Saturday, August 22

ডাবল সেঞ্চুরি করার পরও নটআউট পেঁয়াজ

0

পেঁয়াজের দামে পাগলা ঘোড়া যেন এখন আরো ক্ষ্যাপাটে রূপে হাজির হয়েছে। দেড় শতকের পর ডাবল সেঞ্চুরি। সর্বশেষ গতকাল রাজধানীসহ সারাদেশে ২০০ থেকে ২১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি পেঁয়াজ। কারওয়ানবাজার, খিলগাঁও, মিরপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার খুচরা বাজারে এ দামে পেঁয়াজ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ক্রেতারা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে গত বছর দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ২৩ লাখ ৩০ হাজার টন। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে আমদানি হয়েছে ১০ লাখ ৯২ হাজার টন। সরকারি সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী দেশে পেঁয়াজের মোট সরবরাহ ৩৪ লাখ ৬৬ হাজার টন। বছরে দেশে চাহিদা ২৪ লাখ টন। বর্তমানে প্রশ্ন-উদ্বৃত্ত ১০ লাখ ৬৬ হাজার টন পেঁয়াজ গেল কোথায়।

সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রীর পক্ষে শিল্পমন্ত্রী যেদিন বললেন বাজার নিয়ন্ত্রণে তার পর দিনই এক লাফে ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেড়ে যায় কেজিতে। অবশ্য পরিস্থিতি যে এমনটা হবে তা অনেক আগেই সতর্ক করেছিলেন গোয়েন্দারা।
সেই বার্তা আমলে নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হলে পরিস্থিতি হয়তো এতোটা ভয়াবহ হতো না। গতকাল সংসদে পিয়াজের দাম নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংসদ সদস্যরা। তারাও বলছেন, পূর্ব প্রস্তুতি নেয়া হলে এমনটা হতো না। এখন বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের সরকারের তরফে সহযোগিতা করতে হবে। প্রয়োজনে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পিয়াজ নিয়ে গত কয়েক দিন ধরেই টানাহেচড়া চলছে। বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মিয়ানমার, মিশর, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানির কথা বলা হচ্ছে তখন থেকে। পিয়াজও আসছে। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না কেন এ প্রশ্নের জবাব নেই কারও কাছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা একেক সময় একেক কথা বলছেন, এতে অসাধু ব্যবসায়ীরা আস্কারা পেয়ে দাম বাড়াচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টরা আরো বলছেন, পিয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ার পর বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবি ঢাকায় খোলা ট্রাকে ৪৫ টাকা কেজিতে পিয়াজ বিক্রি শুরু করলেও সরবারহ না থাকায় তাতে ভাটা পড়েছে। পিয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে মন্ত্রীরা বার বার আশ্বাস দিলেও এনিয়ে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগের মতো সিন্ডিকেট করে ফের পিয়াজের দাম বাড়ানো হয়েছে। দাম বাড়ার পিছনে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারসাজি রয়েছে। মিয়ানমার থেকে যেই পিয়াজ আমদানি হচ্ছে ৪২ টাকায়, ভোক্তা পর্যায়ে তা বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা কেজিতে। দামের এই কারসাজিতে আমাদানিকারক, সিএন্ডএফ এজেন্ট ও আড়তদাররা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র জানায়, ভারত গত ২৯শে অক্টোবর থেকে পিয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এরপর বাংলাদেশে সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও পিয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়নি। রপ্তানি বন্ধের আগের দিনও বাজারে পিয়াজের কেজি ছিলো ৮০ টাকা। বিক্রেতারা বলছেন, আমদানিকৃত পণ্য খালাস না হওয়ায় বাজারে পিয়াজের সরবরাহ কমেছে। ফলে পণ্যটির দাম ফের বাড়তির দিকে। এদিকে দাম বেশি থাকায় পাইকারি বাজারগুলোতে পিয়াজের সংকট দেখা দিয়েছে। কারণ, বিক্রেতারা বাড়তি দামে বাজারে পিয়াজ তুলছেন না।

এদিকে সরকারের নিয়মিত মনিটরিং না থাকায় ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমত পিয়াজের দাম বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেন ক্রেতারা। পিয়াজের এমন লাগামহীন দামে ক্রেতাদের মাঝে ক্ষোভ দেখা গেছে। বাজার কারা নিয়ন্ত্রণ করছেন সে প্রশ্ন সাধারণ মানুষের। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছে স্বল্পআয়ের মানুষ। আর কত বাড়বে পিয়াজের দাম? এমন প্রশ্ন এখন সাধারণ ভোক্তাদের। অতিরিক্ত দামের কারণে পিয়াজ ছাড়াই বাজার সারছেন অনেকে। যারা আগে বাজারে গিয়ে দুই কেজি পিয়াজ কিনতেন তারা এখন কিনছেন ৫০০ গ্রাম।

