ষেত্রে শুঁটকি নষ্ট হয়ে যায়। এমন সমস্যায় পড়লে মূলধন খোয়ানো ছাড়া কোন উপায় থাকে না বলে জানান তারা।