বিশ্বব্যাংকের ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ নেপালে যেখানে এই হার ১ দশমিক ৭ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের হার হচ্ছে ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। বলা বাহুল্য, খেলাপি ঋণের এ প্রবণতা দেশের অর্থনীতিতে চরম ঝুঁকি তৈরি করেছে।
দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের চিত্র বাস্তবিকই উদ্বেগজনক। প্রশ্ন ওঠে, খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি কি কোনোভাবেই রোধ করা সম্ভব নয়? বস্তুত ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের ক্রমাগত উল্লম্ফন দেশের অর্থনীতির জন্য একটি অশনিসংকেত। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ২ থেকে ৩ শতাংশ খেলাপি ঋণকে সহনীয় বলে ধরা হয়ে থাকে। এর বেশি থাকলেই তা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শনাক্ত করা হয়। আর খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশ হলে তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কাজেই আর কোনো ঋণ যাতে খেলাপি না হয় সেদিকে দৃষ্টি দেয়ার পাশাপাশি খেলাপি ঋণের আদায় বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
দেশে ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যা বিরাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল উচ্চ খেলাপি ঋণ। মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বস্তুত খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকিং খাতে নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেই ঝুঁকি তৈরি করছে। মাত্রাতিরিক্ত খেলাপির প্রভাব পড়ছে ঋণ ব্যবস্থাপনায়, বিশেষত ঋণের সুদহারে। এ কারণে এগোতে পারছেন না ভালো উদ্যোক্তারা। ফলে বাড়ছে না বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। অথচ আমাদের মনে আছে, দায়িত্ব গ্রহণের পর অর্থমন্ত্রী ব্যাংক ঋণের সুদহার কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
শুধু অর্থমন্ত্রী নন, খোদ প্রধানমন্ত্রীও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তৃতায় ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত বেসরকারি খাতের প্রায় সব ব্যাংকই এ নির্দেশ অমান্য করে চলেছে তাদের নানা সমস্যার কথা বলে। এ অবস্থায় শুধু শিল্পঋণের সুদ ৯ শতাংশ তথা সিঙ্গেল ডিজিট বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। বস্তুত খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা গেলে ব্যাংকগুলোর পক্ষে ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা সহজ হবে। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত এ জায়গাটিতে দৃষ্টি দেয়া। সামগ্রিক অর্থনীতির স্বার্থে এমন একটি নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে, যার মাধ্যমে ভালো গ্রাহকরা হবেন পুরস্কৃত এবং খারাপ গ্রাহক তথা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা হবেন তিরস্কৃত ও দণ্ডিত। সূত্র: যুগান্তর