অথচ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ভারত পিয়াজ রপ্তানি বন্ধ করলেও দাম এতটা বাড়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। কারণ বর্তমানে চাহিদার চেয়ে বেশি পরিমাণ পিয়াজ দেশে রয়েছে। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতবছর থেকে এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ পিয়াজ দেশে আছে তা চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি। তাহলে এভাবে লাগামহীনভাবে পিয়াজের দাম বাড়ছে কেন? এর কোনো জবাব নেই।
গত সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অস্থির হয়ে উঠে পিয়াজের বাজার। ২৯শে সেপ্টেম্বর পিয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করে ভারত। তখন দুই দিনের মধ্যে কেজিতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেড়ে ১০০ টাকা ছাড়ায় দেশি পিয়াজের দাম। ভারতীয় পিয়াজও বিক্রি হতে থাকে ১০০ টাকার কাছাকাছি দরে। অবশ্য বাজার তদারকির পর দাম কিছুটা কমে। তবে গত কয়েক দিন ধরে আবার লাগামহীন হয়ে পড়েছে পিয়াজের দাম।

টিসিবি’র মূল্য তালিকায় দেখা গেছে, রাজধানীর বাজারে প্রতি কেজি দেশি পিয়াজের দাম গত সপ্তাহেও ছিল ১১৫ থেকে ১২৫ টাকা। এক মাস আগে ছিল ৮৫ থেকে ৯৫ টাকা। আর এক বছর আগে ছিল ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। সেই হিসেবে এক বছরের ব্যাবধানে কেজিপ্রতি পিয়াজের দাম বেড়েছে ৩৪০ শতাংশ।

এদিকে আমদানি করা পিয়াজের দাম গত সপ্তাহে ছিল ১০৫ থেকে ১২০ টাকা। এক মাস আগে ছিল ৮০ থেকে ৯০ টাকা। আর এক বছর আগে ছিল ২৫ থেকে ৩৫ টাকা। সেই হিসেবে এক বছরের ব্যাবধানে কেজিপ্রতি পিয়াজের দাম বেড়েছে ৪১৬.৬৭ শতাংশ।

গতকাল কাওরান বাজার আড়তে দেখা গেছে, এক পাল্লা (৫ কেজি) পিয়াজ ১০০০ টাকা দর হাঁকছেন বিক্রেতারা। দাম কেন বেড়েছে? জবাবে বিক্রেতা মামুন আকন্দ জানান, বাজারে ভারতীয় পিয়াজ নেই। দেশি পিয়াজের মজুতও প্রায় শেষ। তার ওপর ঘূর্ণিঝড়ে পিয়াজ পরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। তাই দাম বেড়েছে। এই বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ভালো মানের দেশি পিয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১ কেজি ২০০ টাকা দরে। অপেক্ষাকৃত খারাপ মানের ছোট পিয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৯০ টাকা দরে। আমদানি করা পিয়াজ বিক্রি হচ্ছে থেকে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা দরে। এই বাজারে মিসর থেকে আমদানি করা পিয়াজ পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা, মিয়ানমারের পিয়াজ ১৬০ থেকে ১৭০ আর দেশি পিয়াজের দাম ২০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।

ভোক্তাদের অভিযোগ, পাইকারি ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছেন। তবে ভোক্তা অধিকার সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন, ভারত বাদে অন্য দেশ থেকে উচ্চমূল্যে পেঁয়াজ আমদানির কারণে সংকটের সৃষ্টি, তাই এখনই দাম কমবে না। এই সংকটের তাৎক্ষণিক প্রতিকার নেই জানিয়ে বাজার স্থিতিশীলতার জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দেন তারা।

এদিকে দেশের সর্ববৃহৎ সম্প্রসারণ সেবাদানকারী সংস্থা, কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কর্মকতা দাবি করেছেন, শিগগির দেশি পেঁয়াজ বাজারে আসবে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩ লাখ ৭৬ হাজার টন, এটিও অর্জিত হবে। তবে কর্মকর্তারা যাই-ই বলুক না কেন, কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না পেঁয়াজের বাজার।

এদিকে দাম ভালো পাওয়ায় আগভাগে পেঁয়াজ তুলে ঢাকার বাজারে পাঠাচ্ছেন কৃষকরা। তবে এটি কোনো সমস্যা মনে করছেন না ডিএইর কর্তারা।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